বোতলজাত ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি

বোতলজাত ভোজ্যতেলের কৃত্রিম
সংকট, বাড়তি দামে বিক্রি

সরবরাহ কমিয়ে বোতলজাত ভোজ্যতেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিক্রেতা ও ডিলারদের ভাষ্য, কোম্পানিগুলো তেলের দাম আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলেই সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। তবে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে এমন সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া না গেলেও তারা নতুন করে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাজারে ২০৪ টাকার বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকা পর্যন্ত। এছাড়া খোলা তেলের দামও বেড়েছে। রাজধানীর বাজারে সরবরাহ কমে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানান খুচরা বিক্রেতারা। চাহিদা অনুযায়ী এক, দুই ও পাঁচ লিটারের বোতল মিলছে না অনেক দোকানে। সরবরাহ কমার প্রভাব পড়েছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের বাজারেও। গত এক সপ্তাহে খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারে দুই থেকে চার টাকা বেড়েছে।

রাজধানীর নয়াবাজার, কারওয়ানবাজার, কেরানীগঞ্জের বউবাজার ও কালীগঞ্জ বাজার ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোজ্যতেল কোম্পানিগুলো আগের তুলনায় কম পরিমাণে বোতলজাত সয়াবিন তেল সরবরাহ করছে। ফলে ডিলারদের কাছ থেকেও প্রয়োজনের তুলনায় কম তেল পাচ্ছেন খুচরা বিক্রেতারা।

ডিলারদের বরাত দিয়ে নয়াবাজারের এক বিক্রেতা জানান, কোম্পানিগুলো তেলের দাম আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলেই সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।

কারওয়ানবাজারের বিক্রেতা ইমাম উদ্দিন বাবলু বলেন, কোথাও সরবরাহ আছে; আবার কোথাও কমেছে। যেসব এলাকায় বা দোকানে নিয়মিত মনিটরিং করা হয়, ওইসব দোকানে সরবরাহ ঠিক রেখে অন্যত্র সরবরাহ কমানো হয়েছে। এতে বাজারে কিছুটা বাড়তি দামে বোতলজাত তেল বিক্রি হচ্ছে।

চলতি বছরের শুরু থেকেই বাজারে ভোজ্যতেলের কয়েক দফা সরবরাহ সংকট দেখা দিয়েছে। এপ্রিলের শেষদিকে বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে চার টাকা বাড়িয়ে ১৯৯ টাকা করা হয়। পরে ৩ সেপ্টেম্বর আরো পাঁচ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় ২০৪ টাকা। এরপরও রাজধানীর অনেক বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।

নতুন করে দাম বাড়ানোর দাবিও এসেছে। বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন ২০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য সচিবের কাছে দাম সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয়। সংগঠনটির দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে এবং বর্তমান দামে আমদানি ও সরবরাহ অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তবে সরকার এখনো নতুন দাম অনুমোদন করেনি। ৩০ সেপ্টেম্বর সিলেটে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ব্যবসায়ীদের দাম বাড়ানোর দাবি থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ও উৎপাদন ব্যয় এবং দেশের বাজারে এর প্রভাব যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় যাচাই ছাড়া ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হবে না বলেও জানান তিনি।

শনিবার রাজধানীতে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল সরকার নির্ধারিত ২০৪ টাকার পরিবর্তে ২১০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। কিছু দোকানে আবার বোতলজাত তেল পাওয়াই যাচ্ছে না।

খোলা সয়াবিন তেলও গত সপ্তাহে বেড়ে লিটারপ্রতি ১৯০-১৯৫ টাকা এবং খোলা পাম তেল ১৭০-১৭৫ টাকায় উঠেছে। টিসিবির তথ্যেও এমন চিত্রে উঠে এসেছে। কেরানিগঞ্জ মডেল টাউনের বাসিন্দা গৃহবধূ আকলিমা বলেন, বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে সয়াবিন তেলের বোতল। দোকানি বলছেন, কোম্পানি থেকে বোতলজাত সয়াবিনের সরবরাহ কমেছে। একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন কালীগঞ্জ বাজারের মুদি ব্যবসায়ী ইয়ামিন মোল্লা। তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো থেকে সরবরাহ কমেছে বলে যথেচ্ছা দামে বোতলজাত তেল বিক্রি হচ্ছে।

ভোজ্যতেল ছাড়াও গত এক সপ্তাহে ডিমের দাম ডজনে ১০ টাকা বেড়ে ১৫৫-১৬০ টাকায় উঠেছে। ব্রয়লার মুরগি প্রায় দুই মাস ধরে কেজি ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে রুই ৩৮০-৪০০, পাবদা ৪০০-৪৫০, তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ এবং পাঙাশ ২৫০-২৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ানবাজারের সবজি বিক্রেতা শাহানাজ বেগম বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধির পর সবজির দাম কেজিপ্রতি ৫-১০ টাকা করে বেড়েছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর মাল্টার দাম কেজিতে ১০০ টাকা এবং ডালিমে কেজিতে ৭০-৮০ টাকা বেড়েছে। অন্যান্য ফলের দামও বাড়তি। ৩০০ টাকার মাল্টা এখন ৪০০ টাকা এবং ৪০০ টাকার ডালিম ৪৫০-৪৮০ টাকা দাম হাঁকাচ্ছেন বিক্রেতারা। দাম আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন ফল বিক্রেতা আল মামুন।

এদিকে পোলাও চালের দাম কেজিতে ১০ টাকা কমলেও মিনিকেট ও আটাশ জাতের চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা বাড়তি বলে জানিয়েছেন চাঁদপুর রাইস এজেন্সির মেহেদী হাসান। দাম আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন জনতা রাইস এজেন্সির রাসেল মিয়া।

রাষ্ট্রীয় বিপণন সংস্থা টিসিবির শুক্রবারের তথ্য অনুযায়ী, সরু চাল, পাম অয়েল (লুজ, সুপার), ব্রয়লার মুরগির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে মসুর ডাল (বড়), পেঁয়াজ (দেশি), রসুন, তেজপাতা, বেগুন, ডিমের মূল্য হ্রাস পেয়েছে। ফলে চাল তেল, ডিম, মুরগি ও মাছের বাড়তি দামে চাপের মুখে পড়েছেন সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ।

এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নির্বাহী কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, প্রতিবার দাম বাড়ানোর আগে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে বাজারে সংকট তৈরি করে থাকে; এবারও তাই হচ্ছে। বেশ কয়েকদিন ধরেই এ অবস্থা চললেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দেখেও না দেখার ভান করছে। চাপের মুখে পড়েছেন সীমিত ও নিম্ন আয়ের মানুষ।

বোতলজাত সয়াবিন তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়ে বক্তব্যের জন্য একাধিক কোম্পানির কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এমই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন