পারস্যের মরমি সাধক জালালউদ্দীন রুমি একবার এক অদ্ভুত গল্প বলেছিলেন। এক প্রেমিক তার প্রেমিকার দরজায় এসে করাঘাত করল। ভেতর থেকে সুধা হলো, ‘কে ওখানে?’ প্রেমিক উত্তর দিল, ‘আমি।’ দরজা খুলল না। দীর্ঘ বিরহ আর সাধনার পর প্রেমিক আবার ফিরে এলো, আবার কড়া নাড়ল। ভেতর থেকে সেই একই প্রশ্ন—‘কে ওখানে?’ এবার প্রেমিক নিচু স্বরে বলল, ‘তুমিই ওখানে।’ মুহূর্তেই অবারিত হয়ে গেল দ্বার। সুফিজমের এই যে ‘আমিত্ব’ বিসর্জন দিয়ে ‘তুমিময়’ হয়ে ওঠা, এটাই মূলত প্রেমের আদি ও অন্তিম রসায়ন, যেখানে দুই সত্তার মাঝে কোনো দেয়াল থাকে না, থাকে কেবল এক অবিচ্ছেদ্য একাত্মতা। এই যে একাত্ম হওয়ার তীব্র বাসনা, যা মানুষকে কখনো হাসায়, কখনো কাঁদায়, আবার কখনো আমূল বদলে দেয়—একেই আমরা ‘ভালোবাসা’ বলি। কিন্তু প্রশ্ন জাগে, এই অনুভবের নাম কেন ভালোবাসাই হলো? কেন একে অন্য কোনো অভিধায় সংজ্ঞায়িত করা হলো না?
‘ভালোবাসা’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থের দিকে তাকালে দেখা যায়, এর মূলে রয়েছে ‘ভালো’ এবং ‘বাসা’। অর্থাৎ কারো ভালোয় নিজের নিবাস খুঁজে পাওয়া। ভাষাবিদদের মতে, প্রেম বা ভালোবাসার এই অনুভব এতটাই গভীর যে, এটি কেবল একটি আবেগ নয়, বরং একটি অস্তিত্বের প্রকাশ। আদিম সমাজ থেকে শুরু করে আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ পর্যন্ত এই একটি শব্দই পৃথিবীর সব থেকে শক্তিশালী ও রহস্যময় ব্যাকরণ হিসেবে টিকে আছে। এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সৃষ্টির আদি লগ্নে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে প্রেমের যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, তা যেন এক পরম সত্যের প্রতিধ্বনি।
ইসলামি দর্শনে বলা হয়, মহান স্রষ্টা যখন আদমকে সৃষ্টি করলেন, তখন তাঁর একাকিত্ব ঘোচাতে তাঁর পাঁজরের হাড় থেকে হাওয়াকে সৃষ্টি করলেন। এই যে নিজের অংশ থেকে অন্যকে খুঁজে পাওয়া, এটাই ভালোবাসার চিরন্তন বীজ। সনাতন ধর্মে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে দেখা হয় জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন হিসেবে। সেখানে প্রেম মানে কাম নয়, বরং ত্যাগের এক চরম পরাকাষ্ঠা।
প্রেমের এই ত্যাগের মহিমা সব থেকে বেশি মূর্ত হয়ে ওঠে ইউসুফ ও জুলেখার উপাখ্যানে। জুলেখা ইউসুফের রূপ দেখে মোহিত হয়েছিলেন সত্য, কিন্তু সেই মোহ যখন প্রেমে রূপান্তর হলো, তখন তিনি রাজ্য, ঐশ্বর্য আর যৌবন—সব বিসর্জন দিলেন। সুফি কবিরা বলেন, জুলেখার এই প্রেম ছিল আসলে ‘ইশকে মাজাজি’ বা জাগতিক প্রেম থেকে ‘ইশকে হাকিকি’ বা পরম সত্যের দিকে যাত্রার সোপান। জুলেখা যখন অন্ধ আর জীর্ণ হয়ে নির্জনে কেবল ইউসুফের নাম জপতেন, তখন তাঁর কাছে ইউসুফের শরীর নয়, বরং ইউসুফের আত্মিক অস্তিত্বই ছিল ধ্যানের বিষয়। এই যে মানব-মানবীর প্রেম ছাপিয়ে এক অলৌকিক উচ্চতায় আরোহণ করা, এটাই প্রেমের আসল জাদুকরী শক্তি।
