সরকারের হাতে নেই নিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিকসমৃদ্ধ ডাটাবেজ। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) যৌথ চেষ্টায় তৈরি হয় এই ডাটাবেজ। এখন পুরো ডাটার একক মালিকানা দাবি করছে সংস্থাটি। এতেই আপত্তি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। এ নিয়ে উভয়ের মধ্যে চলছে চিঠি চালাচালি। এখন পর্যন্ত ফলাফল শূন্য। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ডাটাবেজটি ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।
এদিকে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রথম থেকেই উদ্বিগ্ন রাষ্ট্রের তিনটি সংস্থা। এগুলো হলো জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও নির্বাচন কমিশন (ইসি))। এর পরও তিনটি পক্ষই সর্তক, যাতে কোনো ফন্দি-ফিকিরে তাদের সেবা নিয়ে সরকারি সুবিধা নিতে না পারে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। এজন্য রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ পেতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পৃথকভাবে চিঠি দিচ্ছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে পৃথক যে কমিটি রয়েছে, তার নিয়মিত সভা হচ্ছে। এই ইস্যুতে খুব বেশি সুখবর এখন অবধি নেই। ফলে রোহিঙ্গা ডাটাবেজের সঙ্গে ইসি, পাসপোর্ট ও জন্ম নিবন্ধনের অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম (অ্যাফিস) ক্রসম্যাচিং শেয়ারিং করা যাচ্ছে না।
এ কারণে আশ্রিত রোহিঙ্গারা বর্তমানে তাদের জন্য থ্রেট। কারণ কে রোহিঙ্গা বা কে রোহিঙ্গা নয়, তা সঠিকভাবে শনাক্ত হচ্ছে না। ফলে অসদুপায়ে দালাল চক্রের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা কৌশলে জন্ম সনদ পেয়ে যাচ্ছে। এটা পেয়েই মিশে যাচ্ছে মূল স্রোতে। পরের ধাপে ছবিসহ জাতীয় পরিচয়পত্র বাগিয়ে নিচ্ছে। সব শেষে পাসপোর্ট পেয়েই উড়াল দিচ্ছে বিদেশে। সেখানে গিয়ে বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে বাংলাদেশের দুর্নাম কুড়াচ্ছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের অপরাধের দায়ে সংকুচিত হচ্ছে দেশের শ্রমবাজার। এসব কাজে দেশের একটি অসাধু দালাল চক্র জড়িত বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৯ জন রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। অন্যদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৪১৭ জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অবস্থান করছে। এর মধ্যে আশ্রয়প্রার্থী এতিম শিশু রয়েছে ৩৯ হাজার ৮৪১টি। নিবন্ধনকৃত আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬ জন। বাংলাদেশে অবস্থানের পর আরো লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিয়েছে বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। প্রতিনিয়ত ইউএনএইচসিআর বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়ায় তাদের নিবন্ধন করছে।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় বসতি স্থাপন করেছে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা পরিবারের সংখ্যা এক লাখ ৭৩ হাজার ৪৪টি। এসব পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাত লাখ ৪১ হাজার ৯৪৭ জন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রোহিঙ্গারা যাতে জাতীয় পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন করতে না পারে, সেজন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার কাছে রক্ষিত রোহিঙ্গা ডাটাবেজ ব্যবহার করতে চাচ্ছে সরকার। এমনকি ইসি, পাসপোর্ট ও জন্ম নিবন্ধন কর্তৃপক্ষও এটি পেতে চাইছে। সর্বশেষ গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন থেকে তথ্য চেয়ে পররাষ্ট্র সচিবকে চিঠি পাঠানো হয়। এর আগেও কয়েক দফা পত্রবিনিময় হয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের তথ্য না পাওয়ায় জাতীয় ভোটার পরিচয়পত্র থেকে তাদের বিরত রাখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ রয়েছে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার কাছে এবং তাদের ওই তথ্য ব্যবহার করা সম্ভব হলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এটা পাওয়ার বিষয়টি সময়সাপেক্ষ বলে জানান তিনি।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ আমার দেশকে বলেন, রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের যৌথ প্রচেষ্টায় হয়। এটি কারো একক সম্পদ নয়। আমাদের সঙ্গে দফায় দফায় সভা হচ্ছে। তাদের ডাটা এখনো আমরা পাইনি। তবে পাওয়া যাবে না, সেখানকার আলোচনায় এমনটা মনে হয়নি।
স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের রেজিস্ট্রার জেনারেল অতিরিক্ত সচিব মো. যাহিদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ ব্যবহারসংক্রান্ত ইস্যুতে পরারাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি কমিটি করেছে। আমরা ওই কমিটির বৈঠকে নিয়মিত উপস্থিত থাকি। ডাটা যাদের কাছে আছে, সেই ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে আমরা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারি না। তিনি জানান, মন্ত্রণালয় যদি ডাটা স্থানান্তর করে, তার জন্য আমরা প্রস্তুত আছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত ইউএনএইচসিআরের ডাটা আমাদের দেওয়া হবে কি না জানি না।
রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের যৌথ প্রচেষ্টায় করা হয়ে থাকলে তথ্যভান্ডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে দেওয়ার বিষয়ে আপনাদের আপত্তি কোথায়Ñ আমার দেশ-এর পক্ষ থেকে এমন প্রশ্নে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশের প্রতিনিধি ও প্রধান সেক্রেটারি এসএম জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, আমাদের অফিস স্থানান্তর হচ্ছে। তাই ডাটা তথ্যভান্ডার বিনিময়ে সর্বশেষ অবস্থান কী তা এই মুহূর্তে জানাতে পারছি না।
তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার ডেস্কের পরিচালক সুজন দেবনাথ আমার দেশকে বলেন, বায়োমেট্রিকসমৃদ্ধ রোহিঙ্গা ডাটাবেজ সরকারের পাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা এবং ইউএনএইচসিআর একই লাইনে আছি। যেহেতু রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজ আমাদের দেশের মাটিতেই তৈরি হয়েছে, এটা আমরা শিগগিরই নেব। সেটা আগামী এয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেই নিতে হবে বলে তিনি জানান।
তিনি আরো বলেন, এ বিষয়ে অল্প সময়ের মধ্যে টেকনিক্যাল কমিটির মিটিং হবে। সেখানে কত সময় লাগতে পারে তা জানতে পারব। তিনি বলেন, ডাটাবেজটি সুরক্ষিত রাখতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

