এখনো জনগণের অনুভূতি নিয়ে খেলছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাসিনা

এখনো জনগণের অনুভূতি নিয়ে খেলছেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হাসিনা
টিএসসি-সংলগ্ন মেট্রোরেলের পিলারে শেখ হাসিনার গ্রাফিতি (ঘৃণাস্তম্ভ), পরে যা ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর দিবাগত রাতের গভীরে মুছে ফেলা হয়। ছবি: সংগৃহীত

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পরও দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনা।

তিনি বলেছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে চান। তবে কবে বা কীভাবে ফিরবেন, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা বা তারিখ ঘোষণা করেননি তিনি।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারত চলে যান হাসিনা। এরপর তার অনুপস্থিতিতেই বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে বিচার কার্যক্রম চলে। ওই মামলায় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

তবে হাসিনা শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

তার দাবি, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে বুধবার দিল্লির জনাকীর্ণ প্রেস ক্লাবে প্রচারিত এক অডিও বার্তায় হাসিনা বলেন, তাকে দেশে ফিরতেই হবে।

তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তার সঙ্গে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। তবু নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসবেন না।

দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে এই ভার্চ্যুয়াল বৈঠক ছিল ক্ষমতা হারানোর পর গণমাধ্যমের সঙ্গে হাসিনার প্রথম সরাসরি যোগাযোগ। তিনি অডিও লিংকের মাধ্যমে বক্তব্য দেন এবং বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দেন।

হাসিনা তার বক্তব্যে অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনকে কয়েকটি সংগঠন সহিংস আন্দোলনে পরিণত করেছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।

বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগে সাজা হয়েছে, সেগুলোকে তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফল বলে দাবি করে আসছেন।

তবে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, হাসিনা ও তার সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য পরিকল্পিতভাবে প্রাণঘাতী সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছিল।

বিবিসি আইয়ের যাচাই করা একটি ফোনালাপের অডিওতে হাসিনাকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের অনুমোদন দিতে শোনা যায়। তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণ এবং সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে ওই অডিও রেকর্ডিংকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন প্রসিকিউটরেরা।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন পরে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ওই আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি এবং বিভিন্ন সংঘর্ষে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছেন।

প্রবল বিক্ষোভের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ৭৮ বছর বয়সী হাসিনা ঢাকা ছেড়ে ভারতে চলে যান। তার দেশ ছাড়ার পরপরই হাজারো বিক্ষোভকারী প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবন, কার্যালয়সহ বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় প্রবেশ করেন।

এর মধ্য দিয়ে ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশ বাংলাদেশ বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।

পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসে। দলটির নেতা তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।

ভারতকে নিয়ে ঢাকার ক্ষোভ

হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর বাংলাদেশের সরকার ভারতের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ জানিয়েছে। এর আগে নতুন সরকার স্থানীয় গণমাধ্যমকে হাসিনার বক্তব্য প্রকাশ বা সম্প্রচার না করার বিষয়ে সতর্ক করেছিল।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ সরকার ভারতের প্রতি ক্ষুব্ধ।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে দেশ আর কখনো ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে ফিরে যাবে না। বাংলাদেশ কখনো কোনো করদ রাষ্ট্র হবে না।

দেশে ফিরলে কী হতে পারে

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাসিনা দেশে ফিরলে বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে। তার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন মাঠে নামতে পারে।

ঢাকাভিত্তিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান বলেন, শেখ হাসিনা যদি বাংলাদেশে ফেরেন, তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

তার মতে, ব্যক্তিগতভাবে এটি হাসিনার জন্য অত্যন্ত বড় ঝুঁকির সিদ্ধান্ত।

তিনি বলেন, দেশে ফিরলে বিএনপির সমর্থক, ছাত্রদের রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেন্স পার্টি (এনসিপি), ইসলামপন্থি বিভিন্ন গোষ্ঠী এবং অন্য রাজনৈতিক পক্ষগুলো তার সাজা কার্যকরের দাবিতে কর্মসূচি দিতে পারে।

তবে হাসিনা দেশে না ফিরলেও আওয়ামী লীগের জন্য ঝুঁকি কম নয়। তিনি দেশ ছাড়ার পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি।

আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

আওয়ামী লীগের নেতারা অভিযোগ করেছেন, হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দলটির শত শত সমর্থক গণপিটুনি ও সহিংসতায় নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতেও অনেকের মৃত্যু হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

তবে সরকার আওয়ামী লীগ সমর্থকদের পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

হাসিনার মন্ত্রিসভার সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি বলেন, হাসিনা দেশে ফিরে না গেলে সহিংসতা চলতে থাকবে এবং আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

আওয়ামী লীগের ভেতরেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দলের অনেক নেতা-কর্মীর অভিযোগ, শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের নেতা ও সমর্থকদের সম্ভাব্য হামলা ও ঝুঁকির মুখে রেখে গেছেন।

ডেভিড বার্গম্যান বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশের রাজনীতিতে হাসিনার কোনো ভূমিকা রাখতে হলে তাকে দেশে ফিরে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও দেশে ফেরার ঘোষণা হাসিনার জন্য একটি বড় রাজনৈতিক বাজি। তিনি হয়তো মনে করছেন, দেশে ফিরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা না করলে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ আরো দুর্বল হয়ে পড়বে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন