২০২৪ সালের জুলাই মাসে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সব ধর্মের সব শ্রেণির মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ শুধু স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসেই সব থেকে বড় গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দেয় নাই, পৃথিবীর ইতিহাসেই একটা বিরাট ঘটনা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করছে। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়া উপন্যাস লেখা হইছে খুবই কম, একেবারে হাতে গুইনা ফেলা যাবে। এর কারণ খুঁজতে গেলে আমরা পাইতে পারি, ঐতিহাসিক দূরত্বের অভাব, রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের অস্থিরতা এবং লেখকদের রাজনৈতিক পক্ষপাত।
প্রথম দুই কারণ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার জবাব রায়হান রাইন, মুরাদ কিবরিয়া, সাব্বির জাদিদ উপন্যাস লিইখা দিয়া দিছেন। ফলে এই প্রশ্ন তোলার সুযোগ কমে গেল যে জুলাই নিয়া উপন্যাস লেখার সময় হইছে কিনা। যদিও সময় শেষও হয় নাই। অফুরন্ত সময়। কেউ যদি ১০০ বছর পরে লিখতে চায়, লিখুক। এক হাজার বছর পরেও লিখতে পারে। কোনো সমস্যা নাই।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান-কেন্দ্রিক উপন্যাস কম হওয়ার সব থেকে বড় কারণ—যারা বাংলাদেশের সাহিত্য, কালচারাল পলিটিকস ও মিডিয়া পলিটিকস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তারাও স্বীকার করবেন—লেখকদের রাজনৈতিক পক্ষপাত। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত এবং পুরস্কৃত অধিকাংশ লেখকই বাম বাকশালি বয়ানের কন্ট্রিবিউটর অথবা সাবস্ক্রাইবার। সংখ্যাটা এত বেশি ভয়াবহ আর আতঙ্কের যে ঠক বাছতে সত্যি সত্যি গা উজাড় হয়া যায়। (ঘোষিত) বাকশালের জনকের কন্যার (অঘোষিত) নয়া বাকশাল কায়েমে এবং জারি রাখায় সব থেকে বড় কামলা ছিলেন এবং এত এত দুর্নীতি, গুম, ভোট চুরি, হাজার হাজার মানুষের ওপর গুলি চালানো, এমনকি হাজার হাজার মানুষ খুনের পরেও যারা তাদের মালিকদের ফেরায় আনায় নানান ফন্দি-ফিকিরে ব্যস্ত, তাদের সময় কই জুলাই নিয়া উপন্যাস লেখার! আর ঠেকাই বা কীসের! তারা তো আর জনগণের ধার ধারে না। কোনো দায় নাই। ‘তিনা’দের সকল দায় ‘বঙ্গবন্ধু’র কলঙ্ক মোছন আর ‘হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির’ কন্যার চাঁদবদন মোবারকের হারানো উজ্জ্বলতা ফেরত আনার।
এর বাইরে জুলাইয়ের উপন্যাস যাদের হাতে লেখা সম্ভব, যারা জুলাইয়ে অংশও নিছিলেন, তাদের ভেতর একটা গ্রুপ ‘রিগ্রেট ফিল’ করেন। জুলাই বেচাবিক্রির ফেরে, আইন নিজ হাতে তুইলা নেওয়ায়, ‘মুক্তিযুদ্ধের আঁতুড়ঘর’ ৩২ ভাঙায় এবং ‘ইসলামি মৌলবাদী’দের আস্ফালনে ‘রিগ্রেট ফিল করা’ লেখককুল ‘আপন ঠিকানায়’ ফেরত যাইতে বাধ্য হইছেন। সাড়ে সাত হাজার বার মুক্তিযুদ্ধের বেচাবিক্রি, কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের ডাকাতি, লাখ লাখ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম কইরা আওয়ামী বাটপাড়দের রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট আর মুক্তিযুদ্ধের নাম কইরা দুই দুইবার ফ্যাসিবাদ কায়েমও অবশ্য উনাদের সেই ‘আপন ঠিকানা’ ‘পর’ হয় নাই কখনো।
এইখানে বোধের অভাব নয়, রাজনীতিই বেশি সক্রিয়। মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধসংশ্লিষ্ট সকল কিছুকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখতে চাওয়া; অন্যদিকে জুলাই আর জুলাই-সংক্রান্ত সবকিছুকে প্রশ্ন করার প্রবণতা মোটেও নির্বোধদের কাজ নয়।
এই বিষয়ে সামান্য নুক্তা দিয়া রাখি।
জুলাই বিক্রিতে জুলাইয়ের দোষ কতখানি? জুলাই কি নিজেকে বিক্রি করতে পারে? বা নিজেকে অবিক্রিত রাখতে সক্ষম?
জুলাই কী? ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এক অপরিহার্য গণঅভ্যুত্থান। জুলাই তৈরি হইছে কোটি কোটি মানুষের ত্যাগ, মজলুমদের ক্ষোভের বারুদ আর হাজার হাজার তরুণের তাজা রক্ত দিয়ে। জুলাইয়ের জুলাই হওয়া ছাড়া কি কোনো গতি ছিল? দেশের সার্বভৌমত্ব বেইচা দেওয়া একটা সশস্ত্র সন্ত্রাসী দল রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠান ব্যবহার কইরা সকল ধরনের অপরাধ করার বৈধতা হাসিল করছিল। সেই সন্ত্রাসীদের হটাইতে গেলে রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের বিকল্প কী? তারা নিজেরা সরে যাইত? জুলাইয়ের বিকল্প ছিল?
এখন ‘জুলাই’ সম্পদ মনে কইরা যদি বেচাবিক্রি হয়ও, সেইখানে জুলাইয়ের দোষ কোথায়? চিন্তায় গরিব এইসব ‘রিগ্রেট ফিল’ করা লেখকদের কে বুঝাবে যে দোষ জুলাইয়ের নয়; দোষ জুলাইয়ের নাম ভাঙায়া খাওয়া ‘কালচারাল ও পলিটিক্যাল ব্রোকারদের’। জুলাইয়ের সাথে তার সম্পর্ক নাই। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্ক নাই মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ীদের।
পৃথিবীর ইতিহাসে হলোকাস্ট ইন্ডাস্ট্রির পর সব থেকে ব্যবসাসফল ইন্ডাস্ট্রি মুক্তিযুদ্ধ ইন্ডাস্ট্রি। এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের নামে যত মায়ের বুক খালি করা হইছে, যত সম্পদ ডাকাতি করা হইছে, যত ভোট ডাকাতি হইছে, যতবার ফ্যাসিবাদ কায়েম করা হইছে, পৃথিবীর ইতিহাসেই তা অত্যন্ত সমৃদ্ধ উদাহরণ। ‘মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসা’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলনই গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। তবু প্রশ্ন থাইকা যায়, সেই দোষ কি মুক্তিযুদ্ধের? মুক্তিযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের মানুষের যে অপূরণীয় ক্ষতি হইছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধের হাত কতখানি? তার জন্য কি আমরা মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার করব? রিগ্রেট ফিল করব?
এতটুকু বোঝাপড়াও যাদের থেকে আশা করতে পারি না, তাদের কাছ থেকে জুলাইয়ের উপন্যাস আশা না করাই ভালো।
বাকি যারা জুলাইকে স্বীকার করেন, জুলাইয়ের গুরুত্ব বুঝতে পারেন, পক্ষ না নিলেও বিপক্ষে যান নাই, গ্রে এরিয়ায় থাকতে চাইছেন, তাদের বেশিরভাগ এখনো ঐতিহাসিক দূরত্ব খুঁজতেছেন। তাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর দেখতে থাকার সময়ে যারা অলরেডি জুলাইকে নিয়ে উপন্যাস লিখে ফেলছেন, আমরা বরং তাদের নিয়াই কথা শুরু করতে পারি।
এই ক্ষেত্রেও তরুণরাই অগ্রগামী। প্রতিষ্ঠিত দল ও নেতাদের তোয়াক্কা না করার ভেতর দিয়া জুলাই আন্দোলন সফল হইছে। তেমনি প্রতিষ্ঠিত লেখক আর প্রকাশকদের অমান্য কইরাই তরুণ লেখকরা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইছে।
জুলাই নিয়া এই পর্যন্ত যেইসব উপন্যাস বাজারে আসছে, তার ভেতর রায়হান রাইনের ‘একটি বিষণ্ণ রাইফেল’, মুরাদ কিবরিয়ার ‘ক্যাফে রেভুল্যুশন’, সাব্বির জাদিদের ‘দুই পৃথিবীর সূর্য’, আশীফ এন্তাজ রবির ‘ট্রেন টু ঢাকা’, সালাহ উদ্দিন শুভ্রের ‘আজাদি’, নেয়ামত ইমামের ‘আয়নাঘর’ বেশি আলোচিত। এর বাইরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উপন্যাস না হইলেও প্রসঙ্গক্রমে আন্দোলনের কথা আসছে ওয়াসি আহমেদের ‘কার্পাসমহলে’। এর ভেতর চারটা উপন্যাস (এ.বি.রা; ক্যা.রে; দু.পৃ.সূ; কা.ম.) পড়ছি। আয়নাঘর সংগ্রহে আছে। আজাদি আর ট্রেইন টু ঢাকা সংগ্রহের লিস্টে আছে। পড়া চারটা উপন্যাসে জুলাই কীভাবে আসছে, লেখকদের অবস্থান কী—সেইসব নিয়া আলাপ করব।
কার্পাসমহল
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ হওয়া ওয়াসি আহমেদের ৩১০ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটা মূলত পাহাড়, পাহাড়িদের অধিকার, কাপ্তাই বাঁধের ফলে মানুষের তৈরি গজবের দুর্দশার কথা নিয়া লেখা। উপন্যাসের প্রটাগনিস্ট বিন্তি ওরফে বিনীতা চাকমা জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও যোগ দেয়। ওয়াসি আহমেদ লিখতেছেন, বিন্তি এর আগে অনেক আন্দোলনের কথা বইয়ের পাতায় পড়ছে, বিশেষ করে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের কথা। কিন্তু এইবার নিজ চোখেই দেখল এবং “যা দেখল তাকে আঁশ মিটিয়ে দেখা বলে। এত মানুষের ঢল কে কবে দেখেছে! বুক পেতে গুলি খাওয়ার ঘটনাই-বা কোথায় ঘটেছে, আর মেয়েরা এত সাহস কোথা থেকে পেল! একটা বছর-কুড়ির মেয়েকে দেখেছে রাইফেল তাক করা পুলিশ-লরির সামনে দুই হাত তুলে চেঁচিয়ে বলছে তার ওপর দিয়ে লরি চালাতে! দেখে গা শিরশির করেছে বিন্তির। বিশ্বাস হতে চাইত না এমন দৃশ্যের সেও সাক্ষী। প্রথম দুই-তিন দিন তার কেটেছে অনিশ্চিত ঘোরের মধ্যে। এই যে দেশব্যাপী এত বড় আন্দোলন, এর সাথে তার যোগ কতটুকু? প্রশ্নটা যেন সারাক্ষণ তাকে খোঁচাবে বলে তৈরি হয়ে থাকত। সে কি এই ছাত্র-জনতার অংশ নয়? পাহাড়ের বাসিন্দা বলে তার নিজের একটা আলাদা সংগ্রাম রয়েছে, তাই বলে দেশজোড়া এই সংগ্রামের সে কেউ না? জবাব পেতে দেরি করেনি, মিছিলে পা মেলাতে গিয়ে সে মুহুর্মুহু শিহরিত হয়েছে। আরো শিহরিত হয়েছে যখন দেখেছে পাহাড়ি ছাত্রছাত্রীরাও সমানতালে মিছিলে মুখর। এত ঘনঘটাময়, এত উত্তেজনাকর ঘটনাপ্রবাহে সেও সামিল ভাবতে গায়ে কাঁটা দিয়েছে। সেই সাথে না ভেবে পারেনি যদি পাহাড়ের দাবিদাওয়া নিয়ে এ রকম একটা আন্দোলন ঘটানো যেত!” (কার্পাসমহল: ২৫৩/২৫৪)
বিন্তির আন্দোলনে যোগ দেওয়ার ঘটনাকে ওয়াসি আহমেদ ভালোভাবেই দেখাইছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে এবং স্বৈরাচার হাসিনার পতনকে স্রেফ সরকার পাল্টানো হিসাবে বর্ণনা করছেন। দেখাইছেন, হাসিনার আমলে ডিবি তুইলা নিয়া সাজানো মামলা দিত, পুলিশের ভয়ে গা ঢাকা দিতে হইতো। দ্বিতীয় কল্পনা চাকমা হওয়ার খায়েশ পুরা কইরা দেওয়ার চেষ্টা করত। আর পরের সরকারের আমলে খোদ মিলিটারির হাতে গুম হওয়ার আশঙ্কায় গা ঢাকা দেয় বিন্তি। অর্থাৎ জুলাইয়ের আগের রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর তুলনায় পরের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী আরো আগ্রাসী।
কার্পাসমহলে ওয়াসি আহমেদ চামে অপ্রয়োজনে শেখ মুজিবের প্রশংসা করছেন, কিন্তু খুব প্রয়োজনের সময়ও ভুল করেও তার কন্যার নাম উচ্চারণ করেন নাই। অন্যান্য রাজনৈতিক চরিত্রদের নামও আনছেন। যেমন আইয়ুব খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী, এমএন লারমা, রাজা ত্রিবেদীর কথা আনছেন ভালোভাবেই। কিন্তু হাসিনার নামটা আর মুখে আনেন নাই। শেখ মুজিব ও তার কন্যাকে এই যে আন-কোশ্চেনড রাখা, এইটাই বাংলাদেশের কালচারাল বাস্তবতা। কার্পাসমহলের প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদের অনেকটা সময়। ফ্যাসিবাদের কারণে বিন্তির জেলে যাওয়া লাগলেও ঔপন্যাসিক সুনির্দিষ্ট খলনায়ক বা অপরাধীর নাম মুখে না আইনা এক ধরণের দায় ও অপরাধের ঐতিহাসিক গুরুত্বকে অনেকটাই হালকা বা আড়াল করে দিতে চায়া থাকতে পারেন, সেই কথা বলা বোধহয় অন্যায় হবে না।
একটি বিষণ্ণ রাইফেল
২০২৫ সালে প্রকাশিত রায়হান রাইনের ‘একটি বিষণ্ণ রাইফেল’ পুরাপুরি জুলাইয়ের উপন্যাস। এইটাকে আমরা হাসিনার আমলের আয়নাঘর আর গুমের এক শৈল্পিক দলিল বলতে পারি। উপন্যাসে বলা না হইলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না, এইটা ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলের রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে দুর্নীতি অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদকারী বা অ্যাক্টিভিস্টদের নামে মিথ্যা মামলা, হয়রানি, গোয়েন্দা নজরদারি, ফোনে আড়িপাতা, এমনকি প্রতিবাদকারীদের না পাইলে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের পর্যন্ত হয়রানি করা, গুম কইরা গোপন বন্দিশালায় নিয়া অবর্ণনীয় নির্যাতন, বন্দুক যুদ্ধের নাটক সাজায়া ক্রসফায়ারে মাইরা ফেলা—মোট কথা হাসিনার স্বৈরশাসনের ভেতর নাগরিকের জীবনে নাইমা আসা জুলুম-যন্ত্রণার একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র আঁকার চেষ্টা করছেন রায়হান রাইন।
