বর্তমান বিশ্ব ডিজিটাল প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। স্মার্টফোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, গুগল সার্চ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নেপথ্যে কাজ করে একগুচ্ছ গাণিতিক ও যৌক্তিক নির্দেশনা। এর অন্যতম পরিচিত নাম ‘অ্যালগরিদম’। আধুনিক প্রযুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা এই ধারণার ইতিহাস অবশ্য সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তিবিপ্লবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর বিকাশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুড়ে আছেন অষ্টম ও নবম শতকে বাগদাদে কর্মরত মুসলিম গণিতবিদ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খারিজমি।
আনুমানিক ৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে মধ্য এশিয়ার খারিজম অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন আল-খারিজমি। অঞ্চলটির ঐতিহাসিক ভূখণ্ড বর্তমানে উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের কিছু অংশজুড়ে বিস্তৃত। আব্বাসি খলিফা আল-মামুনের শাসনামলে তিনি বাগদাদের জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ সময়ে গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু রচনা আরবি ভাষায় অনূদিত হচ্ছিল। সেই বৌদ্ধিক পরিবেশে আল-খারিজমি গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের চর্চা করেন এবং পূর্ববর্তী জ্ঞানভান্ডারকে কাজে লাগিয়ে নতুন গাণিতিক পদ্ধতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
আল-খারিজমির নাম আজও প্রযুক্তির জগতে বেঁচে আছে ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটির মধ্য দিয়ে। দ্বাদশ শতকে তার গণিতবিষয়ক রচনাগুলো লাতিন ভাষায় অনূদিত হওয়ার পর Algoritmi হিসেবে তার নাম ইউরোপে পরিচিতি পায়। পরবর্তী সময়ে এই নাম থেকেই ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটির উদ্ভব ঘটে। তবে তার অবদান এর চেয়ে অনেক বেশি। গাণিতিক সমস্যা সমাধানে সুস্পষ্ট নিয়ম, ধারাবাহিক ধাপ ও পদ্ধতিগত চিন্তার প্রয়োগ তার রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আধুনিক অর্থে অ্যালগরিদম বলতে কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান কিংবা কাজ সম্পন্ন করার জন্য সাজানো সুস্পষ্ট নির্দেশনার ধারাবাহিকতাকে বোঝায়। আল-খারিজমির গাণিতিক কাজ এই নিয়মতান্ত্রিক চিন্তার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
তার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো বীজগণিতের বিকাশ। তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-কিতাব আল-মুখতাসার ফি হিসাব আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালাতে তিনি রৈখিক ও দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি উপস্থাপন করেন। গ্রন্থটির নামের ‘আল-জাবর’ শব্দটি থেকেই লাতিন Algebra এবং পরবর্তী সময়ে ইংরেজি ‘অ্যালজেব্রা’ শব্দটির উৎপত্তি।
সংখ্যাপদ্ধতির ইতিহাসেও আল-খারিজমির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতি এবং দশমিক স্থানিক মানের ভিত্তিতে গণনার নিয়ম আরবি ভাষায় উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি এই পদ্ধতির পরিচিতি ও প্রসারে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে তার রচনার লাতিন অনুবাদ ইউরোপে ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতির বিস্তারে সহায়তা করে। রোমান সংখ্যাপদ্ধতির তুলনায় শূন্যসহ দশমিক স্থানিক মানভিত্তিক পদ্ধতিতে বড় সংখ্যার হিসাব করা অনেক সহজ।
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে অ্যালগরিদমের ব্যবহার সর্বব্যাপী। ব্যাংকিং সফটওয়্যারে লেনদেন যাচাই, বিমান চলাচলের রুট নির্ধারণ, সার্চ ইঞ্জিনে তথ্য খোঁজা কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে রোগ শনাক্তকরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম ও নির্দেশনার ভিত্তিতে কাজ সম্পন্ন করা হয়। এসব আধুনিক ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত কাঠামো আল-খারিজমির যুগের পদ্ধতির সঙ্গে এক নয়; তবু গাণিতিক সমস্যাকে সুসংবদ্ধ নিয়মে প্রকাশ ও সমাধানের দীর্ঘ ইতিহাসে তার রচনাগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খারিজমি গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক পথিকৃৎ। বাগদাদের জ্ঞানচর্চার পরিমণ্ডলে তার অবদান বীজগণিতের বিকাশ, সংখ্যাপদ্ধতির প্রসার ও নিয়মতান্ত্রিক গণনার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে। অ্যালগরিদমের ইতিহাস ও গাণিতিক সমস্যা সমাধানের পদ্ধতিগত বিকাশে তার অবদান অনস্বীকার্য। শতাব্দী পেরিয়ে তার উত্তরাধিকার আজও মনে করিয়ে দেয়, ডিজিটাল যুগের ভিত্তি নির্মাণে অতীতের জ্ঞানচর্চাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


