ইমরুল হাসান ও আমাদের সময়

ইমরুল হাসান ও আমাদের সময়
ইমরুল হাসান, জন্ম: ২৫ সেপ্টেম্বর

ইমরুল হাসান নব্বইয়ের দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি। এই দশকে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখক সাহিত্য করতে আসেন। তারা নানাবিধ এক্সপেরিমেন্ট ও বৈচিত্র্য আনয়ন করেন আমাদের কাব্যজগতে। এই সারিতে ইমরুলও ঠাঁই পাইবেন। আমাদের কাব্যজগতে আশি ও নব্বই বেশকিছু তোলপাড় করে। কবিগণ সকলে মিলিমিশি বেশকিছু বাঁকবদলকারী ঘটনা ঘটান। আশিতে কবিতা লেখবার রীতিতে রাতাতাতি একটা রূপান্তর ঘটে। নব্বইয়েও সেই রূপান্তরের সিলসিলা জারি থাকে। যদিও আশিতে, অনেক ক্ষেত্র বিবেচনায়, একটা বহির্মুখীন যাত্রা খিয়াল করি। আর নব্বইয়ে তা ঘরমুখী বা অন্তর্মুখীন হইল অনেকটা।

বিজ্ঞাপন

আমরা জানি, যখন ভাষা বদলায়, তখন চিন্তা-পদ্ধতিও বদলায়। একেক ভাষা কাঠামোয় একেক প্রকারের চিন্তা ডমিনেন্ট হয়। নব্বইয়ের কবিতায় জমিনের দিক দিয়া ‘পূর্ব বঙ্গীয়’ ও হালতের দিক দিয়া ‘মুখের কাছাকাছি’ জবানে লেখার ফ্যাশন তাইয়ার হয়। তাতে মানুষের জীবন, আকাঙ্ক্ষা, ভালোবাসা ও বেদনার উত্তাপ পাই।

কলোনির আমলে চর্চিত ‘আধুনিক বাংলা সাহিত্য’ কবিতা লেখার ব্যাপারে বেশকিছু তরিকা হাজির করছিল আমাদের সামনে। এইসব টেন্ডেন্সি অনেকটাই আধুনিকতাবাদী ইউরোপীয় কবিতার মেজাজ-মর্জি মাফিক তৈরি হইছিল। ফলে এইগুলাতে কখনো ইমেইজ, সিমিলি, সিম্বল; কখনো রাইম, রিদম; কখনো টানা গইদ্যের আধিক্য থাকত। এইসব কবিতায় ‘সুন্দর’ একটা বিশেষ স্থান লাভ করছিল। যেইটারে আমরা আহ্লাদ করি ‘এস্থেটিকস’ কই। আশিতে এই এস্থেটিকসের জগতে ফিইরা যাওয়ার একটা তাগাদা অনুভব করি।

এস্থেটিকময় বাংলা সাহিত্য মোটামুটি শব্দনির্ভর একটা ব্যাপারে পর্যবসিত হইছিল, যেইখানে একটার পর একটা শব্দের আঘাত যেন বা বিশাল কুনু ব্যাপার আছিল! যেন বা আধ্যাত্মিক কুনু ঘটনা মনে হইত এইটারে! আধুনিকরা সরল সোজা গদ্যবাক্য প্রায় বলতেই পারতেন না। উনাদের বাক্যে বাণীও সেই অর্থে থাকত না, যতটা থাকত চিত্ররূপময়তা বা সাংগীতিকতা।

কিন্তুক নব্বইয়ের দিক হইতে আমাদের কবিতায় প্রাচীন, লৌকিক ও কলোনির আগের সময়ের সাহিত্যের ব্যপক প্রভাব খিয়াল করা যায়। সাম্প্রতিক সময়ের আন্তর্জাতিক কবিতা আন্দোলনের ছাপও এতে বেশ আছে।

কলোনি-উত্তর দুনিয়ায় মানুষের সাইকি ঠিক কলোনির আগের মানুষের সাইকির মতন ওয়ার্ক করে না। সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বাস্তবতার কারণেই তা করে না। নিওলিবারাল দুনিয়ায় মানুষের আশা, আকাঙ্ক্ষা ও মিলনের বাস্তবতায় ঢের যোজন-বিয়োজন ঘটছে। মানুষ এখন আগের চাইতে বেশি হতাশ ও বিচ্ছিন্ন। এর প্রভাব আমাদের সাম্প্রতিক কবিতায়ও খিয়াল করি। এতে নীরবতা অনেক বেশি বাঙ্ময়।

বাংলা কবিতায় এখন আর দৃশ্যমান ছন্দের দোলা অতটা কার্যকরী কুনু অলংকার নায়। একটার পর একটা উপমা, প্রতীক বা চিত্রকল্প তৈয়ার করা, বা স্মরণীয় লাইন লেখাও এখন আর বিপ্লবী ঘটনা নায়। এখন কবিতা লেখার আধুনিক-উত্তর একটা কন্ডিশন বিরাজ করতেছে। ফলে যারে আমরা ট্রাডিশনালি ‘কবিতা’ ভাবতাম, আর তা যেইভাবে লেখা হইত, তারে লৈয়া অনেকটা হাসিঠাট্টা করারও টাইম এইটা!

এই সময়কার কবিতায় সরলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সরলতার জন্য ভানহীন হওয়া বাঞ্ছনীয়। নিরলংকার হওয়া জরুরি। সহজ-সরল বাক্যের ভিতরে ভাব বা বক্তব্য ফুটাইয়া তোলার ঝোঁক এই সময়ে বেশ খিয়াল করা যায়।

ইমরুল হাসানের কবিতায় উপরের এইসব গুণাবলি বা চরিত্র আপনে অনেকটাই পাইবেন। এদিকে, বাংলাদেশে সেই অর্থে নাগরিক কবিতা নাই। আমাদের কবিতায় নগরের কল্পনা আছে। কিন্তুক, তার অস্তিত্ব ঠাহর করি না, আলাদা করি। ইমরুলের কবিতায় একটা শহরের চিত্র খিয়াল করা যায়। তান কবিতা পাঠের সময়, আমরা একটা এলোমেলো ঢাকার ছবি মনে মনে আঁকতে পারি। সাহিত্যিক শহরগুলা, যেইগুলা আমাদের কবি-সাহিত্যিকরা দেশি-বিদেশি সাহিত্য পাঠ কইরা চিনেন; সেসবের বর্ণনার চাইতে, ইমরুলের এই বাস্তবের শহরের বিবরণ বা কল্পনা অনেক বেশি প্রাণময়!

বাংলাদেশে আবিদ আজাদ, মুস্তফা আনোয়ারদের কবিতার একটা সিলসিলা আছে। ইমরুল হাসানকে এই তরিকার কবি ভাবা যায়। তিনি এই ঘরানার অন্যতম পপুলার কবি, এও বলা সম্ভব। উনার দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হওয়া শিল্পী-সাহিত্যিকদের সংখ্যা মোটেও অল্প নয়। এই ঘরানার লেখকদের ঐক্যের জায়গা হৈল, তারা অভিজাত বা মিডিল ক্লাস একটা জায়গা হৈতে লিটারেচার করেন। এই লিটারেচার, মোর অর লেস, ‘আর্ট ফর আর্টস সেইক’র পারপাস সার্ভ করে। এনাদের কবিতায় ওয়েস্টার্ন লিটারেচারের প্রভাব চউখে পড়ার মতন।

ওয়েস্টার্ন লিটারেচার দিয়া, মোটের উপর, এদেশের সাম্প্রতিক সকল কবি-সাহিত্যিকই প্রভাবিত। হইলে, ইমরুলের স্বাতন্ত্র এইখানে, যে তান লেখায় শহরের বর্ণনা ও যাপন খুব একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট না; বরঞ্চ এইটা খুবই ভিজিবল। এই ঘরানার ভিত্রেই পড়েন, সাম্প্রতিক সময়ে লেখালেখি করা আর আর রাইটার, যেমন কাজল শাহনেওয়াজ, রিফাত চৌধুরী, আহমেদ নকীবরা (এই লিস্ট অবশ্যই বড় করা সম্ভব। গবেষক, বা অপরাপর সাহিত্যিক-সমালোকচরা তা করবেন, আশা করি। এছাড়া ইমরুল হাসান কাদের দ্বারা প্রভাবিত, বা তিনি কাদের ফলো করেন, এই বাবতে উনার নিজের আলাপও আছে)। এনাদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব কাব্যরীতি আছে। তো, জনগণের লগে ভাব ও ভাষার মোলাকাতের বেলায় ইমরুল হাসান বেশ আলা। ইমরুলের কবিতায় একটা শহুরে ভাব যেমন আছে, তেমন, শহর বা শহুরেদের সমাজভাবনাও হাজির আছে সমানভাবে।

কবিতায় তান ভাবনাগুলা বেশ মৌনভাবে আসে। তিনি এমন একটাভাবে কবিতা লেখেন, মনে হয়, নিজের লগেই কথা কইতেছেন তিনি। ফলে লেখক ব্যক্তি হিসাবে আরেক ব্যক্তির লগে আলাপ করতেছেন, নাকি তিনি ব্যক্তি হিসাবে নিজেরই আরেক ব্যক্তির লগে বাতচিত করতেছেন—তার নিশানা অনেক সময় ব্লার থাকে। এইটা উনার কবিতার একটা সিগনেচার ঘটনা।

দেখা যায়, বড় বড় ডিসিশন মেইক করার চেয়ে, অনেক অনেক কথা বলতেই তিনি পছন্দ করতেছেন। যেসবের বড় বড় এইম নাই। তাতে ছন্দ, ভাষা, ভাব ইত্যাদির কচকচিও অল্প দৃশ্যমান। এরারে কনফেশন আকারে পড়া যায়। এই সময়ের স্ট্রেসফুল মানুষদের কাছে তা একটা রিলিফ বটে। তান কবিতায় এইরকম একটা থেরাপিউটিক সাইডও আছে!

যেকুনু আলাপেই, আলাপের সহজাত বিষয় আশয় থাকবে, আশা করা যায়। কবি ইমরুল একটা তৃতীয় বিশ্বের শহরে বাস করেন। তাতে শহরের মানুষের কাম, ঘাম, বিরক্তি, স্বপ্ন বা দুঃস্বপ্ন সবই আসবে। আসবে রাষ্ট্র, দেশ। এইটাই স্বাভাবিক। কিন্তুক, আধুনিকতাবাদী কবিতায় বিভিন্ন রকম ফিল্টার খুব কাজ করে। যাতে ভাব, ভাষা ও রচনার পদ্ধতিতে বেশকিছু আর্টিস্টিক ঘটনা চাপাইয়া দিবার ব্যাপার থাকে। ইমরুল এইসবরে এড়াইয়া, একটা নন-কাব্যিক মেজাজরে আপন করি লন। যেইটা তান নিচের কবিতায়ও খিয়াল করি—

‘রিমা

পাতার পর পাতা আমি লিখে যাব দুঃখ, দুর্বল কাহিনিগুলা

পাতার পর পাতা আমি লিখে যাব তোমার নাম, মকারি কইরা

এরই নাম বসন্ত, বুঝলা?’

এই কবিতায় রিমারে পাইবার আকাঙ্ক্ষাই নয়, এতে একটা না পাওয়ার বেদনাও দৃশ্যমান। এইসব বেদনা-টেদনারে পিছনে ফালাইয়া, পায়ে দলি চলবারও একটা ইংগিত কবিতায় আছে। এইসব ভাবের লগে, পকরিতির যোগসাজশের কথা বলতেও ভুলতেছেন না কবি! এছাড়া, কে জানে, কবিতার এই রীমারে উদ্দেশ করি বলা কথাগুলা কবি নিজেই নিজেরে আওড়াইয়া শুনাইতেছন কি না!

আমাদের আলাপে আশি বা নব্বইয়ের বাতচিত টাইনা নিয়া আসা, মূলত, সেই সময়ের কবিতার ঝোঁক বা মেজাজ বুঝার লাগি। যদিও, যেকুনু আলোচনাই নানাবিধ জটিলতাও তৈয়ার করে। এই যেমন, মডার্নিজমের আলাপে আমরা কইলাম যে, এরা বেশ নন্দন, শব্দ, সাউন্ড সচেতন। কিন্তুক, আশি একটা মিক্সচার আছিল। মডার্ন আর উত্তর-মডার্নের। আর নব্বই ছিল উত্তর-মডার্নের দিকে বেশি কাইত। ইমরুল এই কাইত সিচুয়েশনরেই আপন করি লন। ফলত, তান কবিতায় আগের হেজিমনিক ধারা হইতে একটা র‍্যাডিকাল সেপারেশনও ফিল করা যায়। যাতে করি, আধুনিক ঘরানার কবিতার পাঠক হুট করি উনার কবিতা পড়তে আইসা, একটা আচমকা বিদেশে ঢুইকা পড়েন যেন বা! এইটা আমাদের অনেকের কাব্যের বেলায়ই সইত্য। এই সময়ের কবিতায় মডার্নিজম হইতে পোস্ট-মডার্নিজমের দিকে যে ট্রানজিশন, তা অনেক ক্ষেত্রেই স্মুথলি ঘটে নাই। ফলে, নতুন ও আনট্রেইনড পাঠক এইসব কবিতা পড়ি বেশ হতাশও হইতে পারবেন। এর মানে এও না, যে এখনকার কবিতা সিলসিলা ছাড়াই, আছমান হইতে নাজিল হইছে! আসলে, আমাদের পাঠকগণ একটা গড় ধারার সাহিত্য পড়তে অভ্যস্ত হওয়ার কারণে, তাদের মনে সেই গড় ভাবের আকাঙ্ক্ষা তাইয়ার হয়।

এদিকে, ইমরুল হাসানের কবিতার জার্নিতে সময়োত্তীর্ণ অনেক কবিতা লেখা হইয়া উঠলেও, তিনি তান যাপিত জীবনের যে মধ্যবিত্তীয় পরিসর, তার বাইরে আলোক ফালাইতে খুব একটা যুইত করি উঠতে পারেন না। তিনি যখন গাউরে বা অঞ্চলরে দেখেন, তখনো তিনি তান বিত্ত ও মেজাজের চশমা পইরা থাকেন। এর ফলে কবিতায় ভিন্ন রসের উদয় ঘটে অল্প। বলা ভালো তান কবিতা দীর্ঘ সময় পাঠের ফলে, একটা বোরডম ঘটার চান্সও থাকবে। ইমরুল হাসানদের কবিতা আমাদের দেশে জীবনানন্দদের আধুনিকতাবাদী নাগরিক কাব্যধারার একটা বেহতর ও জুতসই বিকল্প হিসাবে থান লইছে। মানে, তাদের কাব্যধারার একটা শক্তপোক্ত সিলসিলা অলরেডি হাজির আছে। যদিও তা আমাদের কবিতার শত শত বছরের দীর্ঘ অতীতরে অল্পমাত্র ইয়াদ করায়। এইটা উনাদের মইদ্যে সচেতনভাবে ঘটে, নাকি ঐতিহ্যবাহী টেক্সসমূহ অল্প পাঠের ফলেই ঘটে; আমরা ঠিক জানি না।

হজরত ইমরুলের কবিতা, নব্বই বা তার কাছাকাছি সময় হইতে এখন পর্যন্ত, দীর্ঘ একটা জার্নির ভিতর দিয়াই গেছে। এতে তিনি বেশকিছু এক্সপেরিমেন্ট করতেও সক্ষম হইছেন, কবিতা বলবার বা লেখার ক্ষেত্রে। এছাড়া ভাবের দিক দিয়াও তিনি বেশ চটপটে মেজাজ নিয়া অজস্র বেকাতেড়া আর সোজাসাপ্টা কথা বলতে পারছেন। তিনি একটা নীরব, মৌন, মনোলগপূর্ণ ভঙ্গিতে কথা বলবার পথ অনেকদূর পর্যন্ত পরিষ্কার করছেন আমাদের কাব্যধারায়। এছাড়া শহর, দেশ ও রাষ্ট্ররে দেখবার নানাবিধ জানালাও খুলছেন তিনি তান কবিতায়।

অবশ্য ব্যক্তি ইমরুল হাসান শুধু কবিমাত্র নয়! তিনি একজন গল্পকার, অনুবাদক, চিন্তক, সমালোচক, অ্যাক্টিভিস্ট, বক্তা, ব্যাংকার আর হাজব্যান্ড এবং বাবাও! একজন মানুষের পক্ষে এত এত পরিচয়রে একের ভিতরে ধারণ করা মামুলি ব্যাপার নায়। মনে রাখা দরকার, এইটা সেই সময়, যখন সোশাল মিডিয়ার কল্যাণে, আপনে নানাভাবে ফানা বা নাইও হইয়া যাইতে পারতেন!

ওয়েল, বাকশালীদের আন্ডারে, ট্রাডিশনাল মিডিয়া জগতের মউতের পরে; সোশাল মিডিয়া আমাদের চিন্তায় বড় রকমের প্রভাব ফেলছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের অনেক কারণও এই নিউ মিডিয়া। বাকশালের বিরুদ্ধে আমাদের চিন্তাজগতে যেই বিপ্লব ঘটছে, তাতে নয়া ভাবুকদের অবদানই বেশি, যারা নিউ মিডিয়ার কল্যাণে নিজেরারে অনলাইন পরিসরে হাজির-নাজির রাখতে পারছেন।

এই হাজির-নাজিরার একরকম শুরুয়াত হয় প্রমিত বিরোধী আন্দোলনে। আর তারও প্রবল সূচনা হয় শাপলার গণহত্যার মধ্য দিয়ে। শাপলায় খুন ঘটাইয়া বাকশাল যেমন অনন্তকাল শাসনের লেজিটিমেসি পায়, তেমন, এই খুনই তার অনন্তকালের শাসনের লেজিটিমেসির বিরুদ্ধে প্রথম প্রবল কুঠারাঘাতও। নয়া বাংলাদেশের আভাস তখন হৈতেই দেখা দেয়। সাম্প্রতিক সময়ের প্রভাবশালী চিন্তক-অ্যাক্টিভিস্টদের বড় অংশের জন্ম, উদ্ভব, বা বিকাশ মূলত শাপলার সেই ঘটনারে কেন্দ্র কইরা, বা তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে (এইখানে বিডিয়ার-নাটকের কথাও জরুর আসবে)। অবশ্য, চিন্তক-বুদ্ধিজীবীদের গণহারে সোশ্যাল মিডিয়ায় আসার আগেও তাদের একটা ‘ব্লগ যুগ’ ছিল, যেইটারে তাদের সোশাল মিডিয়ায় আসার ‘প্রিপারেশন’ হিসাবেও পাঠ করতে পারি।

ইমরুল হাসান এইরকম একজন চিন্তক। মানে, শাপলার পরে পরে পরে, ছাত্র-আন্দোলনগুলা যখন ঘটতে লাগল, তখন প্রবল বেগে একজন চিন্তক-অ্যাকটিভিস্ট ইমরুল হাসানের উত্থান খিয়াল করলাম আমরা। তিনি নিজেরে বাংলাদেশের সেইসব চিন্তকদের কাতারে নিয়া গেলন, যারা জালিম আর মজলুমের প্রকাশ্য ভেদ উন্মোচন করতে মরিয়া। যারা মজলুমের পক্ষে থাকতে চান সদাসর্বদা, নিজেরার জান-মাল-পরিবারের স্বার্থরে পিছনে ঠেইলা।

ইমরুলের চিন্তা, সমালোচনা ও অ্যাকটিভিজম শিল্প-সাহিত্য-ক্ষমতারে সেন্টার করি গড়ি উঠে। নতুন জমানায় শিল্প-সাহিত্য কেমন হইব, কী প্রকারের শিল্পরে এখন শিল্প বলা হয়, তা কীভাবে নির্ধারিত হয়, ক্ষমতা কাঠামো কীভাবে ফাংশন করে—এইগুলা উনার আলাপের অন্যতম বড় ভরকেন্দ্র।

এইসব করতে করতেই, তিনি তান চিন্তাজগতের আরেক দোস্ত, রক মনুর লগে মিইলা, ‘বাছবিচার’ আর ‘প্রিন্ট পোয়েট্রি’ নামের দুইটা কৃষ্টিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ি তোলেন। এর পয়লাটা শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবসাইট। দোসরাটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এই দুই প্রতিষ্ঠান একটা নতুন ঘরানার চিন্তক, অ্যাকটিভিস্ট ও লেখক তাইয়ারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেছে।

ইমরুলের কাজ হইতে অনুমান করা সম্ভব যে, তিনি বিপ্লবপনা, বা হুট করে সবকিছু ধ্বংস করার পক্ষে নন। এইটা এক দিনে সম্ভব নায়। হুট করি ক্ষমতার অদল বদল ঘটানি অসম্ভব। বরঞ্চ, বিপ্লব হইব বিভিন্ন সেক্টরে, ছোট ছোট ঘটনার তাৎপর্যপূর্ণ অবদান সহকারে। যেমন, শাপলার ঘটনা। যেমন ছাত্র আন্দোলনগুলা। এইগুলা প্রত্যেকটাই আমাদের ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হইব, তার পূর্বাভাস দেয় (আমাদের রচনার এই অংশটা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে লিখিত হইছিল। বিপ্লব বিষয়ে ইমরুলের মেজাজ, চিন্তা ও পরিকল্পনা বোঝার জন্য প্যারাগ্রাফখানা এইভাবে রাখা হইল)।

লাল জুলাইয়ের আগেই তিনি সাম্প্রতিক পলিটিকস, আর্ট-কালচার, বিশেষ করে, আমাদের সিনেমার হাল-হকিকত নিয়া কিতাব রচনা করেন। পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল ও লেখক হিসাবে, ইমরুল হাসান বহুগামী হওয়ার কারণে, আলাদা আলাদাভাবে, ডিফরেন্ট ডিফরেন্ট সেক্টরে তান কাজ-কামের বিবরণ ও পর্যালোচনা হওয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। বলা ভালো, কবিতার বাইরে অপরাপর পরিচয়ের ইমরুল হাসানরে নিয়া আমাদের নিচের আলাপ মোটাদাগে ‘ইন্ট্রোডাক্টরি’।

তো, জুলাইয়ের পরে লেখক হজরত ইমরুল হাসান একজন বক্তাও হইয়া উঠছেন বেশ! অনেক অনেক জায়গায়, অনেক অনেক বিষয়ে তিনি ওয়াজ কর‍তেছেন। এইসব বক্তৃতায় তিনি টপিক হিসাবে আর্ট কালচারের চাইতে সমাজ ও রাজনীতি নিয়াই কথা বলতেছেন বেশি বেশি।

আমাদের অনুমান, লেখক ইমরুল হাসান তান পাবলিক লেকচারে জাতীয় রাজনীতির পাশাপাশি আর্ট কালচারের টপিকও ইনক্লুড করতে পারেন। যাতে, এই বাবতে তিনি তান লেখক জীবনের এক্সপেরিয়েন্সরে অনেকটাই কাজে লাগাইতে পারেন।

‘প্রিন্ট পোয়েট্রি’ প্রকাশনার মাধ্যমে তিনি অনেক আগ হইতে আমাদের সাহিত্য ও ভাষায় একটা ‘বাংলাদেশি পরিচয়ের’ জায়গা নিয়া কাজ করতেছেন। এইটা তান সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে আরো গতি পাইছে। এসব কর্মকাণ্ডের মূলে, আমাদের সাহিত্য ও জবানে একটা কমন, জাতীয় ও বাংলাদেশি পরিচয়রে ধরবার কুশিশ খিয়াল করি। আমরা এই ব্যাপারে ওরিড। এই কারণে যে, যেকুনু অ্যাকটিভিজমই একটা সাধারণীকরণের দিকে ঝুঁকতে পারে। আমাদের ভাষা ও সাহিত্য বাবতে যেকুনু ‘জেনারালাইজেশন’ নেগেটিভ ফল নিয়া আসতে বাধ্য। অবশ্য, বাংলাদেশের ভাষা ও সাহিত্যের বৈচিত্র্য, ধরন ও রেঞ্জ বিষয়ে যেকুনু তৎপরতাই, প্রাইমারিলি, একটা ভেরি মাচ ওয়েলকাম ঘটনা।

এদিকে জুলাই-পরবর্তীতেও চিন্তক ও অ্যাকটিভিস্ট ইমরুল হাসানের নানাবিধ অনলাইন তৎপরতা সমানতালে চলমান (অপরাপর তৎপরতার পাশাপাশি)। এতে মোটাদাগে, বাঙ্গালি পরিচয়বাদরে লক্ষ করি সমালোচনা উৎপাদনের একটা ঝোঁক খিয়াল করি। এইটা জরুরি, সময়োচিত ও সাহসী ঘটনা। হইলে, এতে মুসলিম পরিচয়বাদী, বাংলাদেশি পরিচয়বাদী বা রিয়েকশনিস্ট ঘরানার নানান পরিচয়বাদীদেরকে অ্যাড্রেস করা অল্প হয়; বা, হয়ই না। কিন্তুক, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইডিওলজিকাল জটিলতার পিছনে শুধুমাত্র বাঙ্গালি পরিচয়বাদীরাই দায়ী, এমনটা ভাবা অমূলক। যেমন, ষাটের দশকে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের উত্থানের পিছনে মুসলমান পরিচয়বাদী জনগোষ্ঠীর ব্যপক অবদান আছিল। চব্বিশের পরে, তাদের অনেক ক্ষেত্রে ‘আনক্রিটিকাল’ উত্থান বা কর্মকাণ্ড, ইমরুল হাসানসহ আমাদের সম্মিলিত, দীর্ঘ সংগ্রামের ফলে অর্জিত; লাল জুলাইরে নানাভাবেই বিপদে ফালাইতে সক্ষম।

হজরত ইমরুল হাসানের জন্মদিনে আমাদের একটাই দোয়া—আল্লাহ তানরে দীর্ঘ হায়াত দান করুক। যাতে তিনি আমাদের সমাজে, চিন্তায়, কৃষ্টিতে ও অপরাপর সেক্টরে ব্যাপকতর অবদান রাখতে পারেন!

লেখক: কবি ও সমালোচক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন