হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিতে ওমান ‘বাধা দিলে’ দেশটিতে বোমা হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধে তেহরানকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। যুদ্ধটি এখন ক্রমেই তার জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরুর পর থেকে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে। প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের অচলাবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে এই বিষয়। ওয়াশিংটন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
জ্বালানির দামে ব্যাপক ওঠানামা এবং যুদ্ধ নিয়ে জনমতের বিরোধিতার কারণে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানরা চাপের মুখে রয়েছে। ফলে, প্রায় ছয় মাসের অচলাবস্থার অবসানে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে।
ইরান ও ওমানের মধ্যে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলমান আলোচনার প্রসঙ্গে ফক্স নিউজের সাংবাদিক ট্রে ইংস্টকে ট্রাম্প বলেন, ‘ওমান যদি পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, আমরা তাদের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলা চালাব।’
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমান ট্রাম্পের মন্তব্যের বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
প্রণালিটি দিয়ে ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে তেহরান ও মাসকাট কয়েক সপ্তাহ ধরে আলোচনা করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার জানিয়েছে, দুই পক্ষ একটি যৌথ ঘোষণা নিয়ে কাজ করছে।
হরমুজের উত্তর পাশে ইরানের উপকূল। আর দক্ষিণ পাশে ওমান।
প্রণালিটি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তির উদ্যোগ ভেস্তে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে এ আলোচনা শুরু হয়।
ইংস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারের বিবরণ অনুযায়ী, ট্রাম্প আরও বলেছেন, ‘ইরানের উচিত আত্মসমর্পণের জন্য সাদা পতাকা ওড়ানো।’
প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেলেও ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, হরমুজের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে।
শুক্রবার তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অংশ ঘোষণা করবেন। জবাবে ইরান বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পরিবহনপথ ‘ইরানেরই থাকবে।’
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজকে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশসহ বিভিন্ন পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রচেষ্টায় ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি পরিত্যাগে বাধ্য করার বিরুদ্ধে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে তেহরান প্রণালিটির ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করছে।
যুদ্ধটি জনপ্রিয় না হওয়া এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও ট্রাম্প বলেন, তিনি চুক্তিতে পৌঁছাতে তাড়াহুড়ো করছেন না।
ইংস্টকে তিনি জানান, তার প্রশাসন ও ইরানের বিপ্লবী গার্ডের কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি একটি গোপন যোগাযোগের পথ রয়েছে।
তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ‘তারা ভালো পোকার (দর কষাকষিতে) খেলোয়াড়, কিন্তু তারা মারা যাচ্ছে।’
‘কূটনীতির পূর্ণ ব্যবহার’
মিত্র দেশগুলো আলোচনার জন্য চাপ অব্যাহত রাখার সময় ট্রাম্পের এ মন্তব্য এলো।
তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান ফোনে ট্রাম্পের সঙ্গে সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে ‘কূটনীতির পূর্ণ ব্যবহার’ করার গুরুত্ব তুলে ধরেন এরদোগান। শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় আঙ্কারা সমর্থন অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি।
সংঘাতের কেন্দ্রীয় উত্তেজনার বিষয় হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালি।
সংকীর্ণ এই জলপথ উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেলের দাম বেড়ে যায়। সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় বড় আমদানিকারক দেশগুলো সতর্ক করে দেয়।
ইরান হরমুজে জাহাজ চলাচল সীমিত রাখার পাশাপাশি ইয়েমেনে তাদের মিত্র হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বন্দরগুলোর ওপর সমান্তরাল নৌ অবরোধ ঘোষণা করেছে।
তেল রপ্তানির জন্য এটিই সৌদি আরবের একমাত্র বিকল্প সমুদ্রপথ।
ইরান প্রণালিতে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ এবং পারাপারের জন্য ফি আদায় করতে চায়। যুদ্ধের আগে তারা এমন ক্ষমতা প্রয়োগ করত না। ওয়াশিংটন এর তীব্র বিরোধিতা করছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তাদের জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, এতে ট্রাম্পের জন্য আরেকটি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