তবে এই অলৌকিকত্বের সমান্তরালে প্রেম কিন্তু আমাদের শরীরেও এক মহাযজ্ঞ ঘটায়। প্রিয় মানুষকে অন্য কারো সঙ্গে হাসতে দেখলে বা হাঁটতে দেখলে কেন বুকের ভেতর চিনচিন করে ওঠে? কেন মনে হয় হৃৎপিণ্ডটা কেউ খামচে ধরেছে? চিকিৎসা বিজ্ঞান একে কেবল মানসিক কষ্ট বলে এড়িয়ে যায় না। একে বলা হয় ‘ব্রোকেন হার্ট সিনড্রোম’ বা ‘টাকোতসুবো কার্ডিওমায়োপ্যাথি’। যখন মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে, তখন শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে স্ট্রেস হরমোন বা কর্টিসল ক্ষরণ হয়। এই হরমোন হৃৎপিণ্ডের পেশিকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে বুকের ঠিক মাঝখানে এক ধরনের শূন্যতা বা তীব্র ব্যথার অনুভূতি হয়। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রেম আসলে মস্তিষ্কের এক বিশেষ রসায়ন। যখন আমরা প্রেমে পড়ি, তখন ডোপামিন, অক্সিটোসিন আর সেরোটোনিন নামের হরমোনগুলো আমাদের স্নায়ুকে আচ্ছন্ন করে রাখে। আর যখন সেই প্রেমে বিচ্ছেদের সুর বাজে বা ঈর্ষার উদ্রেক হয়, তখন মস্তিষ্কের সেই একই অংশ সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা শারীরিক আঘাতের সময় কাজ করে। অর্থাৎ মনের ব্যথার সঙ্গে শরীরের ব্যথার সংযোগটা কোনো কবিকল্পনা নয়, বরং এক নিরেট বৈজ্ঞানিক সত্য।
সময়ের স্রোতে প্রেমের প্রকাশের ভঙ্গি বদলেছে, কিন্তু মূল সুরটি পাল্টায়নি। ১৯০০ সালের শুরুর দিকের দিনগুলোর কথা ভাবুন। তখন প্রেম ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার নাম। রবীন্দ্রযুগের সেই সময়টায় একটি চিঠির অপেক্ষায় কেটে যেত মাস তিনেক। খামের ভেতরে চন্দ্রমল্লিকার পাপড়ি বা সুগন্ধি মাখানো কাগজের সেই প্রেম ছিল বড় বেশি লাজুক আর সংবেদনশীল। প্রেম তখন ছিল ‘চোখের বালি’র বিনোদিনীর মতো দীর্ঘশ্বাস কিংবা ‘শেষের কবিতা'র অমিত-লাবণ্যর মতো বৌদ্ধিক রোমান্টিসিজম। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে প্রেম হয়ে উঠল আরো একটু বিদ্রোহী ও সামাজিক। তখন সিনেমার রুপালি পর্দায় উত্তম-সুচিত্রার চাহনিতে যে মায়া ছিল, তা সমাজ পরিবর্তনের কথা বলত। এরপর এলো নব্বইয়ের দশক। ল্যান্ডফোন আর ক্যাসেটে গান রেকর্ড করে প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার সেই সময়। ‘ও প্রিয়া তুমি কোথায়’ বলে যে আকুতি তখনকার তরুণ হৃদয়ে ছিল, তার মাঝে এক অদ্ভুত সারল্য ছিল।
আর বর্তমান জেনারেশন? এখন প্রেম মানে স্মার্টফোনের নীল আলোয় উজ্জ্বল হওয়া ‘ব্লু টিক’, কিংবা মাঝরাতে পাঠানো একটা ইমোজি। এখন প্রেমের গতি অনেক বেশি, প্রকাশের মাধ্যমও অবারিত। কিন্তু এই দ্রুতগতির যুগেও কি সেই বুকের চিনচিন ব্যথাটা বদলে গেছে? উত্তর হলো—না। আধুনিক মনোবিজ্ঞান বলছে, এই প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা প্রেমের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ‘এংজাইটি’ বা দুশ্চিন্তায় ভোগে। প্রিয়জনের ‘লাস্ট সিন’ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য কারো ছবিতে তার ‘লাইক’ দেওয়াটা অনেক সময় ডিজিটাল হৃদযন্ত্রের ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু আদিম সেই ঈর্ষা আর অনুভবের যন্ত্রণা আজও একই রকম রয়ে গেছে।
প্রেমের রসায়নকে যদি উপমার রঙে রাঙাতে হয়, তবে একে বলা যায় এক স্বচ্ছ কাচের পাত্রের মতো। এতে যতই দামি পানীয় রাখা হোক না কেন, এর সৌন্দর্য ফুটে ওঠে কেবল এর স্বচ্ছতার কারণে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো বলতে গেলে ‘পৃথিবীর সব রঙ নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন...’—প্রেম হলো সেই শেষ পাণ্ডুলিপি, যা অন্ধকারের মাঝেও নিজের আলোয় উদ্ভাসিত থাকে। এটি যেন এক সুররিয়ালিস্টিক চিত্রকর্ম, যেখানে যুক্তি হার মানে কল্পনার কাছে। সম্পর্কের এই জটিল সমীকরণকে কোনো একটি সংজ্ঞায় বেঁধে রাখা অসম্ভব। কখনো এটি শরতের শিউলি ফুলের মতো শুভ্র, আবার কখনো কালবোশেখির ঝড়ের মতো বিধ্বংসী।
তবে প্রেম কেবল নর-নারীর গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রতি মানুষের টান, প্রকৃতির প্রতি অগাধ মায়া, কিংবা নিজের সৃষ্টির প্রতি এক অদ্ভুত প্রেম—সবই তো একই সুতোয় গাঁথা। একজন চিত্রকর যখন তার তুলির টানে ক্যানভাসে প্রাণ দান করেন, কিংবা একজন মা যখন তার সন্তানের ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে থাকেন, সেখানেও তো সেই একই ‘অক্সিটোসিন’ হরমোন কাজ করে। সুফিদর্শন বলে, এই মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা একে অপরকে ভালোবাসে বলেই তারা এক হয়ে টিকে আছে। এই যে মহাকর্ষ বল, এও তো আসলে এক মহাজাগতিক প্রেমেরই নামান্তর।
আমরা যতই আধুনিক হই না কেন, আমাদের আদিম প্রবৃত্তিগুলো আমাদের বারবার সেই হৃদয়ের কাছেই ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বিজ্ঞান হয়তো এনজাইমের নাম বলে দেবে, সমাজ হয়তো নৈতিকতার দোহাই দিয়ে সম্পর্কের দেয়াল তুলবে, কিন্তু প্রেমের সেই ‘চিনচিন’ ব্যথাটা রয়েই যাবে। ইউসুফের জন্য জুলেখার সেই হাহাকার আজ হয়তো আধুনিক কোনো ক্যাফেটেরিয়ায় বসে কেউ ল্যাপটপের আড়ালে অনুভব করছে। সুফিজমের সেই প্রেমিক যেমন নিজেকে বিলীন করে প্রিয়র দেখা পেয়েছিল, আজকের মানুষও হয়তো অবচেতনে সেই নিজেকে হারিয়ে ফেলার সুযোগটাই খোঁজে।
ভালোবাসা আসলে এক আদিম জ্যামিতি, যার কেন্দ্রবিন্দু হৃদয়ে আর পরিধি অসীমে। এটি কোনো যন্ত্রের হিসাব নয়, বরং এক জীবন্ত অনুভূতি, যা আমাদের মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। আদি থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ যাত্রায় কত ভাষা বদলে গেল, কত সভ্যতা ধ্বংস হলো; কিন্তু প্রেমের সেই চিরন্তন ব্যাকরণ রয়ে গেল অপরিবর্তিত। এই নিবন্ধের প্রতিটি শব্দ যখন আপনার চোখের সামনে দিয়ে যাচ্ছে, হয়তো আপনার মনের কোনো এক কোণে কারো নাম ভেসে উঠছে, কিংবা কোনো এক পুরোনো স্মৃতির চিনচিন ব্যথা আবার জেগে উঠছে। যদি এমনটা হয়, তবে জানবেন—আপনি আজও বেঁচে আছেন, আপনি আজও একজন সংবেদনশীল মানুষ। কারণ যার হৃদয়ে প্রেম নেই, সে তো চলচ্ছক্তিহীন এক যন্ত্র মাত্র। প্রেমের এই অদ্ভুত জাদুকরী শক্তিতেই পৃথিবী টিকে থাক, আর প্রতিটি হৃদয়ে জ্বলে উঠুক সুফিজমের সেই অনির্বাণ আলোকশিখা, যা শেখায়—প্রেম মানে কেবল পাওয়া নয়, প্রেম মানে অন্য হয়ে ওঠাই হলো জীবনের চরম সার্থকতা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


আমাদের ভোট কেড়ে নেওয়া হয়েছে: সারজিস আলম