লেখক দেখাইছেন, ছাত্রজীবনে হলে থাকতে গেস্টরুমে কালচারে যেভাবে নির্যাতনের শিকার হইতে হয়, বড় হয়া নাগরিক জীবনেও ব্যক্তিকে ওই একই তরিকায় একই আদর্শধারী মানুষদের হাতেই তিলে তিলে মরতে হয়। ব্রেসলেট পরা, কপালে কাটা দাগ, আর মুখোশপরার রূপকের ভেতর দিয়া লেখক খুব সম্ভবত ছাত্রলীগ, পুলিশ লীগ আর র্যাব লীগকে বুঝাইছেন। নাও হইতে পারে। অন্য সময়ে হয়তো তা ছাত্রদল কিংবা ছাত্রশিবিরও মনে হইতে পারে।
উপন্যাসের প্রটাগনিস্ট শাফায়েত কবির একজন সাংবাদিক। একটা সাপ্তাহিক পত্রিকায় জব করে। সাংবাদিকতার পাশাপাশি দেশের নানান ইস্যুতে নিজের ব্লগসাইটে লেখালেখি করে। সে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে চায়। দুর্নীতি, গুম, ক্রসফায়ার নিয়েও লেখালেখি করে। বিদ্যুৎ প্রকল্পের দুর্নীতি নিয়া একটা প্রতিবেদন করে, যেইটার সাথে এক মন্ত্রী জড়িত। কয়েক দিন পর তাকে রাষ্ট্রীয় বাহিনী তুলে নিয়ে নির্যাতন করে। জিজ্ঞাসাবাদে সন্তোষজনক উত্তর পায় না তারা। ক্রসফায়ারে দিবে দিবে করেও শেষ পর্যন্ত ২১ দিন পরে গোপন বন্দিশালা থেকে বের করে বান্দরবনে পাহাড়ে রাস্তায় রাতের অন্ধকারে ফেলে দিয়ে যায়। ছেড়ে দেওয়ার আগে হুমকি দিয়া বলে, গরু যেইভাবে বাঁচে, সেইভাবে বাঁচতে হবে। রাষ্ট্রের সাথে এই খেলায় শাফায়েত পারবে না। তাকে হার মানতেই হবে। হার মানেই মরণ।
প্রথমবার শাফায়েত স্টেটমেন্ট দিয়া ছাড়া পায়। এইভাবে অহেতুক মইরা যাওয়ার কোনো অর্থ হয় না। সে বলে তার কোনো অভিযোগ নাই। সে খালি বাঁচতে চায়। দুই দিন পর আবার ধরে। কারণ সে সাংবাদিকদের ইন্টারভিউ দিছিল। পরে আবার নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। লাস্ট চান্স দেয়। শাফায়েতকে ছেড়ে দিলেও তাকে শান্তিতে থাকতে দেয় না। তার পিছনে রাতদিন গোয়েন্দা সেট করে রাখে। ফোনে আড়ি পাতে। তার জীবন অসহ্য হয়ে ওঠে। এত নির্যাতনের পরেও এত হুমকি-ধামকির পরেও, এমনকি মরণের ভয়কেও পাত্তা না দিয়া সে আবারও লেখালেখি করতে থাকে। কোনোভাবেই শাফায়েত গরুর মতো বাঁচতে চায় না। তার বন্ধুবান্ধবরা কৌশলে সরকারের দালালি করলেও সে ওইরকম বেইজ্জতির জীবনযাপন করতে চায় না।
মুক্তি পাওয়ার পরে শাফায়েত আবারও লেখালেখি করলে তার বাড়িতে একের পর এক অপরিচিত লোক আসতে থাকে। হুমকি-ধামকি দেয়। বাসাতেই নির্যাতন করে।
পরে কিছুদিন বেশভূষাও পাল্টায়া কিছুদিন আত্মগোপনে থাকে। এই সময়ে দেশে মানুষের ভেতর ক্ষোভ বাড়তে থাকে। গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়। গণঅভ্যুত্থানের ভেতরে একদিন প্রেস কনফারেন্স করে শাফায়েত। গুম ও নির্যাতনের কথা প্রকাশ্যে আনে। পুরাদমে আন্দোলন শুরু হইলে শাফায়েতকে আবারও একরাতে তুলে নিয়ে মেরে ফেলে।
শাফায়েতের মৃত্যুর পর তার স্বৈরাচারের পতন হয়। গুম নির্যাতন বন্ধ হয়। উপন্যাসের শেষের দিকে লেখক দেখান স্বৈরাচারের পতন হইলেও দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হয় নাই।
উপন্যাসে রায়হান রাইন নির্যাতনের কারিগর হিসাবে রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করতে পারছেন। সরকারের দায় দেখতে পান নাই। এমনকি সরকার শব্দটাই দুই থেকে তিনবারের বেশি ব্যবহার করেন নাই। রাষ্ট্র আর সরকার তো এক নয়। সরকার রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে। নিজেদের জুলুম অত্যাচারকে বৈধতা দেয় রাষ্ট্রের নাম কইরা। সব সরকার রাষ্ট্রকে ব্যবহার করে সমান খারাবি করে না। এই জিনিস তো উনাকে বুঝাইতে হবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক উনি। তাইলে এই কাজটা কেন করলেন? শিল্পের খাতিরে?
শিল্পের কথা বললে সেইটা নিয়া আমরা কথা বলতে পারি। আমরা জানি, এইটা একটা ফিকশন। হিস্ট্রি নয়। ফিকশনে লেখক কী লিখবেন, কতটুকু লিখবেন, শিল্পের খাতিরে কখন লাগাম টানবেন, আর কখন লাগাম ছেড়ে দিবেন, তা নিয়া প্রশ্ন তোলা আহাম্মকি। রায়হান রাইন সেই সুযোগ শতভাগ কাজে লাগাইতে পারবেন। তা মানি।
প্রশ্ন হইল, শিল্পে ফিগার স্পষ্ট হবে নাকি অ্যাবসার্ড থাকবে? এই সূত্র ধইরাই আমরা আলাপটা আগায়া নিতে চাই।
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ‘একটি বিষণ্ণ রাইফেল’ একটা পলিটিক্যাল ফিকশন। সময়ের উল্লেখ না থাকলেও সরকারের যেই ফিচারগুলা বলা হইছে, সেইগুলা হাসিনার আমলের সাথে মিলা যায়। কিন্তু মূল কালপ্রিট বা দায়ীদের নাম উল্লেখ করা হয় নাই। এমনকি ইশারা ইঙ্গিতেও বলা হয় নাই।
দুইটা কারণে এইটা হওয়ার চান্স আছে—
১. উপন্যাসটাকে সর্বজনীন করতে চাইছেন। যেকোনো সময়েই যেন তা প্রাসঙ্গিক থাকে, এইরকম একটা বাসনা থাকতে পারে।
২. ফ্যাসিস্ট হাসিনা তথা আওয়ামী সন্ত্রাসী লীগকে দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করে থাকতে পারেন। আমরা বিশ্বাস করতে চাই লেখক প্রথম কারণটাই বাইছা নিছেন।
তবু কিছু কথা থাইকা যায়। একটা বড় সময়ের পলিটিক্যাল ফিকশনে বড় ফিগারদের নাম থাকা শিল্পকে নষ্ট করে—এই বয়ান কল্কে পায় না। কারণ ভালো শিল্পের অহরহ উদাহরণ আমি দেখছি। আপনি যদি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের খোয়াবনামা বা চিলেকোঠার সেপাইয়ের কথা ধরা যাক, সেইখানে কিন্তু সব পলিটিক্যাল ফিগারদের নাম আছে। আবার মাহমুদুল হকের জীবন আমার বোনেও সব পলিটিক্যাল ফিগারদের নাম আছে। সেইসবের কিন্তু শিল্পমান কমে নাই এবং নির্দিষ্ট কালের ভেতরও আটকা পড়ে নাই।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়া উপন্যাস সিনেমাগুলা যদি দেখেন, সেইখানে কিন্তু অনেক সময় পলিটিক্যাল ফিগারদের কথা উল্লেখ করা হইছে। হিটলারের চেহারা সুরত পরিষ্কারভাবেই পোর্ট্রেট করা হইছে। সেইগুলাতেও সমস্যা হয় নাই।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়া এমন উপন্যাস খুব কমই পড়ছি, যেইখানে পলিটিক্যাল ফিগারদের নাম নাই। শহীদুল জহিরের সে রাতে পূর্ণিমা ছিল বা জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় অবশ্য এই জিনিসটা সযত্নে এড়ায়া যাওয়া হইছে।
দেশভাগ নিয়া যেইসব উপন্যাস লেখা হইছে, সেইসবেও জিন্নাহ গান্ধী নেহরু নাই এমনটা হওয়া প্রায় অসম্ভব। হইতে পারে। কিন্তু আমার ধারণা এইটা রেয়ার।
আমাদের দেশে জিয়া, এরশাদ, খালেদা—সবাইকে নাম নিয়া বা নাম ছাড়া ইশারা-ইঙ্গিতে ঠাট্টা করতে পারবেন, সমালোচনা করতে পারবেন এবং সেইটা শিল্পসম্মত উপায়ে। শিল্পের তাতে কোনো ক্ষতি হয় না।
কিন্তু হাসিনা কিংবা শেখ মুজিব হাজার হাজার মানুষ মাইরা ফেললেও, দুর্ভিক্ষ টাইনা আনলেও, সেইটা নিয়া কথা বলা বেয়াদবি এবং শিল্পবিরোধী ব্যাপার হয়া ওঠে। ইমতিয়ার শামীম খুব ভালো লেখেন। কিন্তু তার সারা জীবনের লেখায় উনি জিয়া ও খালেদার ব্যাপারে কী ভয়াবহ ঘৃণা নিয়া উনি বেঁচে আছেন এবং সেইসব শিল্পসম্মতভাবে উৎপাদন করে গেছেন, সেইটা ভাবলে অবাক লাগে। সেই ইমতিয়ার শামীম যখন হাসিনার আমলে গুম নিয়া লেখেন, আপনি হারিকেন দিয়াও খুঁইজা পাবেন না কোন সরকারের আমলে সেইসব হচ্ছে। হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগের চুলও খুঁইজা পাবেন না। ইশারা-ইঙ্গিতেও নাই। তো এই রকমটা হয় আমাদের দেশে। রায়হান রাইন সেরকম হয়তো নয়।
সমালোচনার পরেও একটি বিষণ্ণ রাইফেল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা উপন্যাস। সাহিত্যের রস, আন্দোলনের ভিত্তি আর স্পিরিটটা এই উপন্যাসে ভালোভাবেই ধরা পড়ছে। বাংলাদেশি সাহিত্য তো অবশ্যই, বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিকতায় ‘একটি বিষণ্ণ রাইফেল’ একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসাবেই আমাদের পাঠ করতে হবে।
ক্যাফে রেভুল্যুশন
২০২৫ সালের আগস্টে বের হওয়া মুরাদ কিবরিয়ার ক্যাফে রেভুল্যুশনই জুলাইয়ের সব থেকে ভালো উপন্যাস—যতদূর আমি পড়ছি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টাইমলাইনটা ধরা পড়ছে। ছাত্রদের কোটা আন্দোলন কীভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিল, স্বৈরাচার হাসিনার পুলিশ লীগ আর ছাত্রলীগের নির্বাচারে মানুষ খুনের প্রতিবাদে কীভাবে সব শ্রেণির মানুষ আন্দোলনে শরিক হইল, সেইসবের একটা সম্পূর্ণ ছবি ধরা পড়ছে উপন্যাসটাতে।
উপন্যাসের প্রটাগনিস্ট রাহাত, ৩৫ বছর বয়সি এক বেকার, বিসিএস পরীক্ষার অনিয়মের ঘটনায় কাকতালীয়ভাবে ভাইরাল হয়ে যায়। ভাইরাল রাহাত হুট করে একটা ক্যাফে খুইলা বসে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে। ক্যাফের নাম দেয় ক্যাফে রেভুল্যুশন। খুব যে চিন্তা ভাবনা করে দেওয়া নাম, তা নয়। ক্যাফে রেভুল্যুশনের লোকেশনের মতোই গল্প বলার কেন্দ্রটা রাজপথে নয়, রাজপথ থেকে একটু ভেতরে। রাহাত জুলাই অভ্যুত্থানে সরাসরি যোগ না দিলেও আন্দোলনকারীদের অভিভাবক রূপে হাজির হয়। এতে করে ভিন্ন একটা পার্সপেক্টিভ হাজির হইছে গল্পে। জেন-জিদের আন্দোলনকে মিলেনিয়াম প্রজন্ম কোন চোখে দেখল, তারা কীভাবে যুক্ত হইল, সেইটা ভালোভাবেই ধরা পড়ছে।
উপন্যাসের শক্তিশালী দিক হইল গল্প। গল্পের মোড়গুলা বিশ্বাসযোগ্য ছিল। অন্য অনেক রিভিউয়াররা গল্পের শেষটা নিয়া সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু একজন রিডার হিসাবে এবং রাইটার হিসাবেও মনে হইছে যে, এইটা একটা ভালো সিদ্ধান্তই হইছে। শেষটা পাঠকের ওপরে ছাইড়া দিছেন মুরাদ কিবরিয়া। কারণ বাকি গল্পটা তো আমাদের জানাই।
উপন্যাসের চরিত্রগুলাও বিশ্বাসযোগ্য। তাদের চেনা পরিচিত মানুষ মনে হয়। কখনোই আরোপিত লাগে নাই।
উপন্যাসের ভাষাটাও চমৎকার। সমকালীন বাংলাদেশি ভাষা ব্যবহার করছেন উপন্যাসে। ক্যাফে রেভুল্যুশনের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হলো এর বর্ণনায় থাকা সূক্ষ্ম আর্বান হিউমার ও সারকজম। কথকের কথোপকথন একদম আমাদের চারপাশের বন্ধুদের আড্ডার মতো সাবলীল ও প্রাণবন্ত। বিপ্লব নিয়া লিখলেও বাড়তি গুরুগম্ভীর ভার বহন না করে স্মার্ট এবং উইটি (Witty) গদ্যের মাধ্যমে লেখক পুরা ন্যারেটিভটা আগায়া নিয়া গেছেন। যেইটা একজন জাত লেখকের পরিচয়।
ক্যাফে রেভুল্যুশন পড়তে গেলে কল্পনায় ফিরা আসে জুলাইয়ের সেইসব রক্তাক্ত দিন। হাজার হাজার মানুষ কী করে স্বার্থহীনভাবে নিজের জীবন অকাতরে বিলায়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়া গেছে, কোথায় থেকে সেই শক্তি আসত, সেইটা দেখাইতে পারে ক্যাফে রেভুল্যুশন।
জুলাইয়ের উপন্যাসে যেইসব জিনিস আমরা আশা করতে পারি, তার থেকেও বেশি ডেলিভারি করছেন মুরাদ কিবরিয়া। ক্যাফে রেভুল্যুশনকে শুধু জুলাইয়ের উপন্যাস হিসাবেই পড়ি নাই আমি। এইটাকে বাংলাদেশের কালচারাল পলিটিকস হিসাবেও পড়ছি। আমাদের দেশে মূল ধারার সাহিত্য বইলা যেই জিনিসটা পরিচিত, সেইখানে মিলাদ, জুমার নামাজ, জানাজা—এইগুলা খুব একটা দেখাই যায় না। অথচ এইগুলা আমাদেরই কালচার। এইসব সাহিত্যে নিয়া আসাটা আনকুল একটা ঘটনা হিসাবেই ধরা হয়। সেইটাও কলকাতা বাহিত রোগ। যেইটার কেন্দ্র দিল্লির হিন্দুত্ববাদী হেজেমনি।
মুরাদ কিবরিয়া রাখঢাক না রাইখাই মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পারছেন। তাদের নামও নিতে পারছেন। শিল্পের দোহাই দিয়া অপরাধীদের দায়মুক্তির যেই মাহফিল, সেইটার বক্তা হইতে চান নাই মুরাদ। এইখানেই তিনি সবার থেকে আলাদা।
দুই পৃথিবীর সূর্য
২০২৫ সালের নভেম্বরে বের হওয়া সাব্বির জাদিদের দুই পৃথিবীর সূর্য স্বাধীন বাংলাদেশের সব থেকে বড় যে দুই ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান—এক মলাটে নিয়া আসার চেষ্টা করা হইছে। ১৯৭১ সালের দাদা মতিউরের মুক্তিযোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প, আর ২০২৪ সালে নাতি তামিমের জুলাই যোদ্ধা হয়ে ওঠার গল্প।
