প্রার্থনার বেলায় তিনি মুসলিম সমাজে সদা সর্বদা প্রচলিত রীতি পরিত্যাগ করে এ বিশ্ব সংসারকে একটি বিস্তৃত মহাসাগর রূপে কল্পনা করেছেন এবং তার মধ্যে তাকে এক ভাসমান তৃণখণ্ড রূপে ধারণা করে বলেছেন :
আল্লা ভব সমুদ্দুরে ও আল্লা ভব সমুদ্দুরে
তরাইয়া লও মোরে।
তরান বরান চাই না আমি কেবল চাই
তোমারে
তরাও মার যাই কর,
তরাও মারো যাই করো এর লাগি কে ঝুরে,
হাছন রাজার মনের সাধ দেখিতে তোমারে।
আবার অন্যক্ষেত্রে তিনি এ উপমা পরিত্যাগ করে অন্য উপমার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। তিনি নিজেকে এ সংসারে একজন পর্যটক হিসেবে ধারণা করেছেন। এ পর্যটক আবার নানা অভিজ্ঞতা লাভ করে তার স্বদেশে ফিরে যেতে চান। তবে তার সম্মুখে রয়েছে এক বিরাট নদী। এ নদী পারাপারের একমাত্র মাধ্যম একখানা নৌকা এবং তার মাঝি ‘গফুর’। এজন্য ব্যাকুল চিত্তে তিনি সে মাঝিকে আহ্বান করে বলেছেন :
ঠাকুর মোরে পার করবায়নি
পয়সা কড়ি নাহি গফুর রহিম
খেওয়ানী।
প্রথমে খেওয়ানীর নির্দয়তা সম্বন্ধে সন্দিহান হয়ে তিনি ভয়ে কাঁপতে থাকেন। অতি সহজেই খেওয়ানীর সহানুভূতিপূর্ণ বদন মণ্ডলে তার কোমল হৃদয়ের আভাস পেয়ে তিনি উল্লসিত হয়ে বলেন, ‘খেওয়ানীর মুখ দেখিয়া মনে হইছে আশা।’ তবে এ পথের পথিকের নিকট মাত্র একটি লক্ষ্য একটি বাসনাই বর্তমান। সে আর কিছু নয়, তার প্রভুর পাশে চায় একটুখানি স্থান।
খেওয়ানীর মুখ দেখিয়া মনে হইছে আশা
পার করিয়া দিব মোরে হইয়াছে ভরসা।
কান্দিয়া মিনতি করে হাছন রাজা দাসা
পার করিয়া চরণ তলে করো মোরে মোর-রাসা।
এতে স্পষ্টই বোঝা যায় তিনি অস্বস্তিতে কাতর হয়ে পড়েছেন। তিনি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি একটি ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে পতিত লোকের মতো হাবুডুবু খাচ্ছেন। এ সংকটে অন্য কোনো গুরু, কোনো পথ প্রদর্শকেব তিনি সন্ধান পাচ্ছেন না, কেবলমাত্র আল্লাহর করুণায় প্রার্থী হয়েই তিনি তার সাহায্য প্রার্থনা করেছেন :
এই ভিক্ষা চাই ঠাকুর, তোমার ঠাঁই
চরণ ছাড়া করিও না তোমার দোহাই।
কান্দিয়া মিনতি করে হাছন রাজায় কয়,
কিবা মোরে পদে রাখ কিবা কর লয়।
এ দুঃসময়ে হাছন রাজার একমাত্র প্রার্থনা:
ভবসিন্ধুর চাকে আমি ঘুরিয়া ঘুরিয়া ফিরি
উঠিবার শক্তি নাই, কেমনে কী করি।।
এমন সংকট চাক, উঠা নাহি যায়।
হাদি আল্লা করিয়া দেও তাহার উপায়।
হাছন রাজার এ সংকটকালে গুরুজি আল্লাহরও কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মিনতির সুরে হাছন রাজা বলছেন :
হাছন রাজা বলে মুর্শিদ কর তায় উপায়
ভব সিন্ধু উদ্ধারিক, রাখো রাঙ্গা পায়।
অকস্মাৎ বিস্ময়ের সঙ্গেই তিনি আবিষ্কার করেনÑ
অন্যখানে খুঁজি কেন, তুমি আমার মাঝে
বুকেতে রাখিমু তোরে, কী ধরাইব লাজে।
হাছন রাজায় উক্তি করে নিজে, নিজেরে পুঁজে
আমি তো কিছুই নই, সকলই তুমি যে।।
এক্ষেত্রে সর্বেশ্বরবাদের একটুখানি ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে হাছন রাজার সর্বেশ্বরবাদ অন্যান্য সর্বেশ্বরবাদ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক।
এরূপ মানসের একজন অন্বেষণকারীর পক্ষে মোল্লাসমাজের কপটতা ও ভণ্ডামি স্বভাবিকভাবেই অসহনীয়। এ সমাজের লোকেরা আপনাদের সাধারণ মানুষ থেকে বহু ঊর্ধ্বে অবস্থিত বলে ধারণা করে। এরা অন্ধভাবে শরিয়তের শাসন-অনুশাসন করে ধর্মের প্রকৃত প্রাণসত্তার সন্ধান পায় না। হাছন রাজা পরিহাস করে এ শ্রেণির চক্ষু উন্মীলন করার উদ্দেশ্যে মোল্লা শ্রেণির এক মেয়েকে উদ্দেশ করে বলেনÑ
কারে বন্ধে করিবা পার মোল্লার ঝি
কারে বন্ধে করিবা পার।।
তোর বাপে করে নামাজ রোজা
আমি গোনাগার।।
তোমার বাপে দিনে রাইতে নামাজ রোজা করে
লোক সমাজে বসিয়া কেন নিন্দা করে মরে।
তোমার বাপে দিনে রাইতে করে এবাদত
মুই গোনাহগার না লই মোল্লার মত।
চোখ থাকিতে দিনের কানার মতো নাহি চাই।
সম্মুখে যে বন্ধু খাড়া মোল্লায় বলছে কৈ
হাছন রাজার আল্লারে মোল্লায় নাহি দেখে
আজলের আন্ধি লাগছে কট মোল্লার আখরে।
বাইরের এ তপস্যা বা প্রার্থনার সংশোধন দ্বারা অন্তিম সময় কোনো লাভ হবে না। অন্বেষণকারীর আন্তরিকতা এবং তার হৃদয়ের পবিত্রতাই মুমিনের মুক্তির দুটি কারণ। তবে এগুলোর সঙ্গে প্রেমও যুক্ত হওয়া চাই। প্রেম কেবল হাছন রাজার কাছে নয়, সকল শ্রেণির মুসলিম মরমীবাদীর কাছে সত্য লাভের একমাত্র মাধ্যম এবং এ প্রেম থেকেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তি।
শরিয়তের অনুশীলন ও ভুয়া শরিয়তপন্থির সমালোচনার স্তর থেকে হাছন রাজা প্রেমের স্তরে উপনীত হয়ে প্রেম সম্বন্ধে তার অভিজ্ঞতা ও প্রেমের কার্যকারিতা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন :
প্রেমের বাজারে বিকে মানিক সোনারে
যেই জনে চিনিয়া কিনে লভ্য হয় তায় দুনারে।
সুবুদ্ধি ও সাধু যারা, প্রেম বাজারে যায় যে তারা,
নির্বুদ্ধিরা ভব-বাজারে, বেগার খাটিয়া মরে রে।
* * * * *
মানিক রত্ন না কিনিলাম, প্রেম বাজারে যাইয়া
ভব-বাজারে বোকার মতো রহিয়াছে বসিয়া।
হাছন রাজায় বলে আমার কী লিখিয়াছ ললাটে
যা লিখিয়াছে নিরঞ্জন সেকি আর মিটেরে।
এখানে নিরাশার চরম সুর দেখা দিয়েছে। নিরঞ্জনের লেখা কখনোই মুছে ফেলা যায় না। প্রেমের রাজ্যে হাছন রাজা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে প্রবেশ করেননি। প্রেমই অনিবার্য আকর্ষণের দ্বারা প্রেমাস্পদের পানে তাকে টেনে নিয়েছে। তার কাছে প্রেম ভীষণ জ্বরের মতো। সে জ্বরে হাড়-মাংস সব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়:
প্রেম জ্বরে, আমি মরি গো, প্রেম জ্বরে-
এগো প্রেম জ্বরে প্রাণ যায়- এখন কি যে করি গো।
এ প্রেমের গরজেই হাছন রাজা মাঝে মাঝে আপনাকে বিকিয়ে দিতে চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি তাকে একটি সুন্দরী কুমারীর সঙ্গে তুলনা করে তার প্রেমাস্পদের নিকট নজরানাস্বরূপ প্রেরিত হতে চাচ্ছেনÑ
বিকাইলেনি বন্ধে কিনে গো সজনী সই-
সইয়া গো বিকাইলেনি বন্ধে কিনে?
