দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের বিরোধ যখন সংঘাত ও উত্তেজনায় গড়াচ্ছে, তখন ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যাচ্ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি)। একই ক্যাম্পাসে দুই সংগঠনের সক্রিয় উপস্থিতি থাকলেও এখন পর্যন্ত তাদের বিরোধ সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়নি। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা থাকলেও প্রকাশ্য সংঘাত এড়িয়ে চলছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির।
সাম্প্রতিক সময়ে বেগম রোকেয়া, জগন্নাথ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, সরকারি আলিয়া মাদরাসাসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। ক্যাম্পাসে এসব সংঘাতের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এখন পর্যন্ত অনেকটাই ভিন্ন। ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও তা সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়নি। উভয় সংগঠনই নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ক্যাম্পাসে অবস্থান জানানোর দিকে বেশি মনোযোগী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যদিও এর আগে হল দখলের অভিযোগ এনে উভয় সংগঠন একে অপরকে দোষারোপ করে। এ নিয়ে মানববন্ধনও করেছে ছাত্রশিবির। তবে ছাত্রদলের সরাসরি অভিযোগ অস্বীকার এবং ছাত্রশিবির উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যাচার করছে বলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
এদিকে গত কয়েকদিন আগে প্রেমঘটিত একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রক্টর অফিসে রাকসু জিএস আম্মার এবং সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী ও বর্তমানে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আনাসের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার জেরে ছাত্রদল রাকসু ভবনে হামলা করে।
হামলার পর উভয় পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দিকে চলে যায়। সেখানে রাকসু নেতৃবৃন্দ এবং আনাসের নেতৃত্বাধীন দলের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়। একপর্যায়ে আনাস ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা গ্রন্থাগারের রিডিং রুমে আশ্রয় নিলে রাকসু ও শিবিরের নেতাকর্মীরা সেখানে প্রবেশ করে তাদের মারধর করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ছাত্রদল শিবিরকে দায়ী করে ক্যাম্পাসে বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করে।
রাবিতে ছাত্ররাজনীতির সাম্প্রতিক বাস্তবতায় আবাসিক হল, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাংগঠনিক যোগাযোগ, বিভিন্ন ইস্যুতে কর্মসূচি এবং কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদকে ঘিরে রাজনৈতিক কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই সংগঠনই নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে। তবে সরাসরি সংঘাতে গেলে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে—এমন হিসাব থেকেই উভয় পক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টরা।
ছাত্রদল-ছাত্রশিবির নেতাদের বক্তব্য
বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সংগঠনটি কী ভাবছেÑএমন প্রশ্নের জবাবে শাখা ছাত্রদল সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ছাত্রদল একটি ঐতিহ্যবাহী ছাত্রসংগঠন। এই সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী বিভিন্ন সময়ে গুম, খুন, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানেও ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মী শাহাদাতবরণ করেছেন। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও দেশবাসীর ছাত্রদলের প্রতি অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। সেই প্রত্যাশার জায়গা থেকেই ছাত্রদলকে অত্যন্ত দায়িত্বশীল আচরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।
কারও উসকানিতে ছাত্রদল সিদ্ধান্ত নেয় না, নেবেও না উল্লেখ করে রাহী বলেন, পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, সংগঠনের নীতি ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থ বিবেচনা করেই ছাত্রদল তার কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আমাদের লক্ষ্য কোনো সংঘাত সৃষ্টি করা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং ক্যাম্পাসে একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও সহাবস্থানমূলক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
একই বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মেহেদী হাসান বলেন, ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির সবসময় কাজ করে যাচ্ছে। সে জায়গা থেকে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি রাবি শান্ত ক্যাম্পাস এটা যেনো এভাবেই থাকে। আমরা কোনো সংঘাতে জড়াতে চাই না, সংঘাতের দিকে যেতেও চাই না। শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে যা যা করা দরকার তাই করছি এবং ভবিষ্যতেও তাই করব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের উপর আঘাত করা হচ্ছে। সে জায়গা থেকে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি, এখানে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। আমাদের শান্ত এই রাবি যেন কোনো প্রকার ক্ষতির সম্মুখীন না হয়। শিক্ষার্থীরা যেন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে তাদের পড়াশোনা করতে পারে, আমরা এর জন্য খুবই আন্তরিক।
যা ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
ক্যাম্পাসে সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে সর্বদা সচেতন রয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মাহবুবর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে বলে আমরা মনে করছি। যেহেতু রাজনৈতিকভাবে সংঘাত তৈরি হচ্ছে, তাই আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উভয়পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। এখন পর্যন্ত আমরা কোনো ধরনের আশঙ্কা দেখছি না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

