প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরে নিতে তৎপর দিল্লি। চলতি মাসেই যেন প্রধানমন্ত্রী সপরিবারে ভারত সফরে যান, সেজন্য নানামুখী প্রচেষ্টা চালাচ্ছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। সম্পর্ক এগিয়ে নিতে কিংবা শীর্ষ পর্যায়ের সফরের জন্য দৃশ্যত একটি অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বহুল আলোচিত শহীদ ওসমান হাদির সন্দেহভাজন খুনিকে হস্তান্তরেও রাজি আছে দিল্লিÑএমন বার্তাও দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিল্লি গেলে তিনি অখুশি হয়ে দেশে ফিরবেন না বলেও ঢাকাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে দিল্লির এ তৎপরতায় সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত তড়িঘড়ি করে দিল্লি সফরে যাবেন কি না, তা চূড়ান্ত নয়। ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো আমার দেশকে এসব তথ্য জানিয়েছে।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রীকে সফরে নিতে দিল্লি অতি আগ্রহ দেখাচ্ছে। ভারত তার বাংলাদেশ পলিসি বদলে ফেলেছে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। ঢাকার সঙ্গে দিল্লি আসলে ‘ডুয়েল গেম’ খেলছে। একদিকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে, অন্যদিকে চাপে রাখতে নানামুখী তৎপরতা চালাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ভূরাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে ভারতকে। ভূরাজনৈতিক স্বার্থেই মোদি সরকার তারেক রহমানকে দিল্লি সফরে নিতে চাইছে। এটা তাদের স্বার্থ। বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই। প্রধানমন্ত্রীর সফরে যদি পানিবণ্টন ও সীমান্ত ইস্যুর সমাধান না হয়, তাহলে এ সফর রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হবে।
জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতিতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যায়। বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পরিবর্তে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে নানামুখী তৎপরতা ছিল ভারতের। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকারে আসার পর ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন যাত্রা শুরুর ঘোষণা দেয় মোদি সরকার। কিন্তু বিএনপি সরকারের ছয় মাস পার হলেও দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা চলছেই। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে উল্টো চাপ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে দিল্লি। পুশইন, সীমান্ত হত্যা, সর্বোপরি দণ্ডিত হাসিনাকে মাঠে নামিয়ে তারেক রহমানের সরকারকে চাপে রাখতে চেয়েছে মোদি সরকার। কখনো কখনো সম্পর্ক উন্নয়নে ইতিবাচক বার্তা দিয়ে রীতিমতো বিভ্রান্ত করা হয়েছে বাংলাদেশকে।
জাতীয় স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কৌশলগত ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে সামনে রেখে প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া হয়ে চীন যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর ওই সফরকেও স্বাভাবিকভাবে নেয়নি ভারত। সবশেষ গত ৫ আগস্ট জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে বাংলাদেশের আগাম সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে দিল্লিতে হাসিনাকে প্রথমবারের মতো প্রেস ব্রিফিংয়ে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়া দেখায় বাংলাদেশ। গত ৫৫ বছরের ইতিহাসে এমন কড়া ভাষায় ভারতের ব্যাপারে বিবৃতি দিতে দেখা যায়নি। বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতিতে দিল্লির পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়, জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকীতে হাসিনাকে দিয়ে জুলাই শহীদদেরে বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অপমান করা হয়েছে। দিল্লির এ পদক্ষেপ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ আর কখনো কারো করদ রাষ্ট্রে পরিণত হবে না। বাংলাদেশের এই কঠোর প্রতিক্রিয়ার পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, হাসিনার অনুষ্ঠান আয়োজনের পেছনে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা নেই। ভারত সরকার হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যও সমর্থন করে না।
দিল্লির একাধিক কূটনৈতিক সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে, দিল্লিতে হাসিনাকে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হিতে বিপরীত হয়েছে বলে মনে করছেন ভারতের নীতিনির্ধারকরা। বিশেষ করে সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্য রীতিমতো ভারতকে বিপাকে ফেলেছে। ওই সংবাদ সম্মেলনে জয় অভিযোগ করে বলেন, বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় পাকিস্তান। দেশটিতে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে, যা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশে সরাসরি ভারতের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানান জয়। জয়ের ওই বক্তব্যের কারণে মূলত সুর নরম করতে বাধ্য হয়েছে মোদি সরকার।
দিল্লির ওই কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরো জানায়, বাংলাদেশ ইস্যুতে দিল্লির নীতিনির্ধারকরা রীতিমতো দ্বিধাবিভক্ত। কেউ মনে করছেন, বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা মেনে নিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া দরকার। আবার কেউ মনে করছেন, বাংলাদেশকে বিভিন্ন ইস্যুতে সবসময় চাপের মধ্যে রাখতে হবে। ভারতীয় মিডিয়া ও থিংকট্যাংকগুলোও বাংলাদেশ ইস্যুতে দ্বিধাবিভক্ত।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেনÑএমন একজন সিনিয়র কূটনীতিক ভারতের বাংলাদেশ নীতি সম্পর্কে আমার দেশকে বলেন, ভারতের স্টাবলিশমেন্ট অত্যন্ত জটিল। পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি পক্ষ রয়েছে। প্রথমত দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর, যা সাউথ ব্লক হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয়ত সে দেশের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তিনি বলেন, ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের অধীনে। গত ৫ আগস্টের হাসিনাকাণ্ডে দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের কোনো সমর্থন ছিল না। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর একটি অংশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন বিজেপির একটি অংশ হাসিনাকে মিডিয়ার সামনে আনে। তারা দেখতে চেয়েছে, হাসিনাকে কিছু বাড়তি সুবিধা দিলে বাংলাদেশ কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়। এদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছেন বীণা সিক্রি ও রীভা গাঙ্গুলি দাসের মতো সাবেক কূটনীতিকরা।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি শেখ হাসিনার অবস্থানকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছেন। ভারতীয় গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, হাসিনা দেশে ফিরতে চান। তিনি তার কথাগুলো সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বলতেই পারেন। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটা ইস্যু হতে পারে না। বীণা সিক্রি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বলেন, গত ছয় মাসে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি। অথচ নির্বাচনের আগে তিনি ভারতের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেনÑপ্রথম বিদেশ সফরে দিল্লি আসবেন তিনি। কিন্তু তিনি গেলেন চীনে। তারেক রহমান জানিয়েছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আছে, তা প্রত্যাহার করবেন। কিন্তু তিনি কিছুই করেননি। তারেক রহমানের থেকে তার মা খালেদা জিয়া অনেক বেশি সহনশীল ছিলেন বলে মন্তব্য করেন বীণা সিক্রি।
এদিকে, আরেক সাবেক হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলী দাস শেখ হাসিনার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে ডয়চে ভেলেকে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, হাসিনা আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। তিনি এখানে রাজনীতি করছেন না। বরং তারেক রহমান লন্ডনে বসে রাজনীতি করতেন। তিনি পুরো দল চালিয়েছেন লন্ডনে বসে। রীভা গাঙ্গুলী দাবি করেন, হাসিনাকে ভারত প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই বিবেচনা করে। তিনি এখানে পালিয়ে আসেননি। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী তার নিরাপত্তার জন্য দিল্লিতে রেখে গেছেন।
তবে দিল্লির অনেক নীতিনির্ধারক মনে করছেন, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে হাসিনা এখন একটি বাধা। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট হাসিনাকাণ্ডের পর বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে। তারা মনে করছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না হলে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে ভারতের জন্য বিপর্যয় ঘটতে পারে।
ভারতের মূলধারার অনেক গণমাধ্যম হাসিনার চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করছে। দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার এক নিবন্ধে বলেছেন, বাংলাদেশে ২০২৪ পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়াদিল্লির জন্য একটি বড় কৌশলগত ধাক্কা। তবে ভারতকে অবশ্যই বর্তমান কূটনৈতিক উত্তেজনা কাটিয়ে ঢাকার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ভবিষ্যৎ অবস্থান বা সিদ্ধান্ত তার নিজস্ব ব্যাপার। কিন্তু তাকে ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক বিবৃতির সুযোগ দেওয়া হলে তা ঢাকার সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগকে জটিল করে তুলবে। তিনি আরো বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশলীতার জন্য ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, তাকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কাছে জিম্মি হতে দেওয়া যায় না।
এদিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। কিন্তু সেই আশ্রয়স্থলকে রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করাটা বড় ধরনের সমস্যা। ব্যক্তি হাসিনা একজন সম্মানিত অতিথি হিসেবে স্বাগত হলেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কটা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, একজন ব্যক্তির স্বার্থের কাছে একে জিম্মি করা যায় না।
দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গত ৫ আগস্টের পর রীতিমতো নড়েচড়ে বসেছেন ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা। বাংলাদেশের সঙ্গে উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। গত ৯ আগস্ট ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দীর্ঘ আলোচনা করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে। পরদিন ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় দূত। এই সাক্ষাতে দ্বিপক্ষীয় সফরে প্রধানমন্ত্রীকে সপরিবারে দিল্লি নিতে ভারত সরকারের গভীর আগ্রহের কথা জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে লেখা নরেন্দ্র মোদির চিঠিতে তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। পরবর্তীতে ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের চেয়ার হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানান নরেন্দ্র মোদি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা আমার দেশকে জানিয়েছেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ত্রিবেদীর বৈঠক এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে ঢাকার পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সহায়ক পরিবেশ দিল্লিকেই সৃষ্টি করতে হবে। এর পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা ও হাদির খুনিদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে হবে ভারত সরকারকে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক শেষে ঢাকার বার্তা নিয়ে ১০ আগস্ট সন্ধ্যায় দিল্লি ফিরে যান দীনেশ ত্রিবেদী। দিল্লিতে গিয়ে তিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশের সবশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে দীনেশ ত্রিবেদী দিকনির্দেশনা চেয়েছেন বলে ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে। শুধুমাত্র কূটনীতিক এবং ‘ডিপস্টেট’-এর তৎপরতা দিয়ে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হবে না বলে নরেন্দ্র মোদিকে জানিয়েছেন দীনেশ ত্রিবেদী। সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে রাজনৈতিক উদ্যোগের বিকল্প নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে দীনেশ ত্রিবেদী দিল্লিতে অবস্থানকালেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের বিষয়টি হঠাৎ করেই আলোচনায় এসেছে। ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন না— ঢাকার এই সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে দিল্লিকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সঙ্গত কারণেই এখন দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এ ব্যাপারে গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ভারত সফর নিয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের সুবিধাজনক সময়ে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হবে।
ভারত সরকার চলতি মাসেই প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি সফরে নিয়ে যেতে চাইছে। প্রধানমন্ত্রীকে দিল্লি নিতে মোদি সরকারের হঠাৎ করে অতি আগ্রহ জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। এছাড়া এই স্বল্প সময়ের মধ্যে দিল্লির মতো গুরুত্বপূর্ণ সফরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক এম শহীদুজ্জামান মনে করছেন, তড়িঘড়ি করে এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নেওয়া দিল্লির ভূরাজনৈতিক স্বার্থে। এখানে আমাদের স্বার্থের বিষয়টি একেবারেই অস্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী গেলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবেÑ এই কথা বলে ঢাকাকে প্রলুব্ধ করছে দিল্লি।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে আমাদের অংশীদারত্বকে এগিয়ে নেওয়ার সময় এখন। এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফর এটাকে বাধাগ্রস্ত করবে। ভারত যদি এখন তারেক রহমানকে দিল্লি নিতে পারে তাহলে নিশ্চিতভাবেই তিস্তা প্রকল্প বা চীনের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে তাদের আপত্তির কথা জানাবে। আর তাদের আপত্তি না শুনলে পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল করাসহ নানামুখী চাপ বাড়াবে।
তিনি আরো বলেন, আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের এটা সঠিক সময় নয়। প্রধানমন্ত্রীর আরো সময় নেওয়া উচিত। ভারতকে আগে তার অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। আমরা আমাদের নিরাপত্তার স্বার্থে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান বা টার্কি যার সঙ্গেই অংশীদারত্ব গড়ে তুলি না কেন, তাতে দিল্লির কোনো আপত্তি থাকবে নাÑএই ঘোষণা প্রকাশ্যে দিতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশের মূল ইস্যু পানি বণ্টন, পুশইন ও সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে সুস্পষ্ট পদক্ষেপ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি যাওয়া ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন এই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে সফরে নেওয়ার দিল্লির তৎপরতা বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী পরিস্থিতিকে মেনে নেয়নি ভারত। তারা এখন পর্যন্ত এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি যাতে ভারতকে আস্থায় নেওয়া যায়। তাদের দূত অনেক মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছেন। কিন্তু বাস্তবে কোনো পদক্ষেপ নেই।
তিনি বলেন, দীনেশ ত্রিবেদী যেদিন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করলেন তার আগের দিন সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা করেছে বিএসএফ। তারা সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হাত বাড়ানোর কথা বলছে, আবার অন্য হাতে হাসিনা কার্ড খেলছে। এভাবে সম্পর্ক হয় না।
ড. দিলারা চৌধুরী মনে করেন, শুধু হাদির হত্যাকারীকে ফেরত বা হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ করা নয়, বরং পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে ভারতকে। এছাড়া বাংলাদেশি জেনারেলসহ অন্য যারা ভারতে পালিয়ে আছেন, তাদের ফেরত পাঠাতে হবে। তিনি বলেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমস্যা সমাধানের এটাই উপযুক্ত সময়।
শুধুমাত্র ভারতের আশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে প্রধানমন্ত্রী যদি ভারত সফরে যান তা রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হবে বলে মন্তব্য করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। তিনি বলেন, আমরা একটি অস্থির সময় পার করছি। এটা প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের উপযুক্ত সময় নয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