গল্পটা একটা পরিবারের। সেই পরিবারের গল্প শুরু মুক্তিযোদ্ধা দাদা মতিউরকে দিয়া। মতিউর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিলে তার বউকে ধর্ষণ করে পাকিস্তানি মিলিটারিরা। ফলে জন্ম হয় যুদ্ধশিশু সালেহার। তাকে বড় করতে সামাজিকভাবে নানা ঝামেলার মুখে পড়ে এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। ‘২৭ বছর’ বয়সে সালেহার বিয়ে হয় এক প্রগতিশীল গবেষকের সাথে।
মতিউর যেদিন মারা যায়, সেদিনই তার ছেলে আজিজুরের বউয়ের গর্ভে আসে উপন্যাসের প্রটাগনিস্ট তামিম। তামিম নামের সেই কিশোরের হাসিনার আমলে যুবক হয়ে ওঠা, স্কুল থেকে কলেজে যাওয়া, কলেজ শেষ করে ভার্সিটিতে পড়তে ঢাকায় পাড়ি জমায়। আর সেই সময় দেশে জুলাই আন্দোলন শুরু হয়। তামিম আন্দোলনে যোগ দিলে ছাত্রলীগের হাতে খুন হয়। ফ্যাসিবাদের প্রতিবাদে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্রলীগের হাতে তামিমের শহীদ হওয়ার ভেতর দিয়া উপন্যাসটা শেষ হইছে।
আলাদা দুইটা চরিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দুইটা সময়কে দেখাইছেন লেখক। সেই চরিত্র দুইটাকে সূর্য বা আদর্শ পুরুষ হিসাবে পেইন্ট করছেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মৃত্যুর পর জুলাই অভ্যুত্থান ঘটে। ফলে লেখকের একটা ইনটেনশন থাকতে পারে যে, মুক্তিযুদ্ধ যেখান থেকে শেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেইখান থেকেই শুরু।
দাদার মৃত্যু আর নাতির জন্ম একই দিনে হওয়ার ভেতর দিয়া লেখক দেখাইছেন যে, বিপ্লব বা মুক্তিপাগল সত্তার কোনো মরণ নাই। ১৯৭১ সালের অসমাপ্ত স্বপ্ন বা আকাঙ্ক্ষা ২০২৪-এর ‘জুলাই অভ্যুত্থানে’ নাতির মাধ্যমে পুনর্জন্ম নিছে। এর ভেতর দিয়া লেখক একটা সাহসী দাবি করছেন যে, ‘মুক্তিযোদ্ধা’ এবং ‘জুলাইযোদ্ধা’ আলাদা কেউ নয়; তারা একই আদর্শের দুইটা ভিন্ন সময়ের রূপ।
গল্পের ভেতর সমস্যা আছে। মহিষের আক্রমণ, বাসর রাতে মহিষকে সালাম—এইসব জায়গায় গল্পের গরু গাছে ওঠে। দাদা-নাতির অলৌকিক যোগাযোগটাকে সিম্বলিক অর্থে নিলে মানানসই, কিন্তু বিশ্বাসের টান দিয়া টানতে হয়। মতিউর ও তামিম—দুইজনই একদম নিখুঁত। চরিত্রে গ্রে এরিয়া নাই। মানবিক দুর্বলতা নাই। সেইটা লেখকের দুর্বলতা।
তবে দুই পৃথিবীর সূর্যের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কাজ হইলো অন্য জায়গায়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে মোটাদাগে ধর্মপ্রাণ মানুষকে রাজাকার বা মানবতার শত্রু দেখানো হইছে। সাব্বির জাদিদ—যিনি নিজে একজন কওমি ঘরানার আলেম—দেখাইছেন একজন খাঁটি মুক্তিযোদ্ধা একইসাথে গভীর ধর্মপ্রাণ মানুষও হইতে পারেন। জুলাই অভ্যুত্থানে আমরা যা দেখছি—কওমি পড়ুয়া, মাদ্রাসার ছাত্র, সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ সামনের কাতারে—সেই বাস্তবতাটাই সাহিত্যে ধরতে চাইছেন লেখক। এইটা বাংলা পলিটিক্যাল ফিকশনে একটা নতুন ডাইমেনশন।
দুই পৃথিবীর সূর্য উপন্যাসের ভাষা মোটামুটি ভালো। মূল ধারার সাহিত্যে জায়গা পাবে কিনা বাহাস হইতে পারে। কিন্তু টেক্সট আর ভাবের কারণে বইটা গুরুত্ব আদায় করে নিবে, সেই কথা বলা বাহুল্য।
মুরাদ কিবরিয়া ও সাব্বির জাদিদের উপন্যাসে জুলাইয়ের প্রতি সমর্থন আসছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। যেন এইটাই হওয়ার ছিল। এইটার বিপক্ষে থাকা কোনো সুস্থ স্বাভাবিক বিবেকসম্পন্ন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। অভ্যুত্থানের পরে কী হইল, এইটার সাথে অভ্যুত্থানের যে কোনো সম্পর্ক নাই, সেই সত্যটা মুরাদ কিবরিয়া আর সাব্বির জাদিদ জানেন বইলাই সযত্নে এড়ায়া গেছেন।
কী নাই, কী থাকতে পারে
জুলাইয়ের উপন্যাসে আমরা এখনো সংখ্যালঘুদের দেখি নাই। শহীদদের পরিবারের গল্পগুলা ধরা পড়ে নাই। ছেলে হারানো মায়ের কথা, খুন হওয়া মেয়ের বাপের কথা, শহীদ হওয়া স্বামীর বউয়ের কথা, আন্দোলনে গিয়া আর বাড়ি ফিরে না আসা, বাপের অপেক্ষায় থাকা অবুঝ শিশুর কথা তুলে আনতে হবে। এইটা শুধু মিডিয়ার কাজ নয়, সাহিত্যিকদেরও কাজ।
