ইউরোপজুড়ে দাবানল, ফ্রান্সে অগ্নিসংযোগের সন্দেহে গ্রেপ্তার ৫০০

ইউরোপজুড়ে দাবানল, ফ্রান্সে অগ্নিসংযোগের সন্দেহে গ্রেপ্তার ৫০০
ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

রেকর্ড তাপপ্রবাহের মধ্যে ভয়াবহ দাবানলে পুড়ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ফ্রান্সে চলতি গ্রীষ্মে দাবানল সৃষ্টির সন্দেহে প্রায় ৫০০ জনকে আটক করা হয়েছে। এদিকে ক্রোয়েশিয়া, জার্মানি, স্পেন, গ্রিস ও যুক্তরাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে বড় ধরনের দাবানল। কোথাও বাড়িঘর পুড়েছে, কোথাও পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগুনের ঝুঁকিতে স্পেনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ঐতিহাসিক নিদর্শনও।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে, মহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় দাবানলের পরিস্থিতি এখন ‘অত্যন্ত চরম’ পর্যায়ে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার জানিয়েছে, ১ জুলাই থেকে দেশটিতে দাবানলের ঘটনায় ৪৭৪ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। আটক ব্যক্তিদের প্রায় ৭০ শতাংশের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর সন্দেহ রয়েছে। বাকিদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগানোর অভিযোগ রয়েছে।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বোর্দো বিমানবন্দরের কাছে জুলাইয়ে একটি দাবানলে দুই দমকলকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরকে আটক করা হয়েছে।

শুক্রবার ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লঁদ বিভাগের লুগলঁ গ্রাম থেকে ৫২৫ জনের বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে নতুন করে দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে আগুন প্রায় ১ হাজার ১০০ হেক্টর শুকনো পাইনবন পুড়িয়ে দিয়েছে।

আঞ্চলিক কর্মকর্তা জিল ক্লাভরেল সাংবাদিকদের বলেন, পরিস্থিতি অনুকূলে নয়। আগুন এখনো ভয়াবহভাবে জ্বলছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৫০০ দমকলকর্মী কাজ করছেন। ছয়টি পানি ছোড়ার বিমানও কাজে নামানো হয়েছে। গ্রামের দিকে যাওয়ার সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

লুগলঁ জনপ্রিয় পর্যটন এলাকা আরকাশোঁ উপসাগর ও লেজ-ক্যাপ-ফেরের উপদ্বীপ থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। জুলাইয়ের শেষ দিকে ওই এলাকায় দুটি বড় দাবানলে ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পুড়ে যায়। তখন প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

তীব্র গরমের মধ্যেই দাবানলের এই বিস্তার ঘটছে। শুক্রবার ইউরোপের পাঁচজনের মধ্যে তিনজনের বেশি মানুষকে অন্তত ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রায় ১৫ কোটি মানুষকে সহ্য করতে হয়েছে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি তাপমাত্রা।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ও তীব্র হচ্ছে। মাটি ও জলাধারের পানি দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। ফ্রান্সে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে হাজারো মানুষের মৃত্যুও হচ্ছে। ইউরোপের তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপার্নিকাস জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক পরিষেবা তাদের সাপ্তাহিক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের বিস্তীর্ণ এলাকায় দাবানলের পরিস্থিতি ‘অত্যন্ত চরম’। দক্ষিণ ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, উত্তর ফ্রান্স ও দক্ষিণ সুইডেনের কিছু এলাকাতেও একই ধরনের ঝুঁকি রয়েছে।

রয়টার্স ক্লাইমেট মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার পশ্চিম ইউরোপে দিনের গড় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ার পূর্বাভাস ছিল। ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের গড়ের তুলনায় এটি ৮ ডিগ্রি বেশি। পুরো ইউরোপে তাপমাত্রা ওই সময়ের গড়ের চেয়ে ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি বেশি ছিল।

জার্মানিতে আগুনের কাছে গ্রাম

জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলে হুর্টগেন বনে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার ভোরে ২ হাজারের বেশি মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে পাশের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয় নেন। আগুন গেই গ্রামের কয়েক শ মিটারের মধ্যে চলে এসেছিল।

নর্থ রাইন-ভেস্টফালিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী মোনা নয়বাউয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, এই দাবানল স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে বাধা দিচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ। জার্মান সংবাদ সংস্থা ডিপিএ জানিয়েছে, আগুনের মধ্যে গোলাবারুদ বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। নিরাপত্তার কারণে দমকলকর্মীদের ওই এলাকায় ঢুকতে হচ্ছে না। বেলজিয়াম সীমান্তের কাছের ওই এলাকায় জার্মান সেনাবাহিনীর ট্যাংক ও হেলিকপ্টারও উদ্ধারকাজে সহায়তা করছে।

ক্রোয়েশিয়ায় পর্যটন শহরে আগুন

ক্রোয়েশিয়ার ডালমাটিয়ান উপকূলে প্রবল বাতাসের কারণে দাবানল রাতারাতি পর্যটন শহর লোকভা রোগোজনিতসার দিকে ছড়িয়ে পড়ে। শুক্রবার বিকেলে আগুনে পুড়ে যাওয়া এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে একজনের লাশ পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।

আগুনের কারণে আশপাশের কয়েকটি শহরে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়। কাছের শহর স্প্লিটে অ্যাম্বুলেন্সে করে ৩৬ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সাতজনের অবস্থা ছিল জীবনসংকটাপন্ন।

আঞ্চলিক প্রধান অগ্নিনির্বাপণ কর্মকর্তা স্লাভকো তুকাকোভিচ বলেন, আগুন ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। পথে যা পেয়েছে, সবকিছু পুড়িয়ে দিয়েছে। এতে ব্যাপক সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। শুক্রবার সকালে আগুনের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে।

তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচ কাছের ওমিশ শহরে গিয়ে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানলগুলোর একটি। তিনি তখন বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত হয়নি। এর আগে পুলিশ একজনের লাশ পাওয়ার কথা জানিয়েছিল।

স্পেনে রাজাদের দেহাবশেষ সরানো হলো

উত্তর-পূর্ব স্পেনেও দাবানল ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আগুনের হুমকিতে সান হুয়ান দে লা পেনিয়া মঠ থেকে ১১ শতকের আরাগনের তিন রাজার দেহাবশেষ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট এগুলো কাছের হুয়েস্কা শহরের একটি জাদুঘরে নিয়ে যায়।

সোমবার শুরু হওয়া আগুন বৃহস্পতিবার আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তীব্র গরম ও শক্তিশালী বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত ৯ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। ১৬টি শহর ও গ্রাম থেকে মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ স্পেনের আরো বড় একটি দাবানলও বৃহস্পতিবার তীব্র হয়েছে। হুয়েলভা প্রদেশে ওই আগুনে এখন পর্যন্ত ৩১ হাজার হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। প্রায় ৭০০ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গ্রিসে সমুদ্রসৈকত থেকে ৫০০ পর্যটক সরানো

উত্তর গ্রিসের হালকিডিকি উপদ্বীপে বনভূমির আগুনের কারণে বৃহস্পতিবার প্রায় ৫০০ পর্যটককে সমুদ্রসৈকত থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। সিভিরি ও ফোরকা—দুটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র আগুনের হুমকিতে পড়ে। ছোট নৌকার বহর ব্যবহার করে পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়া হয়।

প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আগুনের রেখা তৈরি হয়েছিল। আগুনের শিখা ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়েছিল। পরে দিনের শেষ দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় দমকলকর্মীদের সতর্ক রাখা হয়েছে।

দুই দমকলকর্মী আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। গ্রিসের মূল ভূখণ্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় দাবানলের সর্বোচ্চ পাঁচ মাত্রার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

হালকিডিকির ঘন পাইনবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। শুক্রবার সেখানে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬২ মাইল বেগে বাতাস বয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস ছিল।

যুক্তরাজ্যেও বাড়িঘর পুড়েছে

যুক্তরাজ্যের ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে দাবানল। এতে কয়েকটি বাড়ি পুরোপুরি পুড়ে গেছে।

আঞ্চলিক ফায়ার সার্ভিসের প্রধান সাইমন টুহিল ঘটনাটিকে তাদের মোকাবিলা করা ‘সবচেয়ে বড় ধরনের’ অগ্নিকাণ্ডগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছেন।

ইউরোপজুড়ে চলমান এই দাবানলের মধ্যে তীব্র তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে। উচ্চ তাপমাত্রা, শুষ্ক মাটি ও প্রবল বাতাস একসঙ্গে কাজ করায় আগুন নিয়ন্ত্রণে রাখতে দমকলকর্মীদের কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন