ষড়ঋতুর দেশে দ্বিতীয় ঋতু বর্ষা তথা আষাঢ়ের শুরুতে অঝোরে বৃষ্টি হবে; সেই বৃষ্টি আর দক্ষিণা হিমেল হাওয়া একাকার হয়ে দিনরাতের আবহাওয়া কিছুটা আরামদায়ক হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এবার তা না হয়ে বরং আষাঢ়ের শুরু থেকে দেশজুড়ে ভ্যাপসা গরম ছড়াচ্ছে প্রকৃতি।
আষাঢ়ের শুরুতে দেশের বিভিন্ন স্থানে আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামছে, তবু স্বস্তি নেই। থেকে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে, কখনো কখনো রাস্তায় পানিও জমছে, কিন্তু বাতাসে লেগে আছে সেই চিরচেনা ভ্যাপসা গরম। খেটে খাওয়া লোকজন বলছেন, গায়ে ঘাম জমে থাকছে, ঘরে ফ্যান চললেও আরাম মিলছে না।
কেন এমনটি হচ্ছে - এর জবাবে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, জুনে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হওয়ার পর যে বৃষ্টি হয়, তাকে তারা ‘উষ্ণ বৃষ্টি’ বলেন। এই বৃষ্টি বায়ুমণ্ডলের নিচু স্তরে তৈরি হয়, বৃষ্টির পানির তাপমাত্রাও তুলনামূলক বেশি থাকে। ফলে বৃষ্টির পর বাতাস ঠান্ডা হয় না, উল্টো জলীয়বাষ্প বেড়ে ভ্যাপসা গরমও বেড়ে যায়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছিলেন, এখন জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বেশি এবং বাতাসের গতিবেগ কিছুটা কম, বর্তমানে রাজধানীর বাতাসের গতিবেগ প্রতি ঘণ্টায় ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার। এ কারণে বৃষ্টি হলেও ভ্যাপসা গরম লাগছে, তাপমাত্রা যা আছে তার চেয়েও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হকও একই কথা বলেন, এ সময়ে গরমের অনুভূতি বেশি হওয়ার কারণ বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি। এ সময়ের বৃষ্টির বৈশিষ্ট্যই হলো বৃষ্টির পর শীতলতার রেশ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না।
তবে আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা আমার দেশকে বলেন, আবহাওয়া বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বর্ষা শুরু আষাঢ়ের প্রথম দিন থেকে নয়, বরং জুনের প্রথম দিন থেকে। সেদিক থেকে জুনের প্রথম থেকে বেশ কয়েকদিন ভালোই বৃষ্টি হয়েছে। মঙ্গলবারও নোখাখালীতে সর্বোচ্চ ৫৪ মিলিমিটার এবং ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি বিভাগেই বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া রাজধানীতেও ১৬ মিলিমিটার, দুইদিন আগে গত শনিবার ৩৫ ও শুক্রবার ৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এখন নানা কারণে আবারো তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে; তা আরো দুই-তিনদিন থাকতে পারে।
বর্ষার শুরুতে আবহাওয়া আরামদায়ক না হয়ে ভ্যাপসা গরম কেন বাড়ছে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সময়ে বৃষ্টি হলেও তা অনেকটাই উষ্ণ বৃষ্টি হচ্ছে, মেঘামালা জমিনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় বৃষ্টি হলেও তা ঠাণ্ডা বয়ে আনছে না। তার মতে, মেঘামালা যত বেশি উপরের দিকে তৈরি হয়ে বৃষ্টি ঝরাবে তা ততবেশি ঠাণ্ডা হয়ে থাকে। এখনকার বৃষ্টি জমিনে খুব কাছাকাছি তৈরি হয়ে বৃষ্টি ঝরাচ্ছে; এছাড়া বেশি সময় ধরেও বৃষ্টি না হওয়ায় তাপমাত্রা সহজে কমে না; বরং তাতে তাপমাত্রার চেয়েও বেশি ভ্যাপসা গরম অনুভুত হয়।
তিনি আরো বলেন, লঘুচাপের বর্ধিতাংশ গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ থেকে উত্তরপশ্চিম বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে। মৌসুমী বায়ু দেশের উপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরের অন্যত্র দুর্বল থেকে মাঝারি অবস্থায় রয়েছে। এ কারণে এখনো সেভাবে বর্ষার বৃষ্টি শুরু হয়নি। মৌসুমি বায়ু পুরোপুরি সক্রিয় হলে বৃষ্টি বাড়বে।
বুধবারও সারা দেশে কম বেশি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। বর্ধিত পাঁচদিনে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরো বাড়তে পারে।
এদিকে আগের দিন ছয় জেলায় বয়ে গেলেও মঙ্গলবার ১৩ জেলার ওপর দিয়ে তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। খুলনা বিভাগের ১০ জেলা ছাড়াও রাজশাহী, নীলফামারী ও মানিকগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে এবং আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকতে পারে। আগের দিনের তুলনায় তাপমাত্রা কিছুটা কমে মঙ্গলবার সারাদেশের মধ্যে যশোরে সর্বোচ্চ ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। যা আগের দিন ছিল রাজশাহীতে ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস।
এ দিন রাজধানীর তাপমাত্রাও কিছুটা কম রেকর্ড করা হয় ৩১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা সোমবার ছিল ৩৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
মঙ্গলবার সন্ধ্যা ছয়টায় পূর্বাভাসে বলা হয়, পরবর্তী ২৪ ঘন্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি কিংবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে সারাদেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে। সারাদেশে দিনের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।
প্রসঙ্গত, এবার মৌসুমের সবচেয়ে উষ্ণতম এপ্রিল-মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হলেও জনু-জুলাই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এছাড়া জুন-জুলাই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকার কথা জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