তিনি নিজেই জানেন না, তার এ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হৃদয়ের কী পরিণতি ঘটেছে। এজন্য তিনি চিৎকার করে বলেছেন :
তার লাগি মন আর ধৈর্য না মানে
না জানি কী কইলো মোরে মন মোহনে গো।
কেন তিনি তার প্রেমাস্পদের জন্য এত বিচলিত হয়েছেন? তিনি নিজের আত্মপ্রত্যয় থেকেই তার উত্তর দিচ্ছেন :
তার সম কেহই নাইগো এ ত্রিভুবনে।
তার মতো নাহি দেখি ধিয়ানে জ্ঞানে গো।
প্রেমাস্পদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার এ বাসনা আনিবার্যভাবেই দেখা দিয়েছে-
হাছন রাজার মনের মাঝে জিয়নে মরণে-
সর্বদা থাকিতাম আমি বন্ধের চরণে।
আবার যখন সম্বিৎহারা অবস্থায় তিনি তার এ প্রেমাস্পদকে তার আলিঙ্গনের মধ্যে পাচ্ছেন, তখন তিনি তার পৃথক সত্তার বিলোপ করে বলছেন :
আঞ্জা করিয়া ধরিয়া, বুকে বুকে মিলাইয়া,
হাছন রাজা নামটি ভার, দিল মিটাইয়া।
তবুও এসব ঐক্যকে সাময়িকই বলতে হবে। এগুলো প্রেমিকের জীবনে স্থায়ী নয়। ক্ষণিক একাত্মতা সম্বন্ধে সচেতন হয়ে এবং তার ও তার প্রেমাস্পদের মধ্যে পার্থক্য অনুভব করে, তিনি তার মনকে অন্তর্লোকে নিবদ্ধ করেন। তার মানসের বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপ তিনি মানসচক্ষে অবলোকন করে তার এ রোগের বিভিন্ন উপসর্গ আবিষ্কার করতে সমর্থ হন :
নিশা লাগিল রে, নিশা লাগিল রে-
হাছন রাজা পেয়ারির প্রেমে মজিলরে।
ছটফট করে হাছন দেখিয়া চান্দমুখ-
হাছন জানের মুখ দেখি গেল মনের দুখ।
যদিও এ রোগের উপসর্গ আপাতদৃষ্টিতে ছিল সাংঘাতিক, তবুও প্রেমাস্পদের দর্শন লাভে সব জ্বালা-যন্ত্রণার উপশম হয় এবং তার স্বাভাবিক অবস্থা লাভে তিনি সক্ষম হন। সে প্রেমাস্পদের দর্শন লাভে বরং হাছন রাজার জীবনে অভূতপূর্ব আনন্দের সৃষ্টি হয় :
হাছন জানের মুখ দেখিয়া ফালদি ফালদি উঠে,
দিনে রাইতে হাছন রাজার চিড়া-বাড়া কুটে।
এ প্রেমের প্রতিক্রিয়া প্রেমিকের জীবনে কীভাবে দেখা দেয়? হাছন রাজার উত্তর এক্ষেত্রে অতিশয় স্পষ্ট :
পিরিতের মানুষ যারা, আউলা ঝাউলা হয় যে তারা,
হাছন রাজা পিরিতি করিয়া, হইয়াছে বুদ্ধিহারা।
পিরিতের এমনি ধারা, মনপ্রাণ করেছে সারা,
আরো করে কারা কারা, লাগল যার পিরিতের বেড়া।
এখানেই হাছন রাজার প্রেমতত্ত্বের পরিচয় পাওয়া যায়। তার কাছে প্রেমের মধ্যে এমন একটি শক্তি রয়েছে, যার কার্যকারিতায় দেহ ও মন উভয়ই বিনষ্ট হয়। তবে এ বিনাশের অর্থ ব্রহ্মে বিলীন হওয়া বা মহাশূন্যে নির্বাণ লাভ নয়, এর সোজা অর্থ কামনা-বাসনার পরিসমাপ্তি। এ স্থলে বিনাশের অর্থ সত্যিকার আত্মার বিনাশ নয়, তথাকথিত দেহের সঙ্গে সর্বতোভাবে বিজড়িত নফসের বিনাশ।
সতিকার আত্মার অনুভূতিতে এখন সংসারের প্রতি আসক্তিই সবচেয়ে মারাত্মক প্রতিবন্ধক। খাঁটি অনুসন্ধানীর পক্ষে এ জগতের নানাবিধ সম্পদ সর্বদাই পরিত্যাজ্য। এ সম্পদগুলোই আত্মার চরম লক্ষ্যে পৌঁছাতে বিঘ্নের সৃষ্টি করে। কবি রজনীকান্ত সেন এজন্য বলেছেন :
এই গুলি সব মায়াময় রূপে
ফেলেছিল মোরে অহমিকা রূপে।
এ দুনিয়ার এমন কী চিরস্থায়ী মূল্য থাকতে পারে? আজ না হয় কাল, এগুলো ত্যাগ করেই মানুষকে চলে যেতে হবে। এজন্যই হাছন রাজা তার প্রভুর সঙ্গে মিলনের জন্য তার সবকিছুকেই তুচ্ছজ্ঞান করেছেন :
কীসের বাড়ি, কীসের ঘর, কীসের জমিদারি
সঙ্গের সঙ্গীরা কেহই নাহি তো, কেবল একাশ্বরী।
এই তো তোর ধনে জনে সুন্দর সুন্দর স্ত্রী
কেহই নি যাইবে সঙ্গে যমে নিতে ধরি।
এজন্যই তিনি তার প্রেমাস্পদের বাচনিক তার নিজেকে উদ্দেশ করে উপদেশ দিচ্ছেন :
শুনরে হাছন আমার বচন, তুমি যে আমারি
ভবের মায়া ছাড়িয়ে সদায় থাক চরণ ধরি।
তাই সে প্রেম থেকেই স্বাভাবিকভাবেই বৈরাগ্য দেখা দেয়। এ-মর জগতের অনিত্যতা কেবল তাকে এ জগতের প্রতি বীতস্পৃহ করেনি, এ সংসারে তাকে ভোগ-বিলাসের বাসনা থেকে বিরত করেছে। তিনি সাহেব সুবোর দরবারে, কারচুপি কাজ করা শাহি লেবাস পরে উপস্থিত হলেও দরবার শেষ হতে না হতে এসব কাপড় খুলে পাতলা ধুতি পরে খালি পায়ে বিরাগীর মতো পায়চারি করতেন। তিনি জীবনে কখনো একখানা পাকাঘর তৈরি করেননি। এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে একটি গানে তিনি উত্তর দিয়েছিলেনÑ
লোকে বলে, বলে রে, ঘর বাড়ি ভালা নাই আমার।
কী ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরও মাঝার।
ভালা করি ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকব আর,
(আর) আয়না দিয়া চাইয়া দেখি পাকনা চুল আমার।
এই ভাবিয়া হাছন রাজায় ঘর দুয়ার না বান্ধে,
কোথায় নিয়া রাখবা আল্লায় এর লাগিয়া কান্দে।
হাছন রাজায় বুঝত যদি বাঁচব কতদিন,
দালান কোঠা বানাইত করিয়া রঙিন।
কেবল এই গানে নয়, অন্যান্য গানেও তিনি এ ক্ষণস্থায়। পৃথিবীর অনিত্যতা সম্বন্ধে নিজেকে হুঁশিয়ার করেছে:
হাছন রাজা মরিয়া গেলে মাটির তণে বাসা
কোথায় রইবে লক্ষণশ্রী আর রঙ্গে রুমপাশা।
হাছন রাজা তাই এ সংসারের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়েছেন কৃত সংকল্প-
ছাড় ছাড় হাছন রাজা এই ভবের আশা,
প্রাণ বন্ধের চরণ তলে কর নিজ বাসারে।
