মোহাম্মদপুরে ওসি-এসআইকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করল ছিনতাইকারীরা

স্টাফ রিপোর্টার

মোহাম্মদপুরে ওসি-এসআইকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করল ছিনতাইকারীরা

রাজধানীর আদাবরে সকালে বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা লুটের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনাটি। অভিযুক্তদের ধরতে বিকেলে পুলিশের অভিযানে ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে চড়াও হলে আহত হন থানার ওসি ও এক এসআই। পরে পুলিশের পাল্টা গুলিতে আহত হয় ছিনতাইকারী চক্রের দুই সদস্য।

চারজনকে আটক করার পর আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করা একটি সংঘবদ্ধ ছিনতাই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের শনাক্ত করা গেছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে। আদাবরের শেখেরটেক ৭ নম্বর সড়কের মাথায় শফিকুল ইসলাম (৩৯) নামের এক বিকাশ এজেন্ট মাত্রই দোকান খুলেছিলেন। এমন সময় হঠাৎ ৪-৫ জনের একদল সশস্ত্র তরুণ চাপাতি উঁচিয়ে দোকানে ঢুকে পড়ে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ক্যাশ বাক্সে হাত দেয় তারা। শফিকুল বাধা দিলে দুর্বৃত্তরা তার মাথা, বাম হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে এলোপাতাড়ি কোপাতে শুরু করে। এরপর ক্যাশে থাকা প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা ও বিকাশ লেনদেনের মোবাইল ফোনটি নিয়ে চম্পট দেয়। রক্তাক্ত শফিকুলকে উদ্ধার করে দ্রুত পঙ্গু হাসপাতালে (নিটোর) ভর্তি করা হয়, যেখানে বর্তমানে তার অস্ত্রোপচার চলছে।

আহত শফিকুল ইসলামকে দ্রুত উদ্ধার করে শেরে-বাংলানগরে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) ভর্তি করা হয়। তার স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা পরিকল্পিতভাবে দোকানে প্রবেশ করে এবং মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ হামলা চালায়। তার হাত, মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখমের চিহ্ন রয়েছে।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা জানান, এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত কিশোর গ্যাং ‘কবজি কাটা গ্রুপ’। আদাবর, শ্যামলী ও মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান, নবীনগর ও চন্দ্রিমা হাউজিংসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও জমি দখলের রাজত্ব কায়েম করে আসছিল।

বিকেলের রুদ্ধশ্বাস অ্যাকশন

সকালের এই দুর্ধর্ষ ছিনতাইয়ের পর সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে পুলিশ। এরপরই শুরু হয় চিরুনি অভিযান। বিকেল ৪টার দিকে আদাবর থানার ওসি মো. জাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল বেড়িবাঁধ সংলগ্ন ডেল্টা গার্মেন্টসের পেছনে যায়, যেখানে ছিনতাইকারীরা আত্মগোপন করেছিল। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অবরুদ্ধ অপরাধীরা চরম বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আত্মসমর্পণ করার পরিবর্তে তারা ধারালো অস্ত্র ও চাপাতি নিয়ে সরাসরি পুলিশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তাদের আকস্মিক ও নৃশংস চাপাতির আঘাতে গুরুতর জখম হন আদাবর থানার ওসি মো. জাহিদুল ইসলাম এবং এসআই তরুণ।

পাল্টা গুলি ও চার অপরাধী ধরাশায়ী

সহকর্মীদের ওপর এমন প্রাণঘাতী হামলা ও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে পুলিশ নিজেদের জীবন রক্ষার্থে পাল্টা গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। পুলিশের গুলিতে মুহূর্তের মধ্যে লুটিয়ে পড়ে দুই ছিনতাইকারী। পরে স্পট থেকেই চারজনকে আটক করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো— এলাকায় ‘চোরা রুবেল’ ও ‘কানা আমির’ নামে পরিচিত দুই গুলিবিদ্ধ শীর্ষ অপরাধী এবং তাদের সহযোগী কাশেম ও মো. জয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আত্মরক্ষার্থেই পুলিশ গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগেও ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে চক্রটির অন্য সদস্যদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হঠাৎ চিৎকার ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার শব্দে পুরো এলাকা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আদাবর, ঢাকা উদ্যান, তুরাগ হাউজিং, চন্দ্রিমা হাউজিং, শ্যামলী হাউজিং এবং আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি সংঘবদ্ধ কিশোর ও তরুণ গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্রের বিরুদ্ধে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক বাণিজ্য এবং জায়গা-জমি দখলের অভিযোগ বহুদিনের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সাম্প্রতিক সময়ে এসব গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ে নানা অভিযোগ ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন