ফররুখ আহমদের গল্পে ভেঙে পড়ার এস্থেটিকস

ফররুখ আহমদের গল্পে ভেঙে পড়ার এস্থেটিকস

বাংলা ১৩৪৪ সনে—অর্থাৎ ১৯৩৭ সালে ফররুখ আহমদের সাহিত্যজীবন শুরু হয় কবিতা ও গল্প লিখে। সেই বছর তার রচনা বুলবুল ও মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বুলবুল পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৪৪ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘রাত্রি’ সনেটটি তার প্রথম প্রকাশিত কবিতা বলে ধরা হয়। পরের মাসে, ভাদ্র ১৩৪৪‑এ মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্প ‘অন্তর্লীন’। পরবর্তী তিন বছরে এই পত্রিকায় মোট পাঁচটি গল্প প্রকাশিত হয় : ‘অন্তর্লীন’, ‘বিবর্ণ’, ‘মৃত বসুধা’, ‘যে পুতুল ডলির মা’ এবং ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’। এই গল্পগুলো ১৩৪৪ থেকে ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে—অর্থাৎ ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালে প্রকাশিত হয়।

ফররুখ আহমদের গল্প লেখার সময়টা তার জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। ১৯৩৭ সালে খুলনা থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি কলকাতার রিপন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে সেখান থেকে আইএ পাস করেন। এ সময়ে তার সাহিত্যিক জীবনের শুরু হয়, কবিতা আর গল্প দুটোই একসঙ্গে বেড়ে ওঠে। পরের দিকে তার জীবন আর সাহিত্য কলকাতা আর ঢাকার চারদিকে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু যে গল্পগুলো আমরা জানি, সেগুলো মূলত কলকাতার সময়ের সৃষ্টি।

বিজ্ঞাপন

১৯৩৯ সালের পর ফররুখ আহমদ আর নিয়মিত গল্প লিখতেন কি না, তা জানা যায় না। কিন্তু পরের সময়ে কথাসাহিত্য লেখার একটা অসম্পূর্ণ চেষ্টার সন্ধান মেলে। ১৩৫৩ বঙ্গাব্দের মৃত্তিকা পত্রিকার আষাঢ়-শ্রাবণ সংখ্যায় তার ‘সিকান্দার শা-র ঘোড়া’ নামে একটা অসমাপ্ত গদ্য প্রকাশিত হয়। রচনাটির শেষে ‘ক্রমশ’ লেখা আছে কিন্তু পরের অংশ আর বের হয়নি। পুরোনো পত্রিকার পাতায় তার আরো কোনো অপ্রকাশিত বা ভুলে যাওয়া গল্প আছে কি না, তা ভবিষ্যতের গবেষণার কাজ। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, পরের দিকে ফররুখ আহমদ গল্প লেখা ছেড়ে কবিতা লেখাকেই তার মূল সাহিত্যিক প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন।

ফররুখ আহমদের গল্পগুলোর মধ্যে এক গভীর সূত্র লুকিয়ে আছে। মৃত বসুধা গ্রামের গলি, বিবর্ণ নদীতীরের কুয়াশা, অন্তর্লীন শহরের গলি, যে পুতুল ডলির মা মধ্যবিত্ত সংসার এবং প্রচ্ছন্ন নায়িকা কলকাতার রাত— সবখানেই ক্ষয়ের ছাপ দেখা যায়। ক্ষয় এখানে শুধু কাহিনির অংশ নয়, গল্পের গঠনও ক্ষয়কে অনুসরণ করে।

‘মৃত বসুধা’-য় সোনারগাঁর বৃদ্ধ খোন্দকার রউফ সাহেবের জীবন দিয়েই গল্প শুরু হয়। নদীর ঘাটে বসা গ্রামের বৃদ্ধরা মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকে আর সেখান থেকে ফ্ল্যাশব্যাকে উঠে আসে রউফের যৌবন, যে যৌবন ছিল ইস্পাতের মতো দৃঢ় ও দেওদারের মতো উন্নত। সেই শক্তিমান মানুষটি ভোগের আগুনে নিজেকেই পুড়িয়েছে। ফররুখ তার পতনকে একটি উপমার মালায় গেঁথেছেন। ‘যে-চঞ্চলতায় আঁধার থাকতে পাখি বাসা ছেড়ে উড়ে গিয়ে শিকারির হাতে ধরা দেয়’, সেই আত্মঘাতী ভোগস্পৃহার চিত্রটি গল্পের প্রথম পর্বের সারাংশ। উপমাটি ঠিক জায়গায় বসে, কারণ এর ভেতরে ভোগ ও ধ্বংসের সম্পর্কটি ধরা পড়ে। গল্পের শেষ বাক্য ‘বসুধা ওখানে মৃত—উৎপাদিকা শক্তিহীন’ সমগ্র গ্রামের বন্ধ্যত্বকে এক বাক্যে ধরে। রউফ সাহেবের মতো চরিত্রের পতন শুধু ব্যক্তির নয়, একটি সমাজের ক্ষয়ের প্রতীক। তার দুর্বলতার সামনে রাহেলা ও সুফিয়ার জীবন যেন নীরব সাক্ষী।

‘বিবর্ণ’ গল্পটি একটি সামান্য বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে কিন্তু এর শিল্প খুব গভীর। হাসিনা নামের এক মেয়ের জীবন নিয়ে গল্পটি এগোয়। তার ভালোবাসা, বিয়ে আর নদীর ভাঙন এগুলো গল্পের মূল উপাদান। নদী এখানে শুধু একটি জায়গা নয়, এটি হাসিনার জীবনের ভেঙে যাওয়ার প্রতীক। আড়িয়াল খাঁ নদীর ভাঙন দেখায় প্রকৃতি আর মানুষের মধ্যে কী সম্পর্ক আছে। ভাষায় গল্পটি উপমা আর পুনরাবৃত্তি দিয়ে ভরে রাখা হয়েছে। ‘বিবর্ণ আকাশ আর বিবর্ণ আশাহীন মন’ এমন বাক্যগুলো গল্পের নামটি নিজে থেকে বিষণ্ণ সুর দিয়ে দেয়। ফররুখের কবিস্বভাব এখানে স্পষ্ট। তিনি বর্ণনাকে সংগীতের মতো সাজিয়েছেন। ফলে গল্পে ঘটনা থেকে অনুভূতি বেশি গুরুত্ব পায়।

‘অন্তর্লীন’ গল্পটি মান্নান সৈয়দের ভূমিকায় বিশেষ উল্লেখযোগ্য, কারণ এটি ফররুখের প্রথম প্রকাশিত গল্প। গল্পের কেন্দ্রে শাহরিয়ার ও রেহানা। শাহরিয়ার কল্পনাবিলাসী এবং ফাঁপা স্বপ্নের মানুষ, শাহরিয়ারের সংসারে বিয়ে এসেছে কিন্তু সন্তান আসেনি। রেহানার সন্তান কামনা দমিত, অন্তঃসলিল আকাঙ্ক্ষা, যা বাইরের জগৎ স্বীকার করে না। একটি বাক্য এই দমিত কামনার চিত্র দেয় : রেহানা একদিন তীব্রভাবে সন্তান কামনা করেছিল, আর সেই তৃষ্ণা অতৃপ্ত রয়ে যায়। এখানে ফররুখ নারীর দেহ ও মনের প্রকৃতি নির্মমভাবে স্পষ্ট করেন। রেহানার আকাঙ্ক্ষা শুধু দৈহিক নয়, রেহানার সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাতৃত্বের প্রবল ক্ষুধা। গল্পের শেষে রেহানার মৃত্যু ও শাহরিয়ারের বিপর্যয় একসঙ্গে ঘটে, যা পাঠকের মনে নীরব বেদনা রেখে যায়।

‘যে পুতুল ডলির মা’ গল্পে ভাঙন খুব সূক্ষ্মভাবে দেখা যায়। এখানে ভাঙা হয়ে ওঠে আনন্দের মুখোশের নিচে। ডলি তার পুতুল নিয়ে খেলে, আর তার মা তার খেলাটা শুধু শিশুর আনন্দ হিসেবে দেখেন না, বরং তার নিজের অসম্পূর্ণ মাতৃত্বের একটা ছবি দেখেন। পুতুল ধীরে ধীরে এমন একটা বস্তু হয়ে ওঠে, যার চারপাশে কামনা, স্নেহ আর ক্ষোভ জমে ওঠে। গল্পের শেষ দিকে স্বপ্নের ভেতরে সেই পুতুলের মুখে একটা অবোধগম্য হাসি ফুটে ওঠে, যা পাঠককে সতর্ক করে যে এই সংসারের শান্ত আবরণের নিচে কিছু ভেঙে যাচ্ছে।

‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’ ফররুখ আহমদের সবচেয়ে পরিণত ও শ্রেষ্ঠ গল্প। কলকাতার রাতের পটভূমিতে হারুন, ওয়াজেদ ও সালমা নামের তিন চরিত্রের সম্পর্ক গল্পের কাঠামো গড়ে। হারুন একজন ভবঘুরে বুদ্ধিজীবী-প্রতিম যুবক, ওয়াজেদ আদর্শবাদী কর্মী আর সালমা সমাজসেবিকা নারী, যার জীবনও সমাজের কাজের মধ্যে আটকে আছে। গল্পের ভাষা ও পরিবেশ অনেক বেশি সংহত। প্রথম বাক্যটিই এর প্রমাণ : ‘শেষ রাত্রি’। এই ছোট বাক্যে রাতের অন্ধকার ও গল্পের ইঙ্গিত একসঙ্গে ধরা দেয়। ফররুখ এখানে কবিতার সংক্ষিপ্ততা ও চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন কিন্তু চরিত্রের মনোজগৎ গদ্যের ধারায় বিশ্লেষিত হয়েছে। মান্নান সৈয়দ ঠিক এই জায়গাতেই বলেন যে কবির গদ্য নির্মাণ করে একটি নিজস্ব পথ।

ফররুখ আহমদের পাঁচটি গল্পেই অবক্ষয়, শীতলতা ও নাস্তির প্রাধান্য লক্ষ করা যায়। শুধু এই গল্পগুলোর ভিত্তিতে তাকে শূন্যতাবাদী ও অবক্ষয়ী লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা যেত। কিন্তু নিবিড় পাঠে বিশেষত ‘মৃত বসুধা’ ও ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’ গল্পে দেখা যায়, তিনি নির্বিচার ভোগবাদের সমর্থক নন বরং এর বিরোধী। সমকালীন জীবনের ছাপও গল্পগুলোতে স্পষ্ট। ‘বিবর্ণ’ গল্পে কলকাতা মহানগরীর শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে, ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’ গল্পে হারুণের বিপ্লবী চেতনা ও আদর্শভঙ্গের মধ্য দিয়ে লেখকের প্রথম জীবনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের কোনো ছায়াপাত ঘটেছে কি না, সে প্রশ্নও ওঠে। কবি-কন্যার স্মৃতিচারণে জানা যায়, ‘প্রথম জীবনে আব্বা ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত মানবতাবাদী কমরেড এমএন রাঁয়ের শিষ্য।’ গল্পের হারুণও ‘বিশেষ করে বিপ্লবী রাশিয়ার’ ভক্ত। কিন্তু মহিলা সমিতির নেত্রী সালেমা বেগমের নৈতিক স্খলন সম্পর্কে জেনে তার মোহভঙ্গ ঘটে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পূর্বাভাসময় অস্থির সময়ে রচিত এই গল্পগুলোতে যেন আসন্ন বিপর্যয়ের প্রাক্‌ছায়া পড়েছে। ফররুখ তখন তরুণ; তবু তার গল্পের অবক্ষয়, নৈতিক সংকট ও শ্বাসরুদ্ধকর জীবনবোধে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের বিপর্যস্ত দিনগুলোর আগাম আভাস যেন অনুভব করা যায়।

ফররুখ আহমদের গল্পগুলো পাঠ করলে বোঝা যায় যে এগুলো শুধু কবির অবসরের বিনোদন নয়। এখানে আছে একজন তরুণ লেখকের আত্মানুসন্ধান, কাঠামোর প্রতি সচেতনতা এবং মানুষের ভঙ্গুরতার প্রতি সহানুভূতি। মান্নান সৈয়দের ভূমিকা এই গল্পগুলোর পথ দেখায় আর পাঠক দেখতে পান, কবির গদ্যেও কীভাবে বাংলা সাহিত্যের একটি নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা লুকিয়ে ছিল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...