স্বাস্থ্য খাত সংস্কার

সুপারিশগুলো কি আলোর মুখ দেখবে

সুপারিশগুলো কি আলোর মুখ দেখবে

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো প্রবল এবং স্বাস্থ্যসেবার যেসব দিক নিয়ে জনগণের অসন্তুষ্টি, সেগুলো হলো মূলত সেবার মান ও পরিমাণ-সংক্রান্ত। অসন্তুষ্টির মৌলিক কারণগুলো হলোÑপ্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা এবং গণজবাবদিহিতার দুর্বলতা। স্বাস্থ্য খাতে ‘জবাবদিহিতা’ শব্দটি বহুমুখী এবং পরম্পরাবিস্তৃত। যারা স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামোতে কাজ করেননি এবং যাদের এ বিষয়ে পুঁথিগত জ্ঞান নেই, তারা অনুধাবন করতে পারবেন না।

জবাবদিহিতার জন্য স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কমিশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে। যার সামগ্রিক দায়িত্ব হবে স্বাস্থ্যসেবা ও তার ব্যবস্থাপনাÑঅর্থাৎ জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল সেবার মান এবং পরিমাণের তদারকি; স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ও হাসপাতাল সেবা ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা; শিক্ষকসহ সেবাপ্রদানকারীদের নিয়োগ এবং চাকরির শর্তÑযেমন পদায়নের জন্য নির্ধারিত পদ, পদায়নের স্থল, প্রণোদনা, পদোন্নতি ইত্যাদি নির্ধারণে অংশগ্রহণ এবং এসব শর্ত প্রতিপালন হচ্ছে কি না, তার পর্যানুসরণ ও নিশ্চয়তা বিধান; প্রশাসনিক, সেবা এবং আর্থিক বিষয়ের জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা বিধান; কর্মীদের বা সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ বা ক্রয় ও সংগ্রহে কোনো অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত ইত্যাদি। এছাড়া রয়েছে মেডিকেল, সহযোগী শিক্ষার নীতি ও মান নির্ধারণ এবং উন্নয়নের তদারকি। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, সংগঠন ও দপ্তরের নীতি, কৌশল এবং কর্মসূচি বাস্তবায়ন কার্যক্রম ইত্যাদি। কমিশনকে বিভিন্ন কর্মসূচির, সংগঠনের ও দপ্তরের আর্থিক, ভৌত, প্রশাসনিক কার্যক্রমের এবং আইনগত বিষয়ের মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করতে হবে। মূলত তিনটি দপ্তরের ওপর হবে এই কমিশনের তদারকি, হাসপাতাল ও রোগ নির্ণায়ক সেবা অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মেডিকেল ও সহযোগী শিক্ষা অধিদপ্তর। বলা বাহুল্য, তদারক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো পৃথক থাকবে, যাতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সংঘাত না ঘটে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য কমিশনকে কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হলে, অন্যান্য স্বাধীন কমিশনের তার মতো জবাবদিহিতা থাকবে সরাসরি সরকারপ্রধানের কাছে। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বে থেকে দায়িত্ব পালন করার আরেকটি সুবিধা হলো অন্যান্য খাত ও মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের প্রয়োজন হলে কমিশন সেসব ক্ষেত্রের জন্য প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি করতে পারবে ।

কমিশনের সদস্য হবেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা। উদাহরণস্বরূপ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, রোগ-তত্ত্ববিদ, গবেষণা বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, হিসাববিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞ, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার, পরিকল্পনাবিদ, সংগঠন/প্রতিষ্ঠান উন্নয়নবিশেষজ্ঞ, ক্লিনিক্যাল সেবা বিশেষজ্ঞ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপক, নার্সিং, প্যারামেডিক মাঠকর্মী ও প্রতিনিধি। অন্যান্য কমিশনের মতো স্বাস্থ্য কমিশনের একটি সাচিবিক দপ্তর থাকবে, থোক বরাদ্দ করা বাজেট থাকবে; যা নিরীক্ষিত হবে কিন্তু অন্য কোনোভাবে এই বাজেট বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে না। যেহেতু কমিশনটি স্বাস্থ্যবিষয়ক, তাই কমিশনের প্রধান হবেন জনস্বাস্থ্য বা ক্লিনিক্যালবিষয়ক একজন চিকিৎসক, যার কমিশনের ভবিষ্যৎ কার্যাবলি সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা থাকবে। কমিশন ঢাকা বা ঢাকার বাইরে কমপক্ষে ত্রৈমাসিকভাবে সভা করবে।

সংস্কার কমিশন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে একটি পৃথক, স্বয়ংসম্পূর্ণ অবকাঠামোর রূপ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। যার নীতি ও কৌশল নির্ধারণে নেতৃত্ব দেবেন জনপ্রতিনিধিরা। একজন সচিবের (চিফ) নেতৃত্বে তিনজন মহাপরিচালক মন্ত্রণালয় অনুমোদিত নীতি ও কৌশলের আলোকে প্রয়োজনীয় কর্মসূচি বাস্তবায়িত করবেন। এই তিনজনের পদমর্যাদা হবে একজন সিনিয়র সচিবের সমান এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালকরা হবেন সচিব পদমর্যাদার। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য (চিকিৎসা) শিক্ষা বিভাগে যে পরিচালক বা সমমানের পদ আছে, সেগুলো হবে অতিরিক্ত সচিবের পদমর্যাদার। সিভিল সার্জন এবং সমমানের পদ হবে যুগ্ম সচিব এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার এবং সমমানের পদ হবে উপসচিব সমমানের। প্রস্তাবিত পদগুলোর জন্য বেতন-ভাতার গ্রেড নির্ধারিত থাকলেও সেই গ্রেডের কোন স্তরে একজন নির্বাচিত কর্মচারীকে বেতন-ভাতা দিতে হবে, তা নির্ভর করবে তার যোগ্যতা ও কর্মস্থল অনুযায়ী। দৃষ্টান্তস্বরূপ, কর্মস্থলের দুর্গমতা অনুযায়ী তাকে অন্যদের তুলনায় বেতন-ভাতার ৩০ থেকে ১০০ ভাগ বেশি বেতন-ভাতা দিতে হবে। পদোন্নতির ক্ষেত্রেও এই কর্মস্থল ও কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে সততা এবং আত্মনিয়োগের ইতিহাস বিবেচিত হতে হবে। আমাদের এটি বুঝতে হবে, চিকিৎসকরা চিকিৎসা শাস্ত্রে ছয় বছর লেখাপড়া করেন। তারা লেখাপড়ায় তুলনামূলক বেশি চৌকস। তাদের অনেক ধরনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হয়। যারা হাসপাতালে কাজ করেন, তারা প্রকৃতই ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বে থাকেন। চিকিৎসকরা অন্য ক্যাডারের তুলনায় অবমূল্যায়িত, যার ফলে তারা অন্য ক্যাডারে আগ্রহী হয়ে উঠছেন বা বিদেশে চলে যাচ্ছেন।

মেডিকেল ও সহযোগী শিক্ষার মানোন্নয়ের জন্য স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন সরকারের কাছে যে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দিয়েছে, তা হলোÑমেডিকেল শিক্ষা অধিদপ্তরে নার্সিং এবং প্যারামেডিক শিক্ষার জন্য একটি করে অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং দুটি পরিচালক পদ সৃষ্টি করা। এছাড়া মেডিকেল, সহযোগী বিষয়ের শিক্ষকরা শুধু শিক্ষা এবং গবেষণাকাজে ব্যাপৃত থাকবেন এবং এজন্য তাদের উপযুক্ত পরিমাণে ভাতা দিতে হবে। হাসপাতালে ক্লিনিক্যালসেবা প্রদানকারীরা বিভিন্ন স্তরের কনসালট্যান্টরূপে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তাদের কখনো কখনো শ্রেণিকক্ষে ক্লাস নিতে আমন্ত্রণ জানাতে হবে, যাতে তারা চিকিৎসার আধুনিকতম জ্ঞানের চর্চা করতে পারেন।

জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশে পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো অবকাঠামো নেই। সংস্কার কমিশন মনে করে, এই সংস্থাটি রোগপ্রতিরোধ ও স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবীর সব উন্নত দেশে, এমনকি আমাদের প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং ভুটানে ও জনস্বাস্থ্যের জন্য আলাদা অধিদপ্তর আছে এবং সার্ক অঞ্চলে এই তিনটি দেশের স্বাস্থ্যসূচক সর্বোত্তম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই অঞ্চলে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ায় ও জনস্বাস্থ্যের জন্য পৃথক অবকাঠামো আছে। সংস্কার কমিশন তিনটি রাজনৈতিক দল ও তিনটি চিকিৎসক সমিতি ও নার্স এবং প্যারামেডিকদের প্রতিনিধি এবং এসব বিষয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সভায় মিলিত হয়েছিল। প্রস্তাবিত এই অবকাঠামোটি তাদের সবার সমর্থন পেয়েছে। সংস্কার কমিশন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে দৈব চয়নের মাধ্যমে একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল। উত্তরদাতাদের ৭২ শতাংশ এই প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর ধারণাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য একটি পৃথক ও স্বতন্ত্র কার্যক্রম, যা রোগপ্রতিরোধ, রোগ নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক ও পারিবারিক স্বাস্থ্যের এবং পুষ্টির উন্নয়নভিত্তিক কর্মসূচি পরিচালনা করবে। এজন্য জনস্বাস্থ্যবিদদের রোগতত্ত্ব; জীবপরিসংখ্যান; গবেষণা পদ্ধতি; রোগ বিস্তারে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ভাষা, শিক্ষা, ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক গঠন; রোগ বিস্তারকারী জীবের অবস্থিতি; নৃতাত্ত্বিক পটভূমি এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাস; জীবনযাপন পদ্ধতি; এক কথায় স্বাস্থ্যের সামাজিক-প্রভাবকগুলো, স্বাস্থ্যবিষয়ক নীতি, কৌশল, আইন এবং কর্মসূচি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের প্রয়োজন। অথচ জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো না থাকার ফলে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় ক্লিনিক্যাল বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের নির্দেশে।

জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত হলে এর মহাপরিচালকের অধীন চারজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক থাকবেনÑগ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা, নগর স্বাস্থ্যসেবা, পারিবারিক স্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টিসেবার জন্য। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই স্বাস্থ্য, পরিবারকেন্দ্রিক সেবা, পুষ্টি, গণযোগাযোগ ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আর্থিক বা কারিগরি সামর্থ্য নেই। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম ২০১১ সাল থেকে স্থবির। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীন ১,১২০ জন চিকিৎসক স্বাস্থ্য বিভাগে আত্মীকৃত হতে ইচ্ছুক। পক্ষান্তরে ক্যাডারভুক্ত ৩০৩ নন-টেকনিক্যাল কর্মকর্তা প্রশাসনিক বা অন্য কোনো ক্যাডারে যোগ দিতে ইচ্ছুক। বিকল্প হিসেবে এই ৩০৩ কর্মকর্তা অবসর গ্রহণ করলে কমিশন এই পদগুলো বিলুপ্তির ও পরামর্শ দিয়েছে। কমিশন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগকে প্রস্তাবিত জনস্বাস্থ্য বিভাগে আত্মীকরণ করে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক পদ সৃষ্টি করার পরামর্শ দিয়েছে। কমিশন স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার পরিকল্পনা সহকারী ও কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রভাইডারদের কার্য এলাকা তিন ভাগ করে তাদের একই ধরনের সেবা প্রদানকার্যে সংযুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রাথমিক ক্লিনিক্যাল ও রোগ নির্ণায়ক, রোগপ্রতিরোধক এবং রোগ নিয়ন্ত্রণমূলক সেবা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা হিসেবে ইউনিয়ন ও শহর এলাকার ওয়ার্ড এবং এর নিম্নপর্যায় থেকে দিতে হবে। তবে সে লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক সহায়তা ট্রাস্টকে অবলুপ্ত করতে হবে এবং এর দপ্তরের জন্য নির্ধারিত স্থানে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর নির্মাণ করতে হবে।

জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো মহামারি, অতিমারি এবং দুর্যোগকালীন অন্যান্য সমস্যার ব্যবস্থাপনা। এসব কার্যক্রমের জন্য জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে যেকোনো সরকারি বা বেসরকারি/ব্যক্তি খাতের হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ফ্যাক্টরি আপৎকালীন সময়ের জন্য ব্যবহারের ক্ষমতা দিতে হবে। আপৎকালীন এই কৌশল পৃথিবীর প্রায় সব দেশে বিরাজমান। এজন্য জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে আত্মীকৃত আর যেসব দপ্তর থাকবে সেগুলো হলো : পরিচালক সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (যার অধীন থাকবে সব রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম), পরিচালক অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠান, ইপিআই, মা ও শিশুস্বাস্থ্য ইত্যাদি। সংস্কার কমিশন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সর্বজনীনভাবে বিনামূল্যে দেওয়ার প্রস্তাবে দিয়েছে। এই সেবার ব্যবস্থাপনা স্পষ্টতই একটি জটিল বিষয়। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর সৃষ্টির সুপারিশ করা হয়েছে এটাকেও বিবেচনায় রেখে।

ক্লিনিক্যাল ও রোগ নির্ণায়কসেবা বর্তমান স্বাস্থ্যসেবা অধিদপ্তর অন্তর্গত থাকবে। এই অধিদপ্তরের নতুন নাম হতে পারে হাসপাতাল ও রোগ নির্ণায়কসেবা অধিদপ্তর। উপজেলা বা তদূর্ধ্ব সেবা প্রতিষ্ঠানে সেবা দেওয়া হবে শুধু ইউনিয়ন বা শহর এলাকার ওয়ার্ড ও এর নিম্নপর্যায় থেকে রোগী রেফার করা হলে । এর ফলে ওপরের দিকে যারা সেবা দেন, তারা আরো সময় নিয়ে রোগী দেখতে পারবেন এবং চিকিৎসাসেবার মান আরো উন্নত হবে। তবে এজন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা এমনভাবে বাড়াতে হবে, যাতে রোগীরা সরাসরি রেফার করা সেবা কেন্দ্রে না যান।

হাসপাতালে প্রদত্ত সেবার মান সন্তোষজনক না হওয়ার একটা বড় কারণ চিকিৎসক ও নার্সদের মধ্যে সৌহার্দ্যের অভাব। এর মূল কারণ নার্স ও চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থাপকদের পৃথক সংস্থা। এজন্য নার্সদেরও আগের মতো হাসপাতাল ও রোগ নির্ণায়ক সেবা অধিদপ্তরে একীভূত করতে হবে । তবে বর্তমানে নার্সদের যে পদগুলো আছে, তার সঙ্গে একটি অতিরিক্ত মহাপরিচালক এবং প্যারামেডিকদের জন্যও একটি পরিচালকের সৃষ্টি করতে হবে এই অধিদপ্তরে। হাসপাতাল সেবার মানোন্নয়ের জন্য চারটি সহায়ক কর্মসূচিকে শক্তিশালী ও সমন্বিত করতে হবে। এগুলো হলোÑরোগ নির্ণায়ক পরীক্ষাগার, ফার্মেসি, রক্ত পরিসঞ্চালন ও অ্যাম্বুলেন্স। এসব সেবা এলাকার হাসপাতালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকবে এবং এই সেবাগুলোর জন্য একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক সহায়ক সেবা ও চারটি পরিচালক পদ সৃষ্টি করতে হবে। এই সেবাগুলো জাতীয় পর্যায় থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যন্ত আলাদা আলাদা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যুক্ত ও পরিচালিত হবে । এই চারটি সেবার জন্য জাতীয় পর্যায় থেকে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আলাদা আলাদা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থাকবে। দেশের সব হাসপাতালে এসব সেবা চব্বিশ ঘণ্টা প্রাপ্য থাকবে। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাত বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসব সেবা ওই নেটওয়ার্কগুলোর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সবার জন্য বিনামূল্যে দেওয়ার নিশ্চয়তার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক মিডওয়াইফ, প্যারামেডিক, মাঠকর্মী, তাদের তত্ত্বাবধানকারী, চিকিৎসক ও সহকারী চিকিৎসক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। জিডিপির ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দ করতে হবে, যা হতে হবে বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ১৫ শতাংশ। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও চিকিৎসক সমিতিগুলো একমত। বার্ষিক কর ছাড়াও অর্থের সংস্থান হতে পারে সামাজিক দায়বদ্ধতা কর, সিন-ট্যাক্স, দাতাদের দান, রোগীদের দান থেকে। কমিশন প্রস্তাব করেছে, যারা সংগঠিত (ফর্মাল) খাতে চাকরি করেন, তাদের জন্য সামাজিক স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে হবে। তবে ২০ শতাংশ অতিদরিদ্রকে সব হাসপাতালে বিনামূল্যে সেবা দিতে হবে, যার ১০ শতাংশ হবে আগের মতো ব্যক্তি খাতের হাসপাতালে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন