রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের আড়ালে চলছিল নাশকতার ছক। ১৫ আগস্ট ঘিরে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে অগ্নিকাণ্ড ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা এবং সেটি বাস্তবায়নে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ওই বাড়িতে গোপন বৈঠকে মিলিত হন। খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গ্রেপ্তার করা হয় ৫৪ জনকে।
গ্রেপ্তার হওয়া ৫৪ জনের মধ্যে ৫২ জনকে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় দুজনকে গাজীপুরের টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
গোপন এ বৈঠকের অন্যতম মূল হোতা ও মাস্টারমাইন্ড ছিলেন যুব মহিলা লীগের নেত্রী মেহজাবিন আক্তার মালা এবং তার স্বামী রূপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মোতালেব হোসেন। দুজনই রূপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা।
মোতালেবের দ্বিতীয় স্ত্রী মালা। এর আগে আরেকটি বিয়ে করেন মোতালেব। সেখানে তার চার সন্তান রয়েছে। আওয়ামী আমলে জমি দখল, চাঁদাবাজি, জমির সেটেলমেন্ট ও বালুর ব্যবসা করে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হন তারা। এর ধারাবাহিকতায় এম ব্লকের নিরিবিলি পরিবেশে ওই ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে গোপনে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছিলেন এই দম্পতি।
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় মোতালেবের একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো আমার দেশকে জানিয়েছে। বসুন্ধরা এম ব্লকের ২৮ নম্বর সড়কের ২১৭৩ নম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এ অভিযান চালানো হয়। বাড়িটি বসুন্ধরা এলাকার একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের মালিকের বলে জানা গেছে। তবে বাড়ির মালিক ওই ভবনে থাকেন না।
স্বামী-স্ত্রীর নীলনকশা
সরেজমিন অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, ওই সড়কটি বেশ নির্জন। চারপাশের অনেক প্লট এখনো খালি থাকায় অপরাধীদের গোপন আস্তানা হিসেবে এটি বেছে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর থেকে পাঁচটি মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন যানবাহনে করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ক্যাডাররা সেখানে আসেন। মোতালেব ও তার স্ত্রী মালা ভবনের মূল ফটকে নেমে এসে তাদের অভ্যর্থনা জানান।
ভবনের নিরাপত্তারক্ষী ও প্রতিবেশীদের তারা জানিয়েছিলেন, ভেতরে জন্মদিনের একটি ঘরোয়া উৎসব হচ্ছে। তবে ক্ষমতার দাপট ও অচেনা ব্যক্তিদের আনাগোনায় বাড়িওয়ালার সন্দেহ হয়। ওই দিন রাত ৯টার দিকে ভাটারা থানা পুলিশ বাসাটি ঘেরাও করে। ভেতরে প্রবেশ করতেই তল্লাশি চালিয়ে বিপুল পরিমাণ প্ররোচনামূলক ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, ফেসমাস্ক ও নাশকতার সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পুলিশ সেখান থেকে মালা-মোতালেবসহ মোট ৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রের আরেক সদস্যকে আটক করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার এসআই হাফিজুর রহমান আমার দেশকে জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে ১৫ আগস্টের আগেই রাজধানীতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। বসুন্ধরার ওই ফ্ল্যাটে অভিযানের পর এখন পুলিশের নজর শুধু গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ওপর নয়; তাদের যোগাযোগ, অর্থের উৎস, কার নির্দেশে বৈঠক এবং পরবর্তী কর্মসূচি কী ছিলÑএসবের উত্তর খোঁজা। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য, নাশকতার পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার পরই অভিযান চালানো হয়।
দম্পতিকে ঘিরে তদন্ত
বসুন্ধরার বৈঠকে গ্রেপ্তারদের মধ্যে মেহজাবিন আক্তার মালা এবং তার স্বামী মোতালেব হোসেনকে ঘিরে তদন্তে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তারা ফ্ল্যাটটি ব্যবহার করে গোপনে দলীয় তৎপরতা চালাচ্ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, মোতালেবের বিরুদ্ধে অতীতে জমি, বালু ব্যবসা ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। জুলাই আন্দোলন দমনে ছাত্র-জনতার ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে মামলাও রয়েছে। ফ্ল্যাটটিতে প্রায়ই অপরিচিত লোকজনের যাতায়াত নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল আগেই। নিরাপত্তাকর্মী ও বাসিন্দাদের কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তিতে থাকলেও প্রভাবশালী পরিচয়ের কারণে সরাসরি প্রশ্ন করতে সাহস পেতেন না।
আগস্টজুড়ে ছোট ছোট জমায়েত
বসুন্ধরার ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। চলতি আগস্টে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে। ১৫ আগস্টকে কেন্দ্র করে রাজধানীজুড়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ৩১ জুলাই থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ৯১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
১১ আগস্ট বনানীতে মিছিলের প্রস্তুতির সময় চারজনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। সেখানে ককটেল বিস্ফোরণের অভিযোগও রয়েছে। ৭ আগস্ট বনানীর আর্মি স্টেডিয়ামসংলগ্ন এলাকায় মশাল মিছিলের প্রস্তুতির অভিযোগে সাতজনকে আটক করা হয়।
বসুন্ধরার অভিযানের পাশাপাশি মিরপুরেও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এক নেতা ও অঙ্গসংগঠনের এক কর্মীকে গ্রেপ্তারের তথ্য এসেছে।
পুলিশের অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর নামে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
পুলিশ ও র্যাবের কঠোর অবস্থান
১৫ আগস্টকে সামনে রেখে রাজধানীর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাড়তি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রবেশপথে তল্লাশি, গোয়েন্দা নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা বৃদ্ধি, ডিবি ও সিটিটিসির তৎপরতা এবং প্রয়োজনে বিশেষায়িত ইউনিট প্রস্তুত রাখার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
মেট্রোরেল স্টেশন, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, শপিংমলসহ জনসমাগমপূর্ণ এলাকাগুলোয়ও নজরদারি বাড়ানোর কথা রয়েছে। র্যাবের পক্ষ থেকেও সাইবার স্পেসে নজরদারির কথা বলা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানিমূলক পোস্ট কিংবা বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করে যাতে উত্তেজনা ছড়ানো না যায়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে। বসুন্ধরার ফ্ল্যাটে অভিযান শেষ হলেও তদন্ত শেষ হয়নি। বরং এখান থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরো কোথাও যোগাযোগ বা প্রস্তুতি রয়েছে কি না, সেটিই এখন পুলিশের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বসুন্ধরার বৈঠক ও নতুন নজরদারি
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যাচ্ছে, একটি ফ্ল্যাটে ৫৪ জনের উপস্থিতি, যার মধ্যে ৫২ জনের কারাগারে যাওয়া এবং দুই কিশোরের শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোÑঘটনাটির আইনি দিক এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। এখন বাকি প্রশ্নগুলো তদন্তের। কে ফ্ল্যাটটি ভাড়া নিয়েছিল, কারা লোকজনকে ডেকেছিল, বৈঠকের অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কোথায় মিছিল হওয়ার কথা ছিল, কারা মাঠে নামার দায়িত্বে ছিল এবং রাজধানীর অন্য এলাকার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে এ বৈঠকের কোনো যোগসূত্র আছে কি নাÑএসব প্রশ্নের উত্তরই তদন্তের পরবর্তী ধাপ।
সূত্র বলছে, বসুন্ধরার ওই ফ্ল্যাটে ‘জন্মদিনের আয়োজন’ বলে যে জমায়েতের কথা বলা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে পরিণত হয় ৫৪ জনের গ্রেপ্তারে। পুলিশের দাবি সত্য হলে এটি শুধু একটি গোপন বৈঠক নয়; বরং ১৫ আগস্টকে ঘিরে নাশকতার প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি ছিল। আর সেই সূত্র ধরেই এখন রাজধানীর অন্য প্রান্তেও নজর বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


