মণ্ডপ থেকে বিসর্জনস্থল, চলাচলের পথ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় এবার বহুমাত্রিক প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রাজধানীর প্রতিটি পূজামণ্ডপ সিসিটিভির আওতায় আনা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত মণ্ডপ ইনচার্জদের বডিওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সোয়াট, ক্রাইসিস রেসপন্স টিমসহ বিশেষায়িত ইউনিটও প্রস্তুত থাকবে।
সব মিলিয়ে সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপ ঘিরে সাজানো হচ্ছে সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থা। আজ শনিবার মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে দুর্গাপূজার প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা। মূল পূজা চলবে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত।
মণ্ডপ বাড়লেও ঝুঁকি নেই
এবার সারা দেশে পূজামণ্ডপের সংখ্যা গতবারের তুলনায় প্রায় দেড় হাজার বেশি। এসব মণ্ডপে উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে জাতীয় পর্যায় থেকে জেলা-উপজেলা পর্যন্ত দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কোনো মণ্ডপকে বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেনি বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তবে এরপরও সতর্ক অবস্থানেই থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর এবং বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টার মনিটরিংয়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কোনো মণ্ডপে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে স্থানীয় পর্যায়ে খবর পৌঁছানোর পাশাপাশি দ্রুত কেন্দ্রীয়ভাবে তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হচ্ছে। এ জন্য জাতীয় টেলিযোগাযোগ মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগানো হবে।
ঢাকায় মণ্ডপে মণ্ডপে ক্যামেরা
রাজধানীর মণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় প্রযুক্তিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডিএমপি জানিয়েছে, প্রতিটি পূজামণ্ডপ সিসিটিভির আওতায় থাকবে। মণ্ডপের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বডিওর্ন ক্যামেরা নিয়ে দায়িত্ব পালন করবে। ফলে কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্যের পাশাপাশি ক্যামেরায় ধারণ করা তথ্যও তদন্তে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
ইউনিফর্মধারী পুলিশের সঙ্গে থাকবে সাদা
পোশাকের সদস্য। কোনো স্থানে হঠাৎ বড় ধরনের গোলযোগ, সন্দেহজনক বস্তু পাওয়া কিংবা বিস্ফোরণের আশঙ্কা তৈরি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বিশেষায়িত দলগুলোকে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। সোয়াট, ক্রাইসিস রেসপন্স টিম, কুইক রেসপন্স টিম ও বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটকে স্ট্যান্ডবাই রাখার কথা জানিয়েছে ডিএমপি।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ বলেন, বর্তমান সরকারের সময়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা এটাই প্রথম। তাই এই উৎসব আমাদের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। ঢাকা মহানগর এলাকার প্রতিটি পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে পূজা উদযাপনের লক্ষ্যে ডিএমপি সর্বোচ্চ সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালন করবে।
পাশাপাশি পূজা মণ্ডপ কমিটিগুলোকেও নিজেদের ব্যবস্থাপনায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে স্বেচ্ছাসেবক, কমিটির সদস্য ও দর্শনার্থীদের গতিবিধির ওপর নজর রাখতে বলা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা সংশ্লিষ্ট থানায় দ্রুত জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আগেই নেমেছে আনসার-ভিডিপি
পূজার আগেভাগেই মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা যাচাই শুরু করেছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মূর্তি তৈরির স্থান, মন্দির ও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন বাহিনীর সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট পূজা কমিটি, মন্দির কর্তৃপক্ষ ও মূর্তি নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে বসে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশনায় মণ্ডপের নিরাপত্তায় স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও পাহারাদার রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দিনের পাশাপাশি রাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পালাক্রমে পাহারার ব্যবস্থাও থাকছে।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও সিসিটিভি ক্যামেরা
মণ্ডপে ক্যামেরা থাকলেও বিদ্যুৎ না থাকলে সেই ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তাই পূজামণ্ডপে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জেনারেটর প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত রিচার্জেবল লাইট রাখার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া বিসর্জনের সময় জনসমাগম বেড়ে যাওয়ায় ওই সময়ের যান চলাচল ও নিরাপত্তা নিয়েও আলাদা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাজধানীতে মহালয়া থেকে শুরু করে পূজার দিনগুলো এবং মূর্তি বিসর্জন পর্যন্ত নিরাপত্তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে ডিএমপি।
নজর থাকছে ফেসবুকেও
মাঠের নিরাপত্তার পাশাপাশি এবার বড় গুরুত্ব পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। পূজাকে কেন্দ্র করে গুজব, উসকানিমূলক বক্তব্য, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে এমন মন্তব্য কিংবা পুরোনো ঘটনার ছবি-ভিডিও নতুন ঘটনার নামে ছড়িয়ে দেওয়ার তথ্য পেলে এ ধরনের তৎপরতা শনাক্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণের নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
গোয়েন্দা সূত্র আমার দেশকে জানিয়েছে, কারো কোনো পোস্ট বা ভিডিও মুহূর্তে হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ফলে একটি মণ্ডপে ছোট কোনো ঘটনা ঘটলেও সেটি যাচাই ছাড়া ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। এ কারণেই অনলাইনে গুজব ছড়ানোর বিষয়টিকে এবার মাঠের আইনশৃঙ্খলার সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি পূজা কমিটিগুলোকেও নিরাপত্তার প্রথম সারির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মণ্ডপে দায়িত্ব পালনকারী স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা ও যোগাযোগের তথ্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের পরিচয়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে, যাতে জরুরি সময়ে পুলিশ দ্রুত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। মাঠ প্রশাসনে ঢাকা ও গাজীপুর জেলা প্রশাসকের তৎপরতা বেশ আলোচনায় এসেছে।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূইয়া আমার দেশকে বলেন, এবারের পূজায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বার্তায় মাঠ পর্যায়ের স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, সব মিলিয়ে এবারের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় মূল বার্তাটি পরিষ্কার—কোনো ঘটনা ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষা নয়, বরং আগে থেকেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


