ইউরোপের দ্বিতীয় দীর্ঘতম নদী ড্যানিউবে রেকর্ড পরিমাণ পানি কমে যাওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ডুবে যাওয়া জার্মান যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ ভেসে উঠেছে। একই সঙ্গে নদীর বিভিন্ন অংশে পাওয়া গেছে অবিস্ফোরিত বোমা, সামরিক মোটরসাইকেলসহ যুদ্ধের নানা স্মৃতিচিহ্ন।
সার্বিয়া ও রোমানিয়ার সীমান্তবর্তী ড্যানিউবের মাঝামাঝি অংশে একটি বালুচরে দেখা গেছে ভেঙে যাওয়া একটি যুদ্ধজাহাজের কাঠামো। সাধারণ সময়ে ওই অংশটি পানির নিচে থাকে। নদীর অন্য কয়েকটি জায়গাতেও আংশিক ডুবে থাকা জাহাজের ধ্বংসাবশেষ দেখা গেছে। এসব জাহাজের কিছুতে এখনো অস্ত্র ও বিস্ফোরক থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ইতিহাসবিদদের মতে, এসব জাহাজ ছিল অ্যাডলফ হিটলারের ব্ল্যাক সি ফ্লিটের অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে সোভিয়েত বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে জার্মান সামরিক বাহিনী পরিকল্পিতভাবে জাহাজগুলো ড্যানিউবে ডুবিয়ে দেয়। ১৯৪৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এভাবে প্রায় ২০০টি জার্মান যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে নাৎসি জার্মানি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে পরের বছর, ১৯৪৫ সালের মে মাসে।
এর আগেও ড্যানিউবের পানি কমে গেলে এসব যুদ্ধজাহাজের ধ্বংসাবশেষ ভেসে উঠেছিল। পরে নদীর পানি বাড়লে সেগুলো আবার পানির নিচে হারিয়ে যায়। ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ফেলতে সার্বিয়া সরকার অতীতে উদ্যোগ নিলেও জাহাজগুলোর ভেতরে বিস্ফোরক থাকার আশঙ্কায় অধিকাংশই এখনো সরানো সম্ভব হয়নি।
শুধু যুদ্ধজাহাজ নয়, নদীর পানি কমে যাওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরো কিছু নিদর্শনও সামনে এসেছে। হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের কাছে ড্যানিউব থেকে উদ্ধার করা হয়েছে জার্মান সামরিক বাহিনীর একটি মোটরসাইকেল।

এদিকে, স্লোভাকিয়ায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় উদ্ধার করা হয়েছে ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর ফেলা একটি ৭০০ কেজি ওজনের অবিস্ফোরিত বোমা। দেশটির পুলিশ জানিয়েছে, বিশেষভাবে পরিবর্তিত একটি অগ্নিনির্বাপক গাড়িতে বালুর স্তর তৈরি করে বোমাটি নিরাপদে পরিবহন করা হয়। পরে পাঁচ মিটার গভীর একটি গর্তে সেটি নিয়ে গিয়ে নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়।
১৯৪৪ সালে জার্মান বাহিনীর চলাচল ব্যাহত করতে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স ড্যানিউব নদীতে মাইন পুঁতে রেখেছিল। ফলে দীর্ঘদিন পর নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় এখনো এসব যুদ্ধকালীন বিস্ফোরক ও সামরিক সরঞ্জাম শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ড্যানিউব নদীটি ১০টি দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত। দীর্ঘস্থায়ী খরা ও তীব্র গরমে নদীটির পানি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে নৌযান চলাচলও কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ইউরোপের অন্যান্য প্রধান নদীর মতো ড্যানিউবের পানিও কমে যাওয়ায় জ্বালানি খাতেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের শীতলীকরণ ব্যবস্থার জন্য নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল।
এদিকে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ পরিস্থিতিকে আরো সংকটময় করে তুলেছে। স্লোভাকিয়া, অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিতে সম্প্রতি রেকর্ড তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে। স্লোভাকিয়ার আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার দেশটির দোলনে প্লাখতিনৎসে তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে নতুন জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তীব্র গরম ও দীর্ঘস্থায়ী খরার প্রবণতা আরো বাড়ছে। এর প্রভাবেই ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানল, পানিসংকট ও নদীর পানি কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আর সেই পরিবেশগত সংকটের মধ্যেই ড্যানিউবের তলদেশ থেকে উঠে আসছে ইউরোপের ভয়াবহ যুদ্ধ-ইতিহাসের বহু পুরোনো স্মৃতিচিহ্ন।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এআরবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


