মানবসভ্যতার ইতিহাসে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের কথা উঠলে সবার আগে যে নামটি মনে আসে, তা হলো সিল্ক রোড বা রেশমপথ। খ্রিষ্টপূর্ব ২০২ অব্দ থেকে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত, বিশেষ করে হান ও তাং রাজবংশের আমলে এশিয়া ও ইউরোপের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং রাজবংশগুলোকে এক সুতোয় বেঁধেছিল এই ঐতিহাসিক বাণিজ্যপথ। রেশম বা মসলার লেনদেনের পাশাপাশি দুই মহাদেশের মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, উদ্ভাবন ও জীবনদর্শনের আদান-প্রদানেরও অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল এটি। সিল্ক রোডের প্রধান কয়েকটি শহর ও বাণিজ্যকেন্দ্র নিয়ে ‘দ্য কালেক্টর’ অবলম্বনে লিখেছেন আবদুল মান্নান গালিব

চাংআন : তাং রাজবংশের মেগাসিটি
বর্তমান চীনের শিআন শহরে অবস্থিত চাংআন ছিল স্বর্ণযুগে বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ শহর। এর জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখের বেশি। তাং রাজবংশের আমলে এই শহরে দুটি বিশাল বাজার ছিল—পূর্ব বাজার ও পশ্চিম বাজার। এর মধ্যে পশ্চিম বাজারটি ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। রেশম, চা, মসলা ও বিদেশি ওষুধের সুবাসে মুখর থাকত এই বাজার। এখানকার বহুমুখী সংস্কৃতিতে বৌদ্ধধর্ম, তাওবাদ, জরাথুস্ত্রবাদ, এমনকি খ্রিষ্টধর্মের প্রভাবও স্পষ্ট ছিল।

কাশগর : তাকলামাকান মরুভূমির সংযোগ
চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলে অবস্থিত কাশগরকে চীনের ‘ওয়াইল্ড ওয়েস্ট’ বা ‘বুনো পশ্চিম’ বলা হয়। মধ্য এশিয়া ও চীনের মূল ভূখণ্ডের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই শহরটি ছিল পশ্চিমগামী বণিক কাফেলার বিশাল মিলনমেলা। কিংবদন্তি রয়েছে, হান সাম্রাজ্যের সেনাপতি ও সম্রাটরা এই অঞ্চলের ‘ব্লাড-সোয়েটিং’ ঘোড়ার সন্ধানে এখানে এসেছিলেন। পরবর্তীকালে বিংশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ড, রাশিয়া ও চীনের মধ্যকার রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছিল কাশগর।

দামেস্ক : ভূমধ্যসাগরের রেশম প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক প্রাচীনকাল থেকেই বাণিজ্য ও কারুশিল্পের প্রাণকেন্দ্র। খ্রিষ্টীয় ১১৫ সালের মধ্যেই এখানে চীন থেকে রেশমি সুতা এনে ইউরোপ ও রোমান বাজারের উপযোগী করে রঙ করা ও প্রক্রিয়াজাত করা হতো। উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী (৬৬১-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর এই শহরটি স্পেন থেকে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এছাড়া ভারত থেকে আমদানি করা উচ্চ-কার্বনসমৃদ্ধ উটজ ইস্পাত ব্যবহার করে এখানে তৈরি হতো বিখ্যাত ‘দামেস্ক স্টিল’ তলোয়ার।

সমরকন্দ : সোগডিয়ান বণিকদের রাজধানী
বর্তমান উজবেকিস্তানের সমরকন্দ প্রাচীনকালে সোগডিয়ান বণিকদের হাত ধরে বিশাল বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট থেকে শুরু করে চেঙ্গিস খান ও তৈমুর লং—ইতিহাসের বড় বড় বিজেতার আক্রমণেও এই শহরের বাণিজ্যপ্রবাহ থমকে যায়নি।
কাটা পাথর, সূক্ষ্ম ধাতুশিল্প ও আঞ্চলিক রুচির রেশমি কাপড় ছিল এই অঞ্চলের প্রধান রপ্তানি পণ্য।

বলখ : ব্যাকট্রিয়ার প্রাচীন রাজধানী
বর্তমান আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরিফের কাছে অবস্থিত বলখকে বলা হয় ‘শহরজননী’ (Mother of Cities)। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এ অঞ্চলে এসে রাজকন্যা রোকসানাকে বিয়ে করেছিলেন। ইসলামপূর্ব যুগে বৌদ্ধধর্মের একটি বড় কেন্দ্র হওয়ার পাশাপাশি এই অঞ্চলটি ছিল প্রাচীন ধর্মপ্রবর্তক জরাথুস্ত্রের জন্মস্থান। পরবর্তীকালে বিশ্ববিখ্যাত কবি রুমিও এখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তবে ত্রয়োদশ শতকে চেঙ্গিস খানের ধ্বংসাত্মক আক্রমণে এই প্রাচীন নগরী প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।

মার্ভ : মুসলিম সভ্যতার রত্ন
তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমি অঞ্চলে, মেরি শহরের কাছে অবস্থিত মার্ভ ছিল মধ্য এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। দ্বাদশ শতাব্দীতে সেলজুক তুর্কিদের অধীনে এই শহরটি দামেস্ক, বাগদাদ ও কায়রোর মতো প্রভাবশালী মুসলিম শহরগুলোর সমকক্ষ হয়ে ওঠে। প্রাসাদ, দুর্গ ও সমৃদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভরপুর এই শহরটি পূর্ব ও পশ্চিমের বাণিজ্যপথকে সংযুক্ত করত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তুলুই খানের নেতৃত্বে মোঙ্গল বাহিনী ১২২১ সালে এই সমৃদ্ধ মহানগরীকে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করে।

কটেসিফোন : সাসানীয় সাম্রাজ্যের শক্তিকেন্দ্র
দজলা নদীর তীরে, বাগদাদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত কটেসিফোন ছিল প্রথমে পার্থীয় ও পরে সাসানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী। সাসানীয় আমলে এটি ক্ষমতার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে আরব বাহিনী কটেসিফোন জয় করে এবং পূর্ব পারস্য অভিযানে একে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে। চীনের রেশম, ভারতের মসলা ও মধ্য এশিয়ার লাজওয়ার্দ পাথর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে পৌঁছানোর আগে এখানকার বাজারে বিক্রি হতো। এসব পণ্যের ওপর শুল্কও আদায় করা হতো। ফলে নগরটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
আজ কটেসিফোনের বেশিরভাগই ধ্বংসস্তূপ। টিকে আছে শুধু কাঁচা ইটের দেয়াল ও প্রাসাদের ভগ্নাবশেষ। অষ্টম শতকে আব্বাসীয়রা নতুন রাজধানী বাগদাদ গড়ার সময় কটেসিফোনের প্রাসাদ থেকে প্রচুর ইট ও পাথর খুলে নিয়ে ব্যবহার করেন বলে জানা যায়। এভাবে এক সাম্রাজ্যের পুরোনো রাজধানীর ধ্বংসাবশেষ আরেক সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী নির্মাণে কাজে লাগে।

কনস্টান্টিনোপল : সিল্ক রোডের শেষ গন্তব্য
বর্তমান তুরস্কের ইস্তাম্বুল ইতিহাসে কনস্টান্টিনোপল নামে বিশ্বখ্যাত। এই শহরটি রোমান, বাইজেন্টাইন ও উসমানীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। এশিয়া ও ইউরোপের ভৌগোলিক সংযোগস্থলে অবস্থিত এই শহরটিকে প্রাচীন স্থলপথের সিল্ক রোডের অন্যতম প্রধান শেষ প্রান্ত বলা যায়। কৃষ্ণসাগর ও ভূমধ্যসাগরের জলপথ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম বড় শুল্ককেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। শস্য, কাঠ থেকে শুরু করে অত্যন্ত মূল্যবান বিলাসপণ্যের কেনাবেচা ও কর আদায়ের মাধ্যমে শহরটি বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছিল।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