ভিন্নমতের মানুষের গল্প যদিও ক্যাফে রেভুল্যুশনে অল্পবিস্তর ধরা পড়ছে। তবু সেইটা যথেষ্ট নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ১১ জন নারী শহীদ হইছেন। তাদের গল্প যেমন দেখি নাই, যাত্রাবাড়ীতে কওমিপড়ুয়া শহীদদের কথাও আসে নাই। ১৬৮ জন পথশিশু শহীদ হইছেন জুলাইয়ে। তাদের গল্পও ধরা পড়ে নাই। অনুপস্থিতিটা বলে দেয় সাহিত্য কার জন্য লেখা হইতেছে।
জুলাই নিয়া অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। জুলাই অভ্যুত্থান শুধু রাজপথের আন্দোলন ছিল না, এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা নজরদারি, ফেসবুক-টেলিগ্রাম গ্রুপের গোপন সমন্বয়, হেলমেট বাহিনীর তাণ্ডব এবং ক্ষমতার অলিন্দের তীব্র টানাপোড়েন। আন্দোলনের পেছনের মাস্টারমাইন্ড, লজিস্টিকস সরবরাহকারী, তথ্যপ্রযুক্তির যুদ্ধ (ইন্টারনেট শাটডাউন বনাম ভিপিএন ব্যবহার) এবং স্বৈরাচারের শেষ দিনগুলোর ভেতরের প্যানিক—এইসব নিয়া অনেক ভালো ভালো পলিটিক্যাল থ্রিলার লেখা সম্ভব।
জুলাই আন্দোলনে আবু সাঈদ বা মুগ্ধদের পাশাপাশি সব থেকে বেশি রক্ত দিছে এবং প্রতিরোধ গড়ে তুলছে ঢাকার রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা, গ্যারেজ মিস্ত্রি আর বস্তির সাধারণ মানুষ। জুলাইয়ের উপন্যাসে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা বা উত্তরায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা সেইসব নামহীন পরিচয়হীন দিনমজুরদের গল্প তুলে আনার চমৎকার সুযোগ আছে।
স্বৈরাচারের ছত্রছায়ায় থাকা বুদ্ধিজীবী, আমলা বা কালচারাল মাফিয়াদের পতনগাথাও হইতে পারে। ৫ আগস্টের পর তাদের আকস্মিক পলায়ন, ভোলবদল, আত্মগোপন এবং তাদের ভেতরের যে তীব্র পরাজয় ও ক্ষমতার লোভের যে নগ্ন রূপ—তা নিয়া কী মার্ভেলাস স্যাটায়ার কিংবা ট্রাজিক উপন্যাস কবে আসবে সেই অপেক্ষায় থাকলাম।
জুলাইয়ের আরেকটা বড় দিক ছিল—পরিবারের ভেতর আদর্শিক লড়াই, যেইটাকে আমরা ইন্টারজেনারেশনাল কনফ্লিক্ট বলতে পারি। দেখা যাইতেছে বাবা হয়তো সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তা বা দলীয় সমর্থক; আর তার সন্তান রাজপথে আন্দোলনের প্রথম সারিতে। আমরা তো দেখছিও এইরকম চিত্র। এক পুলিশের ছেলেকে অন্য পুলিশরা ১৩ বার গুলি করে মেরে ফেলছে। সেই বাপ প্রশ্ন তুলছিলেন, ‘একটা মানুষ মারতে কয়টা বুলেট লাগে, স্যার?’ এই রকম চরম মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেইখানে একই সাথে কাজ করছে সন্তানের জন্য বাবার তীব্র ভয়, ভালোবাসা, বেদনা; আবার অন্যদিকে নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস, অর্থনীতির জোগান; এই যে সংকট—এইসব পারিবারিক ও সামাজিক টানাপোড়া উপন্যাসের বড় উপাদান।
এই সমস্ত বহুমাত্রিক প্লট, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন আর প্রান্তিক মানুষের রক্তক্ষরণের গল্পগুলা সাহিত্যে তখনই সততার সাথে টিকে থাকবে, যখন লেখক নিজে সৎ থাকবেন। যদি আমরা কেবল আবেগের সাগর তৈয়ার করি, কিংবা সস্তা প্রোপাগান্ডা তৈরির উদ্দেশ্যে জুলাইকে নিয়ে লিখতে যাই, তাইলে সাহিত্যের নামে এইসব জঞ্জাল সময়ের স্রোতে ভাইসা যাবে।
জুলাইয়ের উপন্যাস কোনো একক রৈখিক বা ‘লিনিয়ার’ গল্পে আটকা থাকা উচিত নয়। এর ভেতর বিপ্লবের রোমান্টিকতা আর উদ্যাপন যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে অভ্যুত্থান-পরবর্তী মোহভঙ্গ, জটিল কালচারাল পলিটিকস এবং হারায়া যাওয়া মানুষদের জন্য অন্তহীন হাহাকার।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু বাংলাদেশিদের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন হিসাবে না দেইখা মানবজাতির মুক্তির লড়াই হিসাবেও দেখতে শিখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকে আমরা তা দেখতে পারি নাই বইলা ভুয়া তথ্য দিয়া, ভুয়া গল্প বানায়া, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈয়ার কইরা, বিশ্বের ইতিহাসবোদ্ধাদের কাছে অবহেলিত এবং হাসির পাত্র হয়া উঠছি। জুলাইয়ের উপন্যাসে সেই ভুলের যেন পুনরাবৃত্তি না হয়, সেই ব্যাপারে সর্বোচ্চ সচেতন থাকা দরকার।
[রচনাকাল : ২৬ জুন, ২০২৬]
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



