শাহ্ আবদুল হালিমের ‘সংস্কৃতির পুনঃপাঠ’ আধুনিক মুসলিম সমাজে সংস্কৃতিকে পুনর্মূল্যায়ন এবং নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার একটি গভীর প্রচেষ্টা। বইটি শুরু হয় ‘সংস্কৃতি’ অধ্যায় দিয়ে, যেখানে লেখক দেখিয়েছেন সংস্কৃতি কেবল শিল্প, বিনোদন বা ঐতিহ্যের সমষ্টি নয়; বরং এটি মানুষের বিশ্বাস, সামাজিক আচরণ, নৈতিকতা, ভাষা ও চিন্তাশক্তির সমন্বিত কাঠামো। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, যেকোনো সমাজের মানসিক ও নৈতিক অগ্রগতি মূলত তার সংস্কৃতির গভীরতার সঙ্গে সম্পর্কিত। পরবর্তী অধ্যায় ‘ইসলাম ও প্লুরালিস্ট সংস্কৃতি’ পাঠককে জানায়, ইসলাম কোনো একরৈখিক সাংস্কৃতিক মডেল চাপিয়ে দেয়নি; বরং নৈতিক ও মানবিক সীমার মধ্যে বহুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে। হালিম উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে ইতিহাসে মুসলিম সমাজ বিভিন্ন স্থানীয় সংস্কৃতি, আচার-প্রথা ও চিন্তাধারাকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা বহুত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ। এরপর ‘সাংস্কৃতিক সংকট’ অধ্যায়ে তিনি সমকালীন সমাজের সংকটকে আত্মপরিচয়হীনতা, ভোগবাদ, অনুকরণপ্রবণতা এবং নৈতিক বিভ্রান্তির সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তিনি যুক্তি দেন, এই সংকটের মূল কারণ বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক দুর্বলতা। এই ধারাবাহিকতা ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কার’ অধ্যায়ে আরো দৃঢ় হয়, যেখানে হালিম দেখিয়েছেন, সংস্কার মানে কেবল আচরণ পরিবর্তন নয়; বরং চিন্তাধারা, মূল্যবোধ এবং প্রশ্ন করার ক্ষমতার পুনর্গঠন।
সংস্কৃতির রূপান্তর, অগ্রযাত্রা ও বিন্যাস
পরবর্তী অধ্যায়গুলো—‘সংস্কৃতির রূপান্তর এক’, ‘সংস্কৃতির রূপান্তর দুই’, ‘সংস্কৃতির স্বরূপ’, ‘সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা’, ‘সংস্কৃতির বিন্যাস’, ‘সংস্কৃতির লালন’—শাহ্ আবদুল হালিমের সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে গভীরতা দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, সংস্কৃতি কোনো স্থির সত্তা নয়; এটি রাজনৈতিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, প্রযুক্তি ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে ক্রমেই রূপান্তরিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, আধুনিক রাষ্ট্র, বাজারব্যবস্থার প্রভাব, গণমাধ্যম ও প্রযুক্তি মানুষের সাংস্কৃতিক অভ্যাস ও রুচিকে প্রভাবিত করছে। ‘সংস্কৃতির স্বরূপ’ অধ্যায়ে তিনি সংস্কৃতির একটি ধারণাগত কাঠামো স্থাপন করেছেন, যেখানে আচরণ, বিশ্বাস, ভাষা ও নৈতিকতা একত্র হয়ে সংস্কৃতিকে সংজ্ঞায়িত করে। ‘সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা’ প্রবন্ধে হালিম দেখিয়েছেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও ভোগের বিস্তার মানবিক উন্নতির নিশ্চয়তা দেয় না; বরং নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে মূল্যায়ন করতে হবে। ‘সংস্কৃতির বিন্যাস’ প্রবন্ধে সমাজের ভেতরে সংস্কৃতির স্তর—এলিট সংস্কৃতি, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং প্রান্তিক সংস্কৃতির সম্পর্ক—উন্মোচিত হয়েছে। ‘সংস্কৃতির লালন’ অধ্যায়ে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক পরিবেশকে সংস্কৃতি সংরক্ষণের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই অংশে শাহ্ আবদুল হালিম আধুনিকতার প্রতি আশাবাদ এবং অতীতমুখী নস্টালজিয়ার মধ্যে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
শিক্ষা, ভাষা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি
‘শিক্ষার সংকট’ অধ্যায়ে শাহ্ আবদুল হালিম বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেছেন, যেখানে শিক্ষা জ্ঞান ও চিন্তার বিকাশের বদলে সনদ ও চাকরিপ্রাপ্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, শিক্ষার এই সংকট সংস্কৃতির গভীর ক্ষতি করছে, কারণ নতুন প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ‘শব্দের ব্যবহার’ ও ‘পরিভাষার ব্যবহার’ অধ্যায়ে ভাষার ক্ষমতা এবং এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। হালিম দেখিয়েছেন, ভুল বা অপরিকল্পিত শব্দ ব্যবহার চিন্তার জগতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতা বৃদ্ধি করে। ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ অধ্যায়ে হালিম রাজনীতিকে কেবল দলীয় লড়াই হিসেবে দেখেননি; বরং এটি আচরণ, মতপ্রকাশ ও সহনশীলতার সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। ‘সংস্কৃতি ও বিশ্বায়ন’ অধ্যায়ে তিনি দেখিয়েছেন, বিশ্বায়নের ফলে স্থানীয় সংস্কৃতির সংকট, বাজারের আধিপত্য এবং সাংস্কৃতিক একরূপতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই অধ্যায়গুলো মিলিয়ে পাঠক বুঝতে পারে, সংস্কৃতি কেবল ঐতিহ্য নয়; বরং শিক্ষা, ভাষা, রাজনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাবের সমন্বয়।
শিল্প, সংগীত, তথ্যবিপ্লব ও পশ্চাৎপদতার কারণ
বইয়ের পরবর্তী অধ্যায়গুলো—‘সংগীত ও ইসলাম’, পরিশিষ্ট (পোস্টস্ক্রিপ্ট, লেখকের কথা, মিউজিক অ্যান্ড ইসলাম গ্রন্থের অনুবাদ), ‘সংগীত: একটি মূল্যায়ন’, ‘পিছিয়ে থাকার কারণ—এক, দুই, তিন’, ‘চলচ্চিত্রে অশ্লীলতা’, ‘একটি বইয়ের জন্মবৃত্তান্ত’, ‘তথ্যবিপ্লব: সমস্যা ও সম্ভাবনা’, ‘ইসলাম ও বিজ্ঞান’, ‘অগ্রসর সাংস্কৃতিক কর্মীর আবশ্যিক পাঠ্যক্রম’—লেখকের বিশ্লেষণকে আরো বহুমাত্রিক করে। এখানে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে শিল্প ও সংগীত নৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিচার্য। মুসলিম সমাজের পশ্চাৎপদতা বাহ্যিক ষড়যন্ত্রের কারণে নয়; অনেকাংশে বরং চিন্তার দৈন্য, আত্মসমালোচনার অভাব এবং নৈতিক সাহসের সংকটের কারণে। তথ্যবিপ্লবের যুগে তথ্য সহজলভ্য হলেও বিচার-বিশ্লেষণ এবং নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকলে তা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। ‘ইসলাম ও বিজ্ঞান’ অধ্যায়ে বৈজ্ঞানিক চিন্তা, গবেষণা ও শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। ‘অগ্রসর সাংস্কৃতিক কর্মীর আবশ্যিক পাঠ্যক্রম’ অধ্যায়ে সমাজে সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও চিন্তাশীলতার ধারাবাহিক প্রয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, ব্যক্তিত্ব ও স্মৃতি
বইয়ের শেষ অংশ—‘অর্থনীতি’, ‘ইসলামী অর্থনীতির পুনর্বিন্যাস’, ‘দারিদ্র্য বিমোচন: নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি’, ‘মুদ্রা সংকট: বিচার্য বিষয়’, ‘মুদ্রা ফটকাবাজি: একটি ব্যাধি’, ‘বাংলাদেশে মৌলবাদের অর্থনীতি: একটি পর্যালোচনা’, ‘জাকাত নির্ধারণ পদ্ধতি’, ‘আন্তর্জাতিক’, ‘পিস: এ ফার ক্রাই’, ‘পিস উইদাউট জাস্টিস’, ‘প্যাক্স আমেরিকা ও নতুন বিশ্বব্যবস্থা’, ‘সময় ইসরাইলের প্রতিকূলে’, ‘পানির জন্য যুদ্ধ’, ‘পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ: সুদূরপরাহত’, ‘সন্ত্রাস: ঘরে-বাইরে’, ‘সার্বভৌমত্বের ধারণা’, ‘ব্যক্তিত্ব’, ‘নিবেদিত প্রাণ’, ‘এক মহীয়সী নারী’, ‘এক অভিযাত্রীর অভিজ্ঞান’, ‘নিঃসঙ্গ ঈগল’, ‘স্মৃতিতে অম্লান আল মাহমুদ’, ‘মুক্তবুদ্ধির কলকণ্ঠ’, ‘বন্ধুর বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম’, ‘স্বল্পব্যয়ের চিকিৎসক’—লেখকের মানবিক ও নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিশ্লেষণকে প্রকাশ করে।
অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রবন্ধগুলোয় শাহ্ আবদুল হালিম দেখিয়েছেন, মুদ্রা সংকট, দারিদ্র্য এবং বিশ্বব্যবস্থার বৈশ্বিক সংঘাত কেবল প্রশাসনিক নয়; বরং সংস্কৃতি, নৈতিকতা এবং সামাজিক উন্নতির সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্যক্তিত্ব ও স্মৃতিচারণামূলক অধ্যায়গুলোয় তিনি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সাহিত্য ও সমাজকে সংযুক্ত করে পাঠককে বোঝান, সংস্কৃতির পুনঃপাঠ কেবল নীতি-নৈতিকতা নয়; বরং সমাজ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।
সামগ্রিকভাবে ‘সংস্কৃতির পুনঃপাঠ’ একটি বহুমাত্রিক, সমালোচনামূলক ও শিক্ষণীয় দলিল, যা সমাজ, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, শিক্ষা, অর্থনীতি, রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং মানবিক অভিজ্ঞতা একত্রিতভাবে বিশ্লেষণ করেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

