হুট করেই রুমে ঢুকে পড়ে তিন-চারজন। রায়হান কেবলই খেতে বসেছিল। পলিথিন থেকে ভাতটা প্লেটে নিয়েছে, শুঁটকি ভর্তার পলিথিনটা খুলবে কি না সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। খালি গায়ে চার হাত-পা মেলে পাবজি খেলতে থাকা সাইদুরও তড়িঘড়ি করে উঠে বসে। রুমের বাকি বাসিন্দারা এখন নেই—কেউ রিডিং রুমে, কেউবা পাশের কোনো হলে গেছে খাওয়ার জন্য। মাত্র দুজনকে দেখে রুবেলও সন্তুষ্ট হতে পারে না। লাইভ হচ্ছে ভাইয়ের পেজ থেকে, এরা আবার উল্টোপাল্টা কিছু বলে ফেলবে না তো? সময় নষ্ট না করে রুমের ভেতর এগিয়ে যায় রুবেল, তার সাঙ্গোপাঙ্গরা দাঁড়িয়ে থাকে দরজায়। রায়হান ততক্ষণে প্লেট ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, সাইদুর ব্যস্ত হাতে খোঁজার চেষ্টা করছে একটু আগে খুলে রাখা ব্যাচের টুর্নামেন্টের জার্সি।
‘এই শোন্, ভাই আসতেছে… আমাদের ডোর টু ডোর ক্যাম্পেইন শুরু হইছে। ভাই তোদের সঙ্গে কথা বলবে, তোরা নিজ থেকে একটা কথাও বলবি না।’ রুবেল চোখমুখ শক্ত করে বলার চেষ্টা করে, তবুও কেন যেন তার চেহারায় পুরোপুরি কাঠিন্য আসে না। দুই বছর পর কলকাতার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অমিতও এই কথা বলবে রুবেলকে।
রুবেলের কথার কোনো উত্তর রায়হান বা সাইদুর দিতে চেয়েছিল কি না, সেটা আমরা জানি না। কারণ ওদের ঠোঁট নড়ে ওঠার আগেই রুমে ঢুকে আরো প্রায় বারোজন। সবার আগে ঢোকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। তার হাতে লিফলেট। পেছনে থাকা দুজনের হাতে আমের ঝুড়ি। ডান পাশে একজনের হাতে ট্রাইপড। রুমে ঢুকেই হাসি-হাসি মুখ করে ইনান রায়হানের দিকে লিফলেট এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘ছোটভাই। সময় পাইলে এটা পড়ে দেইখো। এই ওরে আম দেছো?’
রায়হানের কানের নিচ দিয়ে চিকন একটা স্রোত বয়ে যায়। টেবিলের উপরে রাখা পতাকাটার দিকে বারবার চোখ যায় তার। গত কয়েক দিন এই পতাকাটা মাথায় লাগিয়ে আন্দোলনে ছিল সে।
সাইদুরের দিকে ঘোরে ছাত্রলীগ সেক্রেটারি, ঘোরে তার ক্যামেরাও। কিন্তু রায়হানের বুকের ভেতরের হাতুড়িপেটা কমে না। তার নিজ হাতে ‘কোটা প্রথা নিপাত যাক’ লেখা প্ল্যাকার্ডটা উঁকি দেয় সাইদুরের খাটের নিচে। ইনানের চোখেও হয়তো পড়ে, কিন্তু তার মুখ থেকে হাসি সরে না। এক মিনিটের মধ্যেই হাসিহাসি মুখ নিয়েই বেরিয়ে যায় সে এবং তার সঙ্গে থাকা ছোট মিছিলটি। রায়হানের শুঁটকি ভর্তার পলিথিনের ওপর পড়ে থাকে লিফলেট। শিরোনামটা পড়ে রায়হান, ‘সরকারি চাকরিতে কোটা ইস্যুর যৌক্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধানের উদ্দেশ্যে ছাত্রলীগের আহ্বান।’ রায়হান ভাত খেতে খেতে পুরোটা পড়ে। সাইদুরের অবশ্য এসবের খেয়াল থাকে না, সে আবার হাত-পা ছড়িয়ে খেলতে বসে যায়। খাওয়া শেষ করে রায়হান সাইদুরের সঙ্গে সিরিয়াস কথা শুরু করতে চায়; সাইদুর উত্তর দেয় বটে, কিন্তু তার চোখ মোবাইলের স্ক্রিন থেকে সরে না।
