গ্যাসের জন্য হাহাকার, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং

গ্যাসের জন্য হাহাকার, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং
আমার দেশ গ্রাফিক্স

গ্যাসের জন্য সারা দেশে নজিরবিহীন হাহাকার চলছে। গ্যাস সংকটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লোডশেডিং। তীব্র বিদ্যুৎ সংকটে জনজীবনে নাভিশ্বাস অবস্থা। শিল্পকারখানা ও সার কারখানায়ও চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে কমে গেছে উৎপাদন।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয় গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হলেও তা চাহিদার তুলনায় ৬০ শতাংশ কম। ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে গ্যাসের অভাবে এ খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর অর্ধেকের বেশি এখন উৎপাদনে নেই। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সার কারখানাগুলোয় দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্যাস। রান্নাবান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসেরও তেমন চাপ নেই। চুলা না জ্বলায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা।

বিজ্ঞাপন

দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের জন্য পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাট ও ব্যাটারিচালিত অবৈধ রিকশার দৌরাত্ম্যকে দায়ী করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত অবৈধ অটোরিকশার কারণে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। মধ্যরাতে ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার সময় বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়।

চলমান সমস্যা সমাধানে সরকার চেষ্টা করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ঠিক না হওয়া পর্যন্ত আপাতত লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। কারণ, এখন আমরা দেশে গ্যাসও উত্তোলন করতে পারব না আবার আমদানি করা এলএনজি জাতীয় গ্রিডে দিতে পারছি না। এটিকে আমরা ম্যানেজ করার চেষ্টা করছি। সে পর্যন্ত সবাইকে একটু ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান তিনি।

দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। গতকাল বৃহস্পতিবার অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ করেও এ খাত থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয়। এর আগে তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হতো এ খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোয়।

জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং দূর করতে সরকার শিল্পকারখানায় গ্যাস কম দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রেগুলোয় সরবরাহ করছে। এরপরও লোডশেডিং দূর করা সম্ভব হচ্ছে না। বৃহস্পতিবারও চাহিদার তুলনায় ৩,৫০০ মেগাওয়াট কম বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়। তীব্র গরম ও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন নাগরিকরা।

শিল্পোৎপাদনে ধস

শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্প ও কলকারখানাগুলোয় উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও কারখানা বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটি

দেওয়া হয়েছে।

তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, নিটিং, ডাইং ও ওয়াশিং খাতের কারখানা কর্তৃপক্ষের অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা ১৫ দিন ধরে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। গাজীপুরের একটি নিট কারখানায় আগে এক দিনে ২৬ টন কাপড় উৎপাদন হলেও গ্যাস সংকটে তা কমে সাড়ে ১১ থেকে ১২ টনে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে জানান, তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ৭০ ভাগ কারখানা থেকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, আগে শুধু গ্যাসস্বল্পতার বিষয়টি নিয়ে মালিকরা ফোন করতেন। গত কয়েক দিন ধরে বিদ্যুতের প্রকট সমস্যার কথা জানাচ্ছে বিভিন্ন কারখানা কর্তৃপক্ষ।

সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ কমেছে

শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল)। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ব্যাংকঋণের সুদ, যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণসহ বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটিকে। এতে প্রতি মাসে ১০০ কোটি টাকার বেশি লোকসান দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

এছাড়াও অন্যান্য সার কারখানায় গ্যাস দেওয়া হচ্ছে সীমিত পর্যায়ে, যা চাহিদার তুলনায় মাত্র ৩৮ শতাংশ।

গ্যাস সংকটে দেশব্যাপী হাহাকার

গ্যাস উত্তোলনে শীর্ষে থাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়ই রান্নার চুলা জ্বলছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। জেলা শহরে গ্যাস না পেয়ে বাসাবাড়িতে চলছে মাটির চুলায় রান্না। আবার কোথাও নির্ভর করতে হচ্ছে সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর। গত দুদিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগের চিত্র এমনই।

বৃহস্পতিবার জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকার কারণে মাটির চুলায় রান্না করছেন গৃহিণীরা। এতে তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে কয়েকগুণ। তিন বেলার রান্না করতে হচ্ছে এক বেলায়।

শহরের টেংকের পাড় এলাকার বাসিন্দা রুনা দাস বলেন, বেলা ১১টার পর থেকেই গ্যাসের চুলা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে আর গ্যাস আসছে না। মাটির চুলায় রান্না করতে হয়েছে।

একই বাড়ির বাসিন্দা রানী দাস বলেন, গ্যাস না থাকায় লাকড়ি সংগ্রহ করে মাটির চুলায় রান্নার কাজ করতে হচ্ছে। সারা দিন সংসারের অন্য কাজের ফাঁকে মাটির চুলায় রান্না কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গ্যাস দিয়ে দেশের চাহিদা মেটানো হলেও এখানেই গ্যাস মিলছে না।

শহরের কাজীপাড়ার বাসিন্দা ইয়াদে রিবা পাপিয়া বলেন, এমনিতে চুলায় গ্যাস কম চাপ থাকে। এছাড়া গত দুদিন ধরে গ্যাস নেই। তাই বাজার থেকে সিলিন্ডার গ্যাস কিনে এনেছি রান্না করার জন্য। আমাদের দাবি, সরকার যেন দ্রুত গ্যাসের সমস্যা সমাধান করে।

বেশ কয়েকজন যানবাহনচালক বলেন, গত এক মাস ধরে ফিলিং স্টেশনগুলোয় গ্যাসের চাপ কম। ঠিকমতো গ্যাসের চাপ পাচ্ছি না। ফলে আমরা অনেক দুর্ভোগে আছি।

টানা দুদিন ধরে গ্যাস সংকটে বিপর্যস্ত কুমিল্লা নগরীর অধিকাংশ এলাকার জনজীবন। কোথাও একেবারেই গ্যাস নেই আবার কোথাও মিলছে অতি স্বল্পচাপে। এতে রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে বাড়ছে খরচ ও ভোগান্তি। একই সঙ্গে নগরীর খাবার হোটেলগুলোয় বেড়েছে ক্রেতার চাপ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারছে না বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল)।

নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকার বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ৩১ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে তাদের বাসায় গ্যাস নেই। বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে অনেক হোটেলেও পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যাচ্ছে না।

কুমিল্লা রেসকোর্স এলাকার গৃহবধূ খালেদা আক্তার বলেন, গ্যাস না থাকায় গতকাল (বুধবার) ইলেকট্রিক চুলায় কোনোরকম রান্না করে খেয়েছেন। কিন্তু আজ (বৃহস্পতিবার) বিদ্যুৎও না থাকায় বাড়ির পাশে অস্থায়ী চুলা বানিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। তার প্রশ্ন, ‘এভাবে কি চলা যায়?’

গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ নিয়েও চলছে তেলেসমাতি কারবার। প্রচণ্ড গরম আর ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সুনামগঞ্জের জনজীবন। শহরে মাঝে মাঝে বিদ্যুতের দেখা মিললেও গ্রামে দিন-রাত মিলিয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৭ ঘণ্টাই থাকছে না বিদ্যুৎ। এতে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিÑসব খাতেই নেমে এসেছে স্থবিরতা।

বিদ্যুতের ভোগান্তিতে ক্ষুব্ধ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা করছেন ভুক্তভোগীরা। ছাতকের জাউয়াবাজার এলাকায় বিদ্যুতের দাবিতে মিছিলও করেছেন এলাকাবাসী।

ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করে বলেন, বিদ্যুৎ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৭ ঘণ্টাই থাকে না। বিদ্যুৎ না থাকার পরও মাস শেষে পুরো বিল ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তাহিরপুরের মশিউর রহমান জানান, গ্রামে রাত ১২টার পর বিদ্যুৎ আসে আবার ৩টায় চলে যায়। সকালে থাকে না, দুপুরে আধা ঘণ্টা পরপর যায়-আসে। সন্ধ্যার পর তো দেখাই মেলে না। রাতে গরমে ছেলেমেয়েরা ঘুমাতে পারে না।

একই অভিযোগ সারা দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার অধিবাসীদের। কোথাও কোথাও বিক্ষোভের ঘটনাও ঘটে।

ধৈর্য ধরার আহ্বান মন্ত্রীর

বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দেশবাসীকে বিদ্যমান সমস্যায় ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বিপুলসংখ্যক অবৈধ অটোরিকশার ব্যাটারি রাতে চার্জ দেওয়া হয়। আর অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে অভিযান চালাতে গেলে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা হামলার শিকার হন।

মন্ত্রী বলেন, দেশে এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে আরো তিনটি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১০-১২ দিন আগে একটি টার্মিনালের জন্য অর্ডার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মোংলা-হিরণ পয়েন্ট এলাকায় আরো একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত টার্মিনালগুলো মেরামতের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এগুলো ঠিক হলে সমস্যার সমাধান হবে। সে পর্যন্ত দেশবাসীকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ জানান তিনি।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় প্রতিনিধিরা]

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন