নয়াদিল্লিতে চার দিনের বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৭তম সীমান্ত সম্মেলন শেষ হতে চলেছে এমন এক সময়ে, যখন ঢাকা প্রত্যাশা করেছিল সীমান্তে চলমান একাধিক সংকটের অন্তত কিছু বাস্তবসম্মত সমাধানের ইঙ্গিত মিলবে। কিন্তু সম্মেলনের শেষ প্রান্তে এসে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী মহলে যে মূল্যায়ন সামনে আসছে, তার সারকথা হলো—সীমান্ত হত্যা, পুশইন, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান, ভারতীয় ভূখণ্ডে বাংলাদেশবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা কিংবা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার অন্যান্য স্পর্শকাতর ইস্যুতে কার্যকর ও দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যায়নি।
গত ৮ জুন শুরু হওয়া এ সম্মেলন আজ বৃহস্পতিবার শেষ হচ্ছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অধীন দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে এটিই প্রথম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক। ফলে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে এবারের সম্মেলনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকীর নেতৃত্বে ১৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল দিল্লিতে আটটি গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা উত্থাপন করে।
প্রতিনিধিদলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, ভূমি জরিপ অধিদপ্তর এবং যৌথ নদী কমিশনের কর্মকর্তারাও ছিলেন। অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক প্রবীণ কুমারের নেতৃত্বাধীন ভারতীয় প্রতিনিধিদলে দেশটির স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অংশ নেন।
তবে বৈঠকের আলোচনা যত এগিয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে—বাংলাদেশের উত্থাপিত মূল উদ্বেগগুলোয় ভারত সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরিবর্তে কূটনৈতিক ভাষা ও পারস্পরিক সহযোগিতার সাধারণ বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত জ্বলন্ত ‘সাত দফা সংকট’ সমাধানে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর বা সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি না মেলায় ঢাকার ঝুলিতে জমা হয়েছে হতাশা। কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে, সীমান্তে হত্যা ও পুশইনের মতো সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানা ইস্যুগুলোয় বিএসএফের এমন চাতুর্যপূর্ণ ও কূটনৈতিকভাবে এড়িয়ে যাওয়ার নীতি দুই প্রতিবেশীর সম্পর্কের গভীরতাকে কতটুকু প্রশ্নের মুখে ফেলবে?
সীমান্তে রক্তের দাগ মোছেনি, বিএসএফের চিরচেনা সাফাই
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের সবচেয়ে বড় ক্ষত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর বিএসএফের গুলিবর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ড। ‘নন-লেথাল উইপন’ বা অনিনাশী অস্ত্র ব্যবহারের বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সীমান্তে বাংলাদেশিদের লাশের মিছিল থামেনি। গত ৮ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার পাথারিয়াদ্বার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে মোরছালিন নামে এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং নবীর হোসেন নামে এক বৃদ্ধ নিহত হন। এবারের বৈঠকে ঢাকার পক্ষ থেকে এই নির্মমতার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামানোর জোরালো দাবি তোলা হয়। তবে বিএসএফ বরাবরের মতো তাদের পুরোনো রাউন্ড-অ্যাবাউট বা কূটনৈতিক বক্তব্যের আশ্রয় নিয়ে হত্যাকাণ্ডগুলোকে এক ধরনের ‘জায়েজ’ করার চেষ্টা করেছে। ভারতীয় পক্ষ দাবি করেছে, আত্মরক্ষার্থে এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমনেই কেবল বিএসএফ গুলি চালায়, যা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও সত্যের অপলাপ বলে মনে করছে ঢাকা।
৩১ মে থেকে প্রতিহত হচ্ছে পুশইন
এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে উত্তপ্ত ও জ্বলন্ত ইস্যু ছিল বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশে জোরপূর্বক পুশইন বা অবৈধ অনুপ্রবেশের অপচেষ্টা। নির্ভরযোগ্য তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার মানুষকে জোরপূর্বক ঠেলে পাঠানো হয়েছে। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে ভারত যে অপতৎপরতা শুরু করেছিল, গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পরও তা অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে গত ৩১ মে বেনাপোলের সাদিপুর সীমান্তে বিএসএফ কাঁটাতারের বেড়া খুলে নারী ও শিশুসহ ১৩ জনকে বাংলাদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে বিজিবি তা শক্ত হাতে প্রতিহত করে। এরপর থেকে দেশের সমগ্র সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয় এবং স্থানীয়দের সহায়তায় প্রতিদিন বিজিবি এই পুশইনের অপচেষ্টা রুখে দিচ্ছে। বৈঠকে বিজিবি এই পুশইনের তীব্র বিরোধিতা করলেও বিএসএফের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ সরাসরি খারিজ করে উল্টো দাবি করে, ‘যারা বাংলাদেশে ঢুকছে তারা আসলে সে দেশেরই নাগরিক এবং তাদের নিজের দেশে ফিরে যাওয়াই উচিত।’ কোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই এভাবে পুশইন করার ভারতীয় অনড় মনোভাব বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের জন্য বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
মাদকের কারখানা : ভারতের ‘অস্বীকারের নীতি’
বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে ধ্বংসের মূল হাতিয়ার ফেনসিডিল, হেরোইন ও সিনথেটিক মাদকের সিংহভাগই আসে ভারত থেকে। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরে বহু অবৈধ ফেনসিডিল কারখানা ও বড় বড় গুদাম সচল রাখা হয়েছে। বিজিবি সীমান্তে কঠোর নজরদারি বজায় রাখলেও ভারতের দিক থেকে সমন্বিত উদ্যোগের অভাব স্পষ্ট। এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে মাদকের এসব উৎসমুখ ও কারখানা বন্ধের সুনির্দিষ্ট দাবি জানানো হলেও ভারতের পক্ষ থেকে কিছুটা অস্বীকার এবং কিছুটা ডিপ্লোম্যাটিক ভাষা ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে হুন্ডির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ওপারে পাচার হওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত হওয়ার সংকটটি অমীমাংসিতই রয়ে গেল।
গত ডিসেম্বরে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তে বিজিবির ২৪টি বিস্ফোরকসহ একটি বড় চালান জব্দ করার ঘটনা প্রমাণ করে, ওপার থেকে কেবল মাদক নয়, মারাত্মক অস্ত্র ও গোলাবারুদও অপরাধীচক্রের হাতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ভারতের মাটিতে সক্রিয় এই চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে বিএসএফ কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেয়নি।
পার্বত্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভারতের আশ্রয় বিতর্ক
বাংলাদেশের অখণ্ডতার ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভারতীয় ভূখণ্ডে আশ্রয় পাওয়ার বিষয়টি। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পাহাড়ের সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ক্যাম্প ও কোয়ার্টার এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) ভারতের মাটিতে সক্রিয় থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) প্রধান নাথান বমের ভারতে অবস্থানের বিষয়টি নিয়ে কড়া আপত্তি জানায় ঢাকা। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে ‘সমন্বিতভাবে কাজ করার’ চেনা ফাঁকা বুলি ছাড়া কোনো শীর্ষ বিচ্ছিন্নতাবাদীকে হস্তান্তরের কংক্রিট প্রতিশ্রুতি মেলেনি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিধিমালা লঙ্ঘন করে নোম্যানস ল্যান্ড থেকে ১৫০ গজের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টার বিরুদ্ধে ঢাকা শক্ত অবস্থান নিলেও তা নিয়ে কোনো বরফ গলেনি।
ঢাকাকে চাপে ফেলার ভারতীয় ‘কাউন্টার কৌশল’
বাংলাদেশ যখন সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকদের জানমালের সুরক্ষায় সাত দফা এজেন্ডা নিয়ে অনড়, তখন ভারত মূল আলোচনা থেকে নজর ঘোরাতে বেশকিছু কাল্পনিক ও বায়বীয় পাল্টা অভিযোগ সামনে এনেছে। বিএসএফের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশি নাগরিকরা নাকি কাঁটাতারের বেড়া কাটছে এবং বিএসএফ জওয়ানদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। এমনকি ভারত থেকে বাংলাদেশে পরিচালিত তথাকথিত ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর (আইআইজি) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও তুলেছে তারা। ঢাকার প্রতিনিধিদল ভারতের এ কৌশলকে মূল সমস্যা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা এবং এক ধরনের ‘ব্লেম গেম’ হিসেবে দেখছে।
সীমান্ত সম্মেলন : তুলনামূলক চিত্র ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৭৫ সালের সীমান্ত নির্দেশিকার আলোকেই মূলত দুদেশের মহাপরিচালক পর্যায়ের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। প্রথম বৈঠক হয় কলকাতায় ১৯৭৫ সালের ২ ডিসেম্বর। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বছরে একবার করে হয়ে আসছিল এ বৈঠক। ১৯৯৩ সালের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের পর থেকে বছরে দুবার (পর্যায়ক্রমে ঢাকা ও দিল্লি) বৈঠক হয়ে আসছে। সবশেষ ৫৬তম সম্মেলন গত বছরের ২৫-২৮ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। চলতি ৫৭তম সম্মেলন ভারতের নয়াদিল্লিতে গত ৮ জুন শুরু হয়ে শেষ হচ্ছে আজ ১১ জুন। এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পুশইন বন্ধ, মাদক কারখানা ও চোরাচালান বন্ধ, ভারতে অবস্থানরত পার্বত্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তন ছিল অন্যতম। ভারতের প্রধান দাবি ছিল কাঁটাতারের বেড়া কাটা বন্ধ, বিএসএফের ওপর হামলার অভিযোগ, কথিত ভারতীয় বিদ্রোহীদের দমন।
জনমনে বাড়ছে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ
বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম এই চার হাজার ৯৬ কিলোমিটারের স্থলসীমান্ত কেবল দুটি মানচিত্রকে আলাদা করে না; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুই দেশের সীমান্ত অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা ও নিরাপত্তা। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল কূটনৈতিক ভাষায় এ আলোচনাকে ‘সমস্যা মেটানোর উপযুক্ত মঞ্চ’ বললেও মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নয়াদিল্লি সম্মেলন শেষ করে আজই ঢাকার প্রতিনিধিদল দেশে ফিরছে। তবে এবারের আলোচনার টেবিল থেকে দেশের জন্য দৃশ্যমান কোনো স্বস্তি বা অর্জন না আসায় বাংলাদেশের জনমনে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বৈঠক শেষ হলেও ভারতের পুশইনের অপচেষ্টা বন্ধ হবে না এবং সীমান্তে বাংলাদেশিদের লাশের মিছিল থামানোর সদিচ্ছা ভারতের নেই—এবারের ৫৭তম সম্মেলন তারই এক ধরনের আনুষ্ঠানিক সিলমোহর। সীমান্ত সুরক্ষায় এখন ঢাকাকে একতরফাভাবে বিজিবির কঠোর পাহারার ওপর নির্ভর করতে হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


সীমিত সম্পদের মধ্যে দেশের সবাইকে স্বস্তি দিতে এ বাজেট