তবে এ স্তরেও হাছন রাজা স্বস্তি লাভ করতে পারেননি। নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিনি বুঝতে পেরেছেনÑএগুলোর মাধ্যমে সত্যের সঙ্গে তার মিলন সম্ভবপর নয়। তিনি পূর্বেই উপলব্ধি করেছেন শরিয়তের বিধান পালন করেও যে প্রেমাস্পদকে পাওয়া যায় না। তার জন্য প্রেমের প্রয়োজন, আবার প্রেমানলে জ্বলে গিয়েও সে প্রেমাস্পদের সাড়া পাওয়া যায় না। সে যন্ত্রণা দেয়। পার্থিব বিষয়ের প্রতি আসক্তি ত্যাগ ব্যতীত তার সঙ্গে মিলন সম্ভব নয়। হাছন রাজা বৈরাগ্যের চরম স্তরে গিয়ে তার প্রেমাস্পদের সঙ্গে মিলিত হতে সক্ষম না হয়ে সর্বশেষ স্তরে বিচার-বুদ্ধির আশ্রয় গ্রহণ করেন। তা থেকেই হাছন মানসের সর্বশেষ পর্যায় আরম্ভ হয়। তখন থেকে প্রেমিক ও বিবাগী হাছন রাজা দার্শনিক হাছন রাজায় পরিণত হন।
এ পর্যায়ে অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়ে হাছন রাজা তার সত্তা সম্বন্ধে বিচার করা কালে সর্বসাধারণে প্রচলিত দেহ-মনের সম্পর্কে ভিত্তিভূমি বলে গ্রহণ করেছেন। দেহ ও মন দুটি সত্তারূপে তার কাছে প্রতিভাত হয়েছে, তারা পরস্পরের ওপর ক্রিয়াশীল। যদিও মানব জীবনে দেহ ও মনের সমান গুরুত্ব রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার আত্মার মাঝেই পাওয়া যায়। হাছন রাজা তার আত্মাকে দেহের মাঝে বন্দি অবস্থায় দেখে কেঁদে আকুল হয়েছেন।
মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দি হইয়ারে
কান্দে হাছন রাজার মন মুনিয়ারে
মায়ে বাপে বন্দি কইলা খুশীরও মাঝারে,
লালে ধলায় বন্দি হইলা, পিঞ্জিরার মাঝারে
উড়িয়া যায়রে ময়না পাখি পিঞ্জিরায় হইল বন্দি
মায়ারূপে লাগাইয়া মায়া জালের আন্দি
পিঞ্জিরায় সামাইয়া ময়নায় ছটফট করে
মজবুত পিঞ্জিরা ময়নায় ভাঙিতে না পারে।
বন্দি আত্মার এ অসহায় অবস্থা হাছন রাজাকে ভাগ্যবাদীতে পরিণত করেছে। তিনি বন্দি আত্মার এ করুণ অবস্থাকে অন্য এক রূপকের মাধ্যমেও প্রকাশ করেছেন-
গুড্ডি উড়াইল মোরে মৌলার হাত-ডুড়ি
হাছন রাজারে যেমন ফিরায় তেমনি দিয়া ফিরি।
হাছন রাজা প্রথম দিকে জীবাত্মা ও পরম আত্মার এরূপ বিরাট সম্বন্ধ অনুভব করেননি। বরং পরমাত্মার হাতে জীবাত্মাকে এক অসহায় ঘুড়ির মতো বলে ধারণা করেছেন। তবে এ অবস্থার পরই তিনি আত্মরূপ দর্শন করে বলেছেনÑ
আঁখি মুঞ্জিয়া দেখো রূপ রেÑ
কাজেই এখানে তার আত্মা আর বন্দি বিহঙ্গও নয়, ঘুড়িও নয়। সে মুক্ত, সে স্বাধীন। সে আর দেহের খাঁচায় ছটফট করে মরছে না, বরং দেহের মাঝেই তার স্বতন্ত্র সত্তা বিরাজ করছে।
সর্বশেষ পর্যায়ে হাছন রাজার কাছে দেহ ও মন বলে পৃথক কোনো বিষয় আর থাকেনি। একই সত্তা নানাবিধ রূপে দেখা দিয়েছে। এ দেহ থেকেই শক্ত আর নরম, ঠান্ডা আর গরমের যেমন উৎপত্তি হয়েছে, তেমনি এ দেহের বর্ণ থেকে মুসলমানি দ্বীনের উৎপত্তি। কাজেই একই দেহের নানাবিধ অঙ্গ থেকে পার্থিব, অপার্থিব, জড় ও অজড় নানাবিধ বিষয়ের উৎপত্তি বলে, দেহ তার জড়তা হারিয়ে অপূর্ব রূপ ধারণ করেছে। তেমনি মনও তার পূর্বের স্বরূপ হারিয়ে অন্য গুণে গুণান্বিত হয়েছে। অর্থাৎ তার জীবনে দেহ ও মন বলে দুটি পৃথক সত্তা আর থাকেনি, একই সত্তার কার্যকরী দুটি দিক থেকেই এ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে সবকিছুরই উৎপত্তি হয়েছে। আধুনিক দর্শনে আল ফ্রেড নর্থ হোয়াইট হেডের বহু পূর্বেই দেহ ও মনের পার্থক্য অস্বীকার করে হাছন রাজা জড় জগতের নানাবিধ বিষয় এবং মানস জগতের নানাবিধ বিষয়ের পার্থক্য এক হিসেবে অস্বীকার করেছেন। তার এ ধারণার অনুসিদ্ধান্ত হিসেবে বলা যায়, দেহ ও মনের মধ্যে কার্যকারিতাগত পার্থক্য থাকতে পারে তবে তার ফলে তারা একেবারে পরস্পরবিরোধী সত্তা নয়।
তবে হাছন রাজা কোনো সময়ই সর্বতোভাবে ভাগ্যবাদী হননি। নিরাশাবাদীও তিনি সম্পূর্ণভাবে ছিলেন না, তিনি বন্দি বিহঙ্গের অথবা উড্ডীয়মান ঘুড়ির মুক্তির সন্ধানও পেয়েছেন। সে বিহঙ্গ খাঁচার মধ্যেও মুক্ত হয়েছে। তাকে খাঁচা থেকে মুক্ত করে দেখার কোনো প্রয়োজন নেই :
আঁখি মুঞ্জিয়া দেখো রূপরে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখো রূপরে
আর দিলের চক্ষে চাহিয়া দেখো বন্ধুয়ার স্বরূপরে
কাজল-কোঠা ঘরের মাঝে বসিয়াছে কালিয়া
দেখিয়া প্রেমের আগুন উঠিল জ্বলিয়া।
সত্যিকার দ্রষ্টব্য স্থান থেকে দেখলে প্রেমিক তার সত্যিকার আত্মা ব্যতীত অন্য কিছু নয়। প্রকৃত প্রেমাস্পদের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়ে হাছন রাজা তার নিজের মাঝেই তাকে আবিষ্কার করে আনন্দের আতিশয্যে আত্মহারা হয়ে পড়েন।
সে প্রেমাস্পদ বাইরের জগতের কোনো সৌন্দর্য নয়। তিনি এ জগৎবহির্ভূত কোনো খোদাও নন। তিনি প্রেমিক থেকে বিভিন্ন কোনো সত্তাও নন। প্রকৃত প্রেমাস্পদ ও প্রেমিকজনে কোনো ভেদাভেদ নেই। তারা একই বিষয়বস্তুর দুটি দিক মাত্র।
এক্ষেত্রে হাছন রাজা মুসলিম জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জালালউদ্দীন রুমীর মতো তারই সত্তায় এ বিশ্ব ভুবনের সবকিছু উৎপত্তি দেখতে পান। তাই আত্মগর্বে অধীর হয়ে তিনি বলেন :
বিচার করি চাইয়া দেখি সকলই আমি সোনা মামি।
সোনা মামি গো আমারে করিলায় বদনামী।
আমি হইতে আল্লা রসুল, আমি হইতে কুল।
পাগল হাছন রাজায় বলে, তাতে নাই ভুল।
আমা হইতে আসমান জমিন, আমি হইতে সব।
আমি হইতে ত্রিজগৎ, আমি হইতে রব।
আমি আউয়াল, আমি আখের, জাহের বাতিন।
না বুঝিয়া দেশের লোক বাসে মোরে ভিন।
আমা হইতে পয়দা হইয়াছে এই ত্রিজগৎ।
গউর করি চালিয়া দেখ হে আমারও মত।
জাকল হইতে পয়দা হইল মাবুদ আল্লার।
বিশ্বাসে করিল পয়দা, রসুল উল্লার।
মম আঁখি হইতে পয়দা আসমান জমিন।
কর্ণেতে হইছে পয়দা, মুসলমানি দিন।
আর পয়দা করিল যে শুনিবারে যত।
সবদ, সবাদ আওয়াজ ইত্যাদি কত।
শরীলে করিল পয়দা শক্ত আর নরম।
আর পয়দা করিয়াছে, ঠান্ডা আর গরম।
আমি হইতে সব উৎপত্তি হাছন রাজায় কয়।
মরণ জীবন নাইরে আমার, ভাবিয়া দেখো ভাই।
ঘর ভাঙিয়া ঘর বানানি এই দেখতে পাই।
পাগল হইয়া হাছন রাজা কীসেতে কী কয়।
মরব মরব দেশের লোক মোর কথা যদি লয়।
জিহ্বায় বানাইয়াছে, মিঠা আর তিতা।
জীবের মরণ নাইরে দেখো সর্বদাই জিতা।
আপন চিনিলে দেখো, খোদা চিনা যায়।
হাছন রাজার আপন চিনিয়ে, এই গান গায়।
এখানে জিজ্ঞাস্য, এ কোনো আত্মা যার অস্তিত্ব সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ হয়ে হাছন রাজা এ দাম্ভিক উক্তি করেছেন? কার প্রশংসা তিনি করেছেন? নিশ্চয়ই তার এ ভঙ্গুর দেহ এবং তার সঙ্গে সম্পৃক্ত বৃত্তি ও প্রবৃত্তির গুণগান তিনি করেননি। তিনি সেই চিরন্তন হাছন রাজার প্রকৃত স্বরূপের বর্ণনা করেছেন।
সেজন্য যদিও ব্যক্তিগত জীবনের অনুষঙ্গ দোষে এ বর্ণনা দূষিত এবং ব্যক্তি-স্বাতন্ত্র্যের নানাবিধ প্রবণতা এতে প্রকাশ পেয়েছে, তা সত্ত্বেও তার ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে যে, তার সে সত্তা তার ব্যক্তি সত্তা নয়, সে হচ্ছে চিরন্তন হাছন রাজা যাকে লালন শাহ ‘মানুষ রতন’ বলে অভিহিত করেছেন।
এ অহমবাদ (?) প্রকাশের একটু পরেই তিনি পরিষ্কার ভাষায় তার মূল বক্তব্যে বলেছেন :
তুমি কে আর আমি বা কে তাই তো-
আমি বুঝি না রে।
একে বিনে দ্বিতীয় আমি, অন্য কিছু দেখি না রে।
তুমি যে জগতের কর্তা, আমি শব্দটা মিথ্যা
একা তুমি বিধাতা, তব শরিক অন্য নাহি রে।
আমি আমি বলে যারা, বোঝে না বোঝে না তারা।
লাগিয়াছে সংসারী বেড়া, মূর্খতা হটিয়ে না রে।
মিছামিছি বলে আমি সর্বব্যাপী হওরে তুমি
সকল তুমি অন্তর্যামী, তুমি ভিন্ন কিছু না রে।
হাছন রাজা নামটি দিয়ে রহিয়াছে ছাপাইয়ে
সবই করো পরদা দিয়ে দোষের ভাগী হও না রে
বুঝিয়ে দেখি যেই বই, হাছন রাজা কিছুই নই-
হাছন রাজা যারে কই সেও দেখি তুমিই রে।
তুমি কে আর আমি বা কে, তাই তো আমি বুঝি না রে।
তাহলে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে তার সত্তার পরিচয় তাকে দেবতার শ্রেণিতে উন্নীত করেনি; বরং উল্টোদিকে মানব জীবনের প্রতিনিধিত্ব সম্বন্ধে তাকে সচেতন করে তুলেছে। সে সত্তাকে ইসলাম জগতের সকল সুফিই প্রতিভাসিত পর্যায়ে অসীমেরই একরূপ বলে ধারণা করেছেন।
এখানেই হাছন রাজার জীবন-দর্শনের বিশেষত্ব। হাছন রাজা অন্য সর্বেশ্বরবাদীদের মতো বুদ্ধির মাধ্যমে সর্বেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠা করেননি। তার জীবনে তার দেহের ও মনের সবগুলোর বৃত্তি ও প্রবৃত্তির মাধ্যমে সে সর্বেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠা করার সাধনা করেছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

