আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

শবেবরাত উৎসব : বাংলাদেশের সংস্কৃতি

শিবলী আজাদ

শবেবরাত উৎসব : বাংলাদেশের সংস্কৃতি

শবেবরাত উদ্‌যাপন আমাদের হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতি। অথচ মাত্র ৪০-৪৫ বছর আগেও জমজমাটভাবে উদ্‌যাপিত হতো রাতটি। আজকের শিশু-কিশোরদের ধারণাও নেই, কী অদ্ভুত আগ্রহে অপেক্ষা করতাম আমরা। শবেবরাত মানেই বিশেষ আনন্দের আগাম সংবাদ—রোজা আর ঈদের আনন্দধ্বনি। শবেবরাতের আগমন নিজেও ছিল ভীষণ আনন্দের খবর।

তিন-চার দিন আগে থেকেই আমাদের কথায় চলে আসত শবেবরাতের প্রসঙ্গ। দু-তিন দিন আগে থেকে তো বুক রীতিমতো ঢিপঢিপ করত। আগের দিন দেখা যেত মুরুব্বিদের ব্যস্ততা; ব্যস্ততা মানে বাজার-সদাই করা, এক্সট্রা আইটেম কেনার ধুম। রোজা বা ঈদের মতো নয় অবশ্য; আটা-ময়দা, তেল-নুন, আর ছোলা-সুজি ইত্যাদি। দুধ-চিনিও থাকত কেনাকাটার তালিকায়। আর অবশ্যই থাকত গরুর গোশত। কেউ কেউ খাসির মাংসও কিনতেন।

বিজ্ঞাপন

পুরোনো ঢাকার মতো অত জাঁকজমকের সঙ্গে রাতটি উদ্‌যাপন করা হতো না নতুন ঢাকায়। তার পরেও কমতি ছিল না প্রস্তুতি আর আনন্দের। আগের দিনেই ছোলা-বুট ভিজিয়ে রাখা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি নেওয়া হতো; সেটা অবশ্য বাসার কিচেনে, মহিলা মহলের আঙিনায়। বেকারিগুলোর ছিল মৌসুম সেদিন। বেলা ৩টার পর থেকেই পথেঘাটে দেখা যেত ছেলেপেলের দল; হাঁটাহাঁটি করছে এ-মাথা ও-মাথা অকারণে। আসরের নামাজের পর সরগরম পুরো পাড়া।

পাড়ার বেকারিতে দারুণ ভিড়। বিশেষ ধাঁচের পাউরুটির ছড়াছড়ি। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল কুমির আকৃতির পাউরুটি। তাতে আবার আনারসের মোরব্বার কাটা কাটা চাকতি। দামটা অবশ্যই সামান্য বেশি। কিন্তু না কিনে উপায় আছে কারও? বিশেষ করে, বাসায় যদি শিশু-কিশোর থাকে? বেশি না হলেও একটি রুটি তো কেনা চাই-ই চাই। বেকারিতে থাকত আরো কত রকমের হরেক সাইজ আর টেস্টের বনরুটি ও বিস্কুট।

বিকাল থেকেই ঘরে ঘরে কাজের হল্লা। রসুইঘরে হইচই, হাঁকডাক। আটার রুটি সেঁকার পাশাপাশি সুজি ও গাজরের হালুয়া তৈরির প্রস্তুতি। আর আছে বুটের ডাল দিয়ে গরুর মাংস রান্না। মাংস রান্নার সুঘ্রাণে মৌতাত পুরো মহল্লা। হবে না কেন, প্রতিটি ঘরেই তো রান্না হচ্ছে গরুর মাংস। গন্ধে আমাদের চোয়াল শক্ত হয়ে যেত। অজান্তে নড়াচড়া করত ঠোঁট। লালায় ভরে যেত মুখ। শেষ বিকালেই রান্না শেষ হয়ে যেত অধিকাংশ ঘরে।

শুরু হতো আমাদের, মানে বাসার ছোটদের কাজ। বাটি ভরে হালুয়া, রুটি আর গোশত নিয়ে বাসায় বাসায় যাওয়া। বড় ট্রেতে বাটিগুলো সাজিয়ে দিতেন মা। হালকা কাপড়ে ঢাকা ট্রে হাতে এ-বাসা ও-বাসায় যাওয়া; সবাইকে খাবার বিলানো। উল্টোটাও ঘটত। অন্য বাসা থেকে আসত খাদ্যভর্তি ট্রে। জমে উঠত রুটির পাহাড়, হরেক পদের বরফিকাটা হালুয়া; আর বিচিত্র স্বাদ ও ঝোল-ঝালের বুটের ডালের গরুর মাংস।

এদিকে সন্ধ্যা নামার আগেই পটকা আর তারাবাতির হুল্লোড়। প্রচুর বাজি আর পটকা ফোটানো হতো সর্বত্র। বিকাল থেকেই ছোট ছোট টেবিলে সাময়িক দোকানও বসতে দেখেছি। কত বাহারি রকমের পটকা আর তারাবাতির পসরা। চার আনা ও আট আনা দরের তারাবাতি। তারের সঙ্গে সিলভার কালারের কেমিক্যাল মেশানো। আগুন জ্বালালেই ঝিরঝির স্পার্ক করে জ্বলা। মাগরিবের আগে পাড়া জুড়ে শুরু হতো তাণ্ডব।

পটকা আর বাজি ফোটানোর উৎসব। ভালো ছেলেরা অবশ্য পটকা-বাজি ফোটায় না—এই ছিল আমাদের বিশ্বাস। আমাদের ছোটদের ভরসা তাই তারাবাতি। জ্বলন্ত তারাবাতি হাতে ঘোরা, পেছনে দল বেঁধে আরো ছোট ছেলেমেয়ের দল—এই তিন-চার বছর বয়সিদের মিছিল। কী অদ্ভুত আনন্দ আমাদের মনে! আধা ডজন তারাবাতির বিনিময়ে যে আনন্দ পেতাম, লাখ টাকা দিয়েও আজ সেটা মেলা ভার; সম্ভবই নয়।

মাগরিবের আগে-পরে গোসল। নতুন সাবানের অপব্যবহার ঠেকায় কে? পাঞ্জাবি-লুঙ্গি পরে জায়নামাজ হাতে মসজিদ। উপচেপড়া ভিড় মসজিদে। ছোটদের পা ফেলার স্থানই নেই। নামাজ পড়ব কী করে? গেটের সামনে ফকির-মিসকিনদের জটলা। নামাজ শেষে বেরিয়ে যাচ্ছে মানুষ। পকেট হাতড়ে সিকি-আধুলি দিচ্ছে ফকিরদের পাত্রে। সেটা নিয়েও কত হ্যাপা—‘বাবা আমায় দেন, আমায় দেন’—কত কাড়াকাড়ি!

এশার নামাজের পরে বাসায় ফেরা। ফেরার পথে পথেঘাটে অবশ্য একটু ঘোরাফেরা। আচার-হজমি-আইসক্রিম খাওয়া। আইসক্রিমের দাম তখন ১০ পয়সা, বড়জোর চার আনা। আধুলি (আট আনা) বা এক টাকার আইসক্রিম তো আমাদের কাছে তখন বড়লোকি ব্যাপার। বাসায় ফিরে রুটি-গোশত, হালুয়া-রুটির ভোজ। ভাত সে রাতে খাওয়া হতো কদাচিৎ, খেলেও খুব সামান্য। প্রতিবার প্ল্যান করতাম সারা রাত নামাজ পড়ার। অতএব দল বেঁধে মসজিদে যাওয়া। গিয়ে দেখি স্কুলের বন্ধুবান্ধব সব হাজির। মাথায় উঠত নামাজ। কোনো রকমে আট-বারো রাকাত পড়েই বের হয়ে ফের ঘোরাঘুরি। ঘুরবই না কেন? রাস্তা জুড়ে অগণিত মানুষ। নতুন নতুন খাবারের দোকান—চটপটি, ফুচকা, আলুর দম, ঘুঘনি, ছোলাভাজা।

উদরপূর্তি কি কম বড় ইবাদত? আর আছে পটকা-তারাবাতির খেলা। দুষ্টু ছেলেরা রাস্তার কুকুরের লেজে তারাবাতি বেঁধে দিত। আগুন জ্বালালেই কুকুরের দিগ্বিদিকশূন্য ভৌ দৌড় আর ঘেউ ঘেউ চিৎকার। ওদিকে পাড়ার সঙ্গে পাড়ার লড়াই—কাদের পটকা বেশি ফুটেছে, কার পটকা কত ইউনিক।

রাত সাড়ে ১১টা-১২টা পর্যন্ত চলত এভাবেই। ততক্ষণে অবশ্য অনেকেই ক্লান্ত। অনেকেই বাসায় ফিরে গেছে। ঘোরাঘুরি করার কাজে আমরা ক’জন। রাত সাড়ে ১২টা হলে নেমে আসত নির্জনতা। মসজিদে মসজিদে মুসল্লির নীরব ইবাদত। আলো নিভিয়ে বাসায় মা-খালাদের নামাজ। নিস্তব্ধ পুরো শহর, অথচ জায়নামাজে জেগে সবাই। বাসায় ফিরে যত আলসেমি। আরেকটু রেস্ট নিয়ে নামাজ পড়ার প্ল্যান। কিন্তু প্ল্যান আর বাস্তবায়িত হয়ে উঠত না। বড়জোর আট রাকাত নামাজ, তার পরেই সামান্য বেড রেস্ট। রেস্ট নেওয়াটাই হতো কাল—ঘুম ভেঙে দেখি দিনের আলো। শবেবরাত শেষ।

আমাদের শৈশব-কৈশোরে ধর্মীয় ইবাদত আর উৎসবের মাঝে ফারাক ছিল না। ধর্মটা ছিল আনন্দের। জুমার নামাজ কি শবেবরাত—সবই ছিল আনন্দের উৎস। গড়পড়তা মানুষ ছিল গরিব, ভীষণ গরিব। আমাদের কালের মধ্যবিত্তও আজকের তুলনায় গরিব। অধিকাংশ মধ্যবিত্তের বাঁধাধরা জীবন, হিসেবি সংসার। অনেক মানুষই ছিল সৎ। ঘুষ-দুর্নীতির প্রকোপ বিস্তার করেনি। সৎ জীবনযাপন করেছেন অনেকেই।

ধর্মপালনও ছিল অন্তর্মুখী; আল্লাহর সঙ্গে নিজের সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়। লোকদেখানোর ভাব ছিল না। দেশে দুর্নীতির প্রকোপ বাড়ল, মানুষ হলো চরম অসৎ; সঙ্গে বাড়ল ‘সহি ইসলাম’-এর চাপ। কোমল আর লাবণ্যের বিপরীতে ধর্মচর্চা হয়ে উঠল কঠোর-কর্কশ। মিলাদ-শবেবরাত উধাও হলো। হারিয়ে গেল বাঙালি মুসলমানের বড় এক উৎসব। দেশও ছেড়েছি অনেক আগে, তিন দশকের ওপর। স্মৃতিই আজ ভরসা। সর্দি-কাশি আর সাইনাসে নাক এখন বছর জুড়েই থাকে বন্ধ। ঘ্রাণ নেওয়ার ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে দিন দিন।

তারপরও আজও শবেবরাতের রাতে আমি বুটের ডাল-মাংসের সুঘ্রাণ পাই!

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...