জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান দেশে ফিরেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে তাকে বহনকারী বিমান রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।
ড. খলিলুর রহমানের এই অর্জনে সংশ্লিষ্টরা আবারও তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং তার জন্য দোয়া কামনা করেছেন। আগামী এক বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন।
বিশ্বনেতাদের অভিনন্দন আর প্রশংসায় ভাসছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান নির্বাচিত হওয়ার পর বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার পক্ষ থেকে একের পর এক অভিনন্দন বার্তা আসছে। তারা এই বিজয়কে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মর্যাদা এবং বহুপাক্ষিকতার প্রতি অঙ্গীকারের স্বীকৃতি হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
জাতিসংঘের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই পদে ড. খলিলুরের বিজয়কে অভিনন্দন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তান, ভারত, মালদ্বীপ, জাতিসংঘ, আফ্রিকান ইউনিয়নসহ (এইউ) বিভিন্ন দেশ বার্তা পাঠিয়েছে ।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন এক বার্তায় বলেছেন, ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে এটিকে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে বর্ণনা করেছে চীন। ঢাকায় চীনা দূতাবাস থেকে পাঠানো এক অভিনন্দন বার্তায় বলা হয়, এই বিজয় বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা এবং বহুপাক্ষিকতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দেশটির গঠনমূলক ভূমিকার প্রতিফলন।
নবনির্বাচিত সভাপতির প্রতি প্রত্যাশা ব্যক্ত করে চীন বলেছে, তারা আশা করে ড. খলিলুর রহমান সব সদস্যরাষ্ট্রকে ঐক্যবদ্ধ করবেন, সার্বভৌম সমতার নীতি সমুন্নত রাখবেন, আন্তর্জাতিক আইনের শাসন রক্ষা করবেন, সংলাপ ও আলোচনাকে উৎসাহিত করবেন এবং বহুপাক্ষিকতার ভিত্তি শক্তিশালী করবেন।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এক টুইটে খলিলুর রহমানকে ‘ভাই’ সম্বোধন করে বলেছেন, আমার প্রিয় ভাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আন্তরিক অভিনন্দন। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুবাদে আমি নিশ্চিত যে, তার ব্যাপক কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বহুপাক্ষিকতার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার এই পরিষদকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করবে।
ইসহাক দার বলেন, আমি জাতিসংঘে আমাদের সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখতে এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করতে, অভিন্ন বৈশ্বিক অগ্রাধিকারগুলোকে এগিয়ে নিতে এবং সংলাপ, শান্তি ও টেকসই উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে একসঙ্গে কাজ করার জন্য উন্মুখ হয়ে আছি।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার এক্স হ্যান্ডেলে এক পোস্টে বলেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন। আমাদের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলোকে এগিয়ে নিতে এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করতে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করি।
মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুইজ্জু ড. খলিলের এই অর্জনকে বাংলাদেশ ও সমগ্র অঞ্চলের জন্য এক গৌরবের মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করে এক অভিনন্দন বার্তায় বলেন, এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সার্বিক সাফল্য কামনা করি।
মুইজ্জু বলেন, আমি আত্মবিশ্বাসী যে, আপনার দক্ষ নেতৃত্বে সাধারণ পরিষদ সব সদস্যরাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ভূমিকা পালন করে যাবে। এই নির্বাচন শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের জন্য একটি বড় অর্জন । এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জনগণ এবং এই পুরো অঞ্চলের জন্য একটি গৌরবের মুহূর্ত।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন । জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন। তার অসাধারণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে আমরা ব্যাপকভাবে উপকৃত হব।
ড. খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ) বলেছে, এই অর্জন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধরনের মাইলফলক । সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, ড. খলিলুর রহমানের এই নির্বাচনে জয়লাভ করাটা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বৈশ্বিক অবস্থান ও মর্যাদা আরো বাড়াবে। এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মাইলফলক, যা অন্যান্য দেশের মাঝে তাদের বৈশ্বিক উপস্থিতি বাড়াতে ভূমিকা রাখবে।
উল্লেখ্য, একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে সাইপ্রাসের প্রার্থীকে পরাজিত করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। গোপন ব্যালটের মাধ্যমে কাস্টিং হওয়া ১৯০টি ভোটের মধ্যে বাংলাদেশ ৯৯ এবং সাইপ্রাস ৯১ ভোট পেয়েছে।
এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। বহুপাক্ষিক বিশ্বমঞ্চে দেশের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা ও অংশগ্রহণের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতিফলন এটি। আগামী সেপ্টেম্বরে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে ড. খলিলুর রহমান বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল এই বহুপাক্ষিক সংস্থার সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ড. খলিলুর রহমান সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন, ঐক্য তৈরি এবং জাতিসংঘের অভ্যন্তরে সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। এ বিশ্ব সংস্থাটির আগামী অধিবেশনের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি ।
নিউ ইয়র্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাধারণ পরিষদের আগামী ৮১তম অধিবেশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে যাচ্ছে। কারণ এই অধিবেশনে সাধারণ পরিষদকে জাতিসংঘ সংস্কার, পরবর্তী প্রজন্মের বৈশ্বিক উন্নয়ন এজেন্ডার প্রস্তুতি ও পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের মাধ্যমে জাতিসংঘের নেতৃত্ব পরিবর্তনের মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মুখোমুখি হতে হবে। তিনি বলেন, আজ জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো আমাকে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করেছে। আমি বিনম্রতা ও শ্রদ্ধার সঙ্গে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি।
জলবায়ু পরিবর্তন, ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন বৈষম্যসহ বিশ্ব বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ড. খলিল ছয়টি অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র ঘোষণা করেন, যা তার সভাপতিত্বের মেয়াদকালে দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে। অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলো হলো—শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার; টেকসই উন্নয়ন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জন ত্বরান্বিত করা; জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব; মানবাধিকার, মানবিক সহায়তা, শরণার্থী ও অভিবাসী; ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার নতুন উদ্যোগ, ইউএন-৮ (জাতিসংঘের ৮০ বছর পূর্তি) সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসন।
ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এ সময়ে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দেন নবনির্বাচিত সভাপতি। তিনি বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর আমি সাধারণ পরিষদকে বলেছি, আমি আস্থা পুনর্গঠন, ঐক্য গড়ে তোলা ও সদিচ্ছামূলক আলোচনার পথ উন্মুক্ত করতে নিজেকে নিয়োজিত করব। এর ফলে এমন ফলাফল আসবে, যা সবার জন্য কল্যাণকর হবে, যাতে সবার অংশীদারত্ব থাকবে।
নিরপেক্ষতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রতি তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে ড. খলিলুর রহমান জানান, তিনি জাতিসংঘের সনদ সমুন্নত রাখবেন এবং এই পদের আচরণবিধি সম্পূর্ণ মেনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি বলেন, আমি সব সদস্যরাষ্ট্রের সভাপতি হব। আমার কাজের ক্ষেত্রে আমি সব সদস্যরাষ্ট্রকে সম্পৃক্ত করব।
মতানৈক্য সত্ত্বেও দেশগুলোর মধ্যে অভিন্ন মেলবন্ধন খুঁজে বের করার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, আমি মতপার্থক্যগুলোকে উপেক্ষা না করেই সবার সাধারণ অবস্থান খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করব।
এমবি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