‘ছাত্রলীগ যেহেতু কোটা ইস্যুতে যুক্ত হইল, এবার মনে হয় সমাধান হবে। কী মনে হয় তোর?’ রায়হান লিফলেটটা উল্টাতে উল্টাতে প্রশ্ন করে।
‘হইতে পারে।’ সাইদুর খানিক বিরক্ত, একটু আগে নেতাদের চক্করে তার খেলায় ঢিল পড়েছে। এজন্য এখন রায়হানের কথায় তাল দিতে চায় না।
‘কালকে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সবাই মিলে যদি একই জিনিস চায়, তাহলে তো আর সমস্যা থাকার কথা নয়।’
‘হুঁ।’
‘কিন্তু আজকে রুবেল ভাইয়ের হাবভাব দেখছোছ? মনে হইল আমাদের উপর সে রাইগা আছে।’
‘হুঁ।’
‘দুদিন আগেই না রুবেল ভাই বলতেছিল, বৈষম্যবিরোধীর ভেতর তাদের পোলাপান আছে, ছাত্রদল-শিবির হাইজ্যাক করতে পারবে না। তাহলে আজকে আবার এমন পার্ট নিল ক্যান?’
‘হুঁ।’
‘তোর হুঁ আমি হোগা দিয়া ভইরা দিব মাদারচোদ, ঠিকঠাক কথার উত্তর দিলে দে, না হলে দিস না।’ রায়হানের গালিতে স্ক্রিন থেকে কিছুটা চোখ সরায় সাইদুর, তারপর তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিয়ে আবার খেলায় মনোযোগ দেয়।
‘তোর কী হইছে আসলে?’ রায়হানের মনে খটকা লাগে, সাইদুরকে কেমন অচেনা লাগে তার। মাত্র ৩৮ ঘণ্টা পর ঢামেকের ইমার্জেন্সিতে মাথা দিয়ে কলকল করে রক্ত পড়তে থাকা সাইদুরকেও একই রকম অচেনা লাগবে রায়হানের।
সাইদুরের বাড়ি উত্তরবঙ্গের এক জৌলুসহীন গ্রামে। বাবা স্থানীয় দাখিল মাদরাসার সুপার। গেস্টরুমে ম্যানার শিখতে শিখতে রায়হান আর সাইদুরের বন্ধুত্ব। রায়হানের বাবা সৌদিতে থাকেন। ছোট বোন এবার ক্লাস এইটে, সাইদুর অবশ্য এক বাপের এক ছেলে।
রায়হান আরো কিছুক্ষণ সাইদুরের পেট থেকে কথা বের করার চেষ্টা করে। সাইদুর এড়িয়ে যায়। তার বুকের ভেতর যে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সেটা এক বৈঠকে রায়হানকে বোঝাতে পারবে না সে। তাই পাবজির প্লে-জোনেই নিজেকে আটকে রাখে।
রায়হানের হাঁসফাঁস লাগে রুমের ভেতর। রুম থেকে বের হলেই লম্বা বারান্দা। বারান্দার এক কোনায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। বাইরেও কেমন যেন ভ্যাপসা গরম। কয়েক দিন যাবৎ টিউশন মিস যাচ্ছে। কোটার সমাধানটা হয়ে গেলে বাঁচা। মাসের অর্ধেক এখনো বাকি, পুষিয়ে দেওয়া যাবে। বারান্দা থেকে তাকালে হলের মাঝখানের ফাঁকা জায়গায় বানানো নান্দনিক বাগানটা দেখা যায়। রায়হান তখনো জানে না, ৩০ ঘণ্টা পর সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক সেখান থেকেই কাচের বোতল ছুড়ে মারা হবে কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর। আর তারপরই শুরু হবে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এসব না জানলেও পরিস্থিতি যে খুব ভালো দিকে যাচ্ছে না, সেটা আঁচ করতে পারে সে। তাই হাঁসফাঁস কমে না।
তবে ঠিক একই সময়ে পুরান ঢাকার বান্দরগলিতে নানুর বাসায় খুঁজে পাওয়া একটা রেডিও স্ক্রু দিয়ে খুলে আবার লাগাতে চেষ্টা করা ১৬ বছর বয়সের ছেলেটা জানে না, তার হায়াত আর ২৩ দিন আছে। ২৩ দিন পর মায়ের কাছে তার লিখে রেখে যাওয়া চিঠি পুরো পৃথিবীর মানুষ পড়বে আর কাঁদবে। নরসিংদীর চিনিশপুরের এক কিশোর মার্কার দিয়ে হেলমেটে তার নাম লিখছে বড় বড় করে, শোয়ার আগে ব্যাটটা নেড়েচেড়ে দেখছে। দুচোখে তার স্বপ্ন… সেও জানে না, কোনোদিন তার ক্রিকেটার হওয়া হবে না। উত্তরার সেই শিশু, যে এই রাতেও বাবার কিনে দেওয়া নতুন সাইকেলটার প্যাডেল হাত দিয়ে ঘোরাচ্ছে, সেও জানে না, তার বয়স কোনোদিন সাত হবে না। মায়ের বুকের ভেতর ঘুমিয়ে পড়া আরেক ছোট্ট বাবু, যে মারা যাবে হেলিকপ্টারের গুলিতে, তার চেহারায়ও কী স্বর্গীয় আভা! পৃথিবীর ঠিক বিপরীত সময়চক্রে বসবাস করা কিছু মানুষ, কয়েক দিন পর চলমান বর্ষাকালের এক ঝড়ে ঘুরে যাবে যাদের ভাগ্য, তারাও তখনো বুঝতে পারে না—কী হতে চলেছে সামনে।
কার্জন হলের সিঁড়িতে চলতে থাকে একের পর এক তর্ক। জাহাঙ্গীরনগরের আমতলায় মুখ গম্ভীর করে বসে কয়েকজন। নয়া পল্টন ও মগবাজারে চলে ফিসফিস কথোপকথন। রায়হান বারান্দা থেকে রুমে চলে আসে। সাইদুর তখন মোবাইল ছেড়ে উঠে বসেছে, তার চেহারায় ছোপ ছোপ কান্না।
‘এই কী হইছে তোর? কান্দিস কেন?’ সাইদুরের পাশে গিয়ে বসে রায়হান।
চোখের স্লুইস গেট খুলে যায় সাইদুরের। আটকানোর কোনো চেষ্টাও করে না সে।
‘শিউলির বিয়ে কালকে।’
‘ওই সরকারি চাকরি করা পাত্রের সঙ্গে?’
সাইদুর কোনো উত্তর দেয় না।
তার চোখে অনাগত চব্বিশের বন্যা। রায়হানও বুঝতে পারে না, কীভাবে সান্ত্বনা দেবে রুমমেটকে।
শিউলির সঙ্গে সাইদুরের সম্পর্কটা একটু কমপ্লেক্স। ফার্স্ট ইয়ার থেকে চোখে চোখে প্রেম করা এই কাপলের কথা গোটা ক্যাম্পাস জানলেও তারা নিজেরা কখনো নিজেদের প্রেমের কথা স্বীকার করে না। শিউলির বাড়িও উত্তরবঙ্গে। ইন্টারের চৌকাঠ পার হওয়ার আগেই বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা তার। পরিবারের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে সে। পারিবারিক এসব জটিলতা সাইদুরের সঙ্গেই শেয়ার করে শিউলি। প্রেমিক হিসেবে করে নাকি কাছের বন্ধু হিসেবে করে, সেটা আমরা বলতে পারব না। আমাদের ধারণা, শিউলিও আসলে জানে না। সাইদুর শিউলিকে প্রেমিকা হিসেবে কল্পনা হয়তো করেছে, এখনো করে। কিন্তু একদিন শিউলিকে নিজের ঘরে বউ হিসেবে তুলবে, এই স্বপ্ন বোধহয় সে কখনো দেখেনি। তাই সাইদুরের এই কান্নাকাটিও একটু কমপ্লেক্স। সে ঠিক কোন কারণে কষ্ট পাচ্ছে, সেটা বুঝতে না পারলেও বুক ভেঙে তার কান্না আসছে।
রাত যখন আরেকটু বাড়বে, আমরা দেখতে পাব সাইদুর আর রায়হান নাজিরাবাজারের এক চিপা দোকানে সিরিয়াল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সাকুল্যে তিনটে টেবিলের এই দোকানে সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছে ১৬ জন। সাইদুর বা রায়হান, কারো চেহারায় কোনো হতাশা নেই, অবসাদ নেই; বরং তারা নেহারির পায়া কীভাবে খেলে স্বাদ পাওয়া যায়, সে বিষয়ে আলাপ করছে। সাইদুরের কান্নাকাটি থামানোর জন্য বাইরে ঘুরতে বের হওয়ার পরিকল্পনা রায়হানের হলেও নাজিরাবাজারের দিকে রিকশা ঘুরিয়েছে সাইদুর।
ভরপুর খাওয়া-দাওয়া শেষে হলে ফেরার পথে সাইদুর একটু সিরিয়াস কথাবার্তা বলার চেষ্টা করে রায়হানের সঙ্গে। বন্ধুর কামব্যাক দেখে রায়হানও খুশি হয়।
‘আচ্ছা, একটা কথার উত্তর দে তো রায়হান। এবারের কোটা আন্দোলনে আসলে লিড দিচ্ছে কারা? তুই কয়জনকে চিনিস?’
‘বেশ কয়েকজনকেই তো চিনি। আমাদের ব্যাচ থেকেও কয়েকজন আছে। কেন এই প্রশ্ন কেন?’
‘না মানে, এবার কেমন যেন একটু ডিফরেন্ট কেস লাগতেছে আমার কাছে। ক্যাম্পাসে আসার পর থেকে টুকটাক মুভমেন্ট তো দেখছি। কিন্তু এবারের মতো দেখি নাই।’
‘কোন জিনিসটা তোর কাছে ডিফরেন্ট?’
ভিসি চত্বর থেকে মল চত্বরের দিকে হেঁটে যেতে যেতে কথা বলে দুই বন্ধু।
‘অনেকগুলো দিকই তো আছে। প্রথমত দেখ্, একক কোনো নেতা নাই। এইটা সব থেকে পজিটিভ সাইন। একজন বা একপক্ষের পকেটে এই আন্দোলন যাওয়ার সম্ভাবনা কম। আর লিড যারা দিচ্ছে, এদের ভেতর পলিটিক্যাল পোলাপানও যেমন আছে, আবার ব্রাইট ব্রাইট স্টুডেন্টও আছে, যারা আসলে কোনোদিন রাজনীতিই করে নাই।’
‘হইতে পারে। তবে আমার কাছে ভাল্লাগতেছে কর্মসূচির নামগুলা। একটা অন্যরকম ভাইব দেয়।’
‘আমি অন্য একটা জিনিস ভাবতেছি বন্ধু।’ কথাটা বলে একটু থামে সাইদুর। তার চেহারা একটু গম্ভীর হয়ে আসে।
‘কী জিনিস?’ রায়হানের কপালেও চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
‘এইবার কিন্তু ছাত্রলীগের বিচি কান্দে। দেখলি না আজকে, আগে গেস্টরুমে নিয়া কইত, আন্দোলনে গেলে হল থেইকা বাইর কইরা দিমু; আর এবার খাওয়ায় আম, নিজেরাও লিফলেট বিলায়।’ গলার স্বর খানিকটা নিচু করে বলে সাইদুর।
এ ধরনের কোনো আশা করেনি রায়হান। তাই ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগে তার। সাইদুরই আবার শুরু করে—
‘এই দফায় যদি সরকার…’
পুরো কথা শেষ করতে পারে না সাইদুর। রায়হান তার মুখ চেপে ধরে। অথচ ওরা জানেও না, সামনে মাত্র আর কয়েকটা দিন। তারপর এই কথা বলতে গেলে গলার স্বর নিচু করতে হবে না, কেউ মুখও চেপে ধরবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

