জরুরি পরিস্থিতি ও সংকটকালে নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং আমদানিনির্ভরতা কাটিয়ে এ খাতের সুরক্ষায় জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে প্রধান প্রধান ওষুধের ন্যূনতম মজুত নিশ্চিত করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) জরুরি ওষুধের ন্যূনতম বাফার স্টক বজায় রাখার বিধানসহ এ সংক্রান্ত কাঠামোর খসড়া তৈরি করবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে ওষুধ খাতের সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরো শক্তিশালী এবং সংকটমুক্ত রাখতে এই উদ্যোগ সময়োপযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সভায় জানানো হয়, দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারকরা স্থানীয় চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ পূরণ করলেও অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস (এপিআই) এবং মূল কাঁচামালের ৯০ শতাংশেরও বেশি আমদানি করতে হয়। আমদানিনির্ভরতা কমাতে গজারিয়া এপিআই শিল্প পার্কটি দ্রুত চালু করার পরিকল্পনাও হাতে নিয়েছে সরকার।
এছাড়া বর্তমান স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা অনুযায়ী দেশের অত্যবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা (এসেনশিয়াল মেডিসিনস লিস্ট) হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিষদ। এজন্য বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকীকে প্রধান করে কমিটি করা হয়েছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) এই কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
সভায় দেশের ওষুধ খাতের নিয়ন্ত্রণমূলক সক্ষমতা জোরদার এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল বেঞ্চমার্কিং টুলের অধীনে ম্যাচুরিটি লেভেল ৩ (এমএল-৩) অর্জনের বিষয়গুলোও পর্যালোচনা করা হয়। এতে বায়ো-ইকুইভ্যালেন্স স্টাডির জন্য দেশীয় সক্ষমতা তৈরি, সেন্ট্রাল মেডিসিন ল্যাবরেটরি স্থাপন এবং গবেষণা ও পরীক্ষার মান বাড়াতে ওষুধ কোম্পানি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার সুপারিশ করা হয়।
প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনা মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং অন্যান্য জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর কাঠামো হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সভায় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বাপি) সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির দেশের শক্তিশালী উৎপাদক সক্ষমতা এবং কাঁচামালের আমদানির ওপর নির্ভরতার ব্যবধান তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশীয় উৎপাদন বর্তমানে চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশ মেটালেও এপিআই এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের ৯০ শতাংশের বেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল।
তিনি ওষুধ খাতের সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা দূর করতে সরকারের দ্রুত নীতিগত সহায়তা ও হস্তক্ষেপ কামনা করেন এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের জন্য ২০-৩০টি অত্যাবশ্যকীয় এপিআইয়ের অগ্রাধিকার তালিকা তৈরির প্রস্তাব দেন।
এছাড়া নতুন কমিটিতে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে সদস্য রাখার বিষয়ে মতামত দেন।
তিনি জানান, বাংলাদেশের ওষুধশিল্পে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা শক্তিশালী হলেও এপিআই ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালে আমদানির ওপর নির্ভরতা খাতটিকে ঝুঁকিপূর্ণ করেছে। ২০ থেকে ৩০টি এপিআইয়ের অগ্রাধিকার তালিকা চিহ্নিত করে স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। এছাড়া গজারিয়া এপিআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক কার্যকর করার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নিজস্ব অর্থায়নে গ্যাস লাইন ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অনুমতি পেতে দীর্ঘ সময় লাগার বিষয়টি সহজতর করার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
বাংলাদেশ এপিআই অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়েট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাইমা) মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ এপিআই আমদানি করে, যার ফলে প্রতি বছর এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে। বাইমা জানায়, দেশীয় এপিআই উৎপাদন বাড়লে আমদানি নির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট ও কাঁচামালের মূল্য ওঠানামা থেকে ওষুধ শিল্প সুরক্ষিত থাকবে। চীন ও ভারতের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে সংগঠনটি জানায়, একটি শক্তিশালী দেশীয় এপিআই শিল্প ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী খাতে পরিণত হতে পারে।
এদিকে ওষুধ খাতের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওষুধ রপ্তানি বেড়ে ২৩ কোটি ৮৫ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০১০-১১ অর্থবছরের চার কোটি ৪২ লাখ ডলারের তুলনায় সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি।
বাপি ও বাইমার সূত্র জানায়, এপিআই খাতের প্রতি অধিক নীতিগত সহায়তা তরুণ ও শিক্ষিত সমাজের জন্য জ্ঞানভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি বৈশ্বিক ওষুধ মূল্য শৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো সুদৃঢ় করবে।
এপিআই শিল্পকে পুরোপুরি সচল করতে দেশীয় বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি প্রয়োজনে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ আনার পরামর্শ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ চৌধুরী। তিনি গবেষণার কাজে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত তহবিল ও যন্ত্রপাতি বরাদ্দ দেওয়া এবং আধুনিক সেন্ট্রাল মেডিসিন ল্যাবরেটরি স্থাপনের জোরালো দাবি জানান।
সভায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ডিজি মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন জানান, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি মেডিসিন সাপ্লাই কনটিনজেন্সি প্লান প্রস্তুত এবং ন্যূনতম বাফার স্টক নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত টাস্কফোর্সের আদলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠনের পক্ষে মত দেন তিনি।
এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল বেঞ্চমার্কিং টুলের ম্যাচুরিটি লেভেল-৩ অর্জনের ক্ষেত্রে ২১১টি সাব ইন্ডিকেটরের মধ্যে ১৮৭টি সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে বাকি লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত জনবল নিয়োগের কথা বলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন সভায় জানান, ১৯৯৮ সালে পিএইচসির জন্য ১১৭টি ওষুধের তালিকা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের জানুয়ারি ও আগস্টের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে এবং দীর্ঘ সময় বাহিত হওয়ায় বর্তমান চিকিৎসাপদ্ধতি ও রোগীর ধরন অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করার আহ্বান জানান।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

