বিএসএফকে বীরোচিত জবাব বিজিবির

সিলেট ব্যুরো ও গোয়াইনঘাট প্রতিনিধি

বিএসএফকে বীরোচিত জবাব বিজিবির

সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) অন্যায় আগ্রাসন ও উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আবার বুক চিতিয়ে বীরত্বপূর্ণ জবাব দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। গত সোমবার বিকেলে সিলেট সীমান্তে বিএসএফের অতর্কিত ও বেআইনি গুলিবর্ষণের ঘটনায় গর্জে ওঠে বিজিবির অস্ত্র। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবির সাহসী পাল্টা জবাবে পিছু হটতে বাধ্য হয় বিএসএফ। বিজিবির তাৎক্ষণিক জবাবে সীমান্ত পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। স্থানীয় মানুষের মধ্যে ফেরে স্বস্তি।

বিজিবির সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) দায়িত্বপূর্ণ গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্ত এলাকায় বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের ঘটনাটি গতকাল মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করে বিজিবি।

বিজ্ঞাপন

সূত্র জানায়, সোনারহাট সীমান্তে সোমবার বিকেলে বিএসএফ সদস্যরা হঠাৎ উসকানিমূলকভাবে গুলি ছুড়লে তাৎক্ষণিকভাবে কড়া প্রতিক্রিয়া জানায় বিজিবি। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশের সীমান্ত প্রহরী জওয়ানরা অত্যন্ত পেশাদারিত্ব ও সাহসিকতার সঙ্গে পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করেন। এ সময় বিজিবি-বিএসএফ তুমুল গোলাগুলি হয়। কী কারণে বিএসএফ এ ধরনের কাপুরুষোচিত ও অতর্কিত গুলি চালিয়েছিল, তার নির্দিষ্ট কোনো কারণ জানা যায়নি। তবে বিজিবির এই বজ্রকঠিন ও তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাবে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ নিরাপত্তা বোধ করেন এবং ভারতীয় আগ্রাসন থমকে গিয়ে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। বিজিবির এই দৃঢ় ও পেশাদার পদক্ষেপের ফলে সীমান্তে বড় ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। এই বীরত্বপূর্ণ মুখোমুখি অবস্থানে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি এবং বর্তমানে সীমান্ত পরিস্থিতি শান্ত ও স্থিতিশীল রয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল, রণপ্রস্তুতি এবং নজরদারি সর্বোচ্চ পর্যায়ে জোরদার করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘বিএসএফ কী কারণে গুলি করেছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বিজিবি যেভাবে পাল্টা গুলিবর্ষণ করে কড়া জবাব দিয়েছে, তার

ফলেই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে এবং সীমান্তবর্তী আমাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। বিজিবি সীমান্তে যেকোনো ধরনের উসকানিমূলক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে সর্বদা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্তের নিরাপত্তা রক্ষায় বিজিবি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে এবং যাবে।’

এদিকে, যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সীমান্তবর্তী জনসাধারণকে অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম এবং সীমান্ত এলাকায় যেকোনো ধরনের অননুমোদিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য বিজিবির পক্ষ থেকে সতর্ক ও সচেতন করা হয়েছে।

বিএসএফের বর্বরতা ও সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা

সিলেট সীমান্তের এ ঘটনা প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ স্কলার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, ‘বিএসএফ বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্তজুড়ে যে রক্তাক্ত নৃশংসতা দশকের পর দশক ধরে চালিয়ে যাচ্ছে, তা বিশ্বে নজিরবিহীন মানবাধিকার লঙ্ঘন। অনেক সময় বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে বাংলাদেশিদের জীবন ও সম্পদের ওপর আগ্রাসন চালায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে দায়মুক্তি উপভোগের সুযোগ নিয়ে ‘শুট অ্যাট সাইট’ (দেখামাত্র গুলি) নীতি অবলম্বন করে বিএসএফ নিয়মিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রতি বর্ণবাদী মানসিকতা থেকে বিএসএফ এমন আগ্রাসী আচরণ করে কি না, সেটা গবেষণার দাবি রাখে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশের সরকারগুলো গত কয়েক দশকে সীমান্তব্যাপী বিএসএফের লাগামহীন মানবাধিকার লঙ্ঘন অবসানে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় সংকট ঘনীভূত হয়েছে। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দেশের সীমান্তসংলগ্ন জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারের কূটনৈতিকসহ সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’

বিজিবি ও বীর জনতার ঐতিহাসিক প্রতিরোধ

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে গত দুই বছরে ভারতীয় বিএসএফের একতরফা আগ্রাসন, গুলি ও অনধিকার প্রবেশের বিরুদ্ধে বিজিবি এবং সীমান্তবর্তী বীর জনতা অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বিএসএফের অন্যায় জুলুমের দাঁতভাঙা জবাব দিতে সীমান্তের কোনো কোনো পয়েন্টে কখনো কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বা কখনো রাতের অন্ধকারে বিজিবি জওয়ানরা বুক চিতিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছেন এবং ভারতের যেকোনো উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র তাক করে কড়া জবাব দিয়েছেন। একই সঙ্গে এই দুই বছরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের বেআইনি ও অনধিকার প্রবেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সীমান্তে বীর বাংলাদেশিরা গ্রামবাসী লাঠিসোটা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিএসএফকে ধাওয়া করে দেশের সীমান্ত পাহারা দেওয়ার এক অনন্য দেশপ্রেমিক নজির স্থাপন করেছেন।

২০২৪ সালের ২২ জানুয়ারি ভোরে যশোরের ধান্যখোলা সীমান্তে বিএসএফ সদস্যরা অন্যায়ভাবে বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকে বিজিবি সিপাহি মোহাম্মদ রইশুদ্দীনকে কাপুরুষোচিতভাবে গুলি করে হত্যা করলে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বিজিবি আরো কঠোর ও আক্রমণাত্মক অবস্থান নেয়। ওই ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন সীমান্তে, বিশেষ করে ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া জোনে চোরাচালান প্রতিরোধ ও ভারতের একতরফা ও অবৈধ কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের চেষ্টা বিজিবির তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সে সময় বিজিবি জওয়ানরা কয়েক দফা মুখোমুখি অবস্থান নিয়ে সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি ছুড়ে বিএসএফকে পিছু হটতে বাধ্য করেন।

জিরো টলারেন্স নীতি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বিজিবির নীতিতে বড় ধরনের দেশপ্রেমিক ও কৌশলগত পরিবর্তন আসে। নতুন স্বাধীন ও সার্বভৌম পরিস্থিতিতে বিজিবি সীমান্তে যেকোনো ধরনের আগ্রাসন ও অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করে এবং স্থানীয় দেশপ্রেমিক জনগণও বিএসএফের যেকোনো অন্যায় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরাসরি রুখে দাঁড়ায়। বিজিবির এই বীরত্বপূর্ণ নীতি ভারতীয় স্ট্র্যাটেজিক থিংক ট্যাংক ‘ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস’ (আইডিএসএ)-এর ২০২৫ সালের মে মাসের প্রতিবেদনেও ভারতের জন্য একটি বড় ধরনের ‘নিরাপত্তা ভীতি ও ধাক্কা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ফেনী, পঞ্চগড় ও নোয়াখালী সীমান্তে ভারতীয় নাগরিকদের অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত সংস্কারের নামে বিএসএফের একতরফা মাতব্বরি রুখে দেয় বিজিবি। সে সময় বেশ কয়েকটি স্থানে বাংলাদেশি ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে স্থানীয় উত্তেজিত ও দেশপ্রেমিক গ্রামবাসী লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া দিলে বিএসএফ সদস্যরা লেজ গুটিয়ে তাদের সীমানার ভেতরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের জুড়ী সীমান্তে ১৪ বছর বয়সি কিশোরী স্বর্ণা দাস এবং ৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৩টায় ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী সীমান্তে কিশোর জয়ন্ত কুমার সিংহকে (১৫) বিএসএফ নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করলে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। ওই দুটি বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ভারতকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র পাঠিয়ে জবাবদিহি চাওয়া হয় এবং বিজিবি ফ্ল্যাগ মিটিংয়ে বিএসএফের ‘নন-লেথাল ওয়েপন’ ব্যবহারের আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের দ্বিচারিতাকে কঠোরভাবে ধুয়ে দেয়।

২০২৫ সালে বিএসএফকে কোণঠাসা

বিজিবির বীরত্বপূর্ণ ও অনমনীয় অবস্থান ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের শুরুতেও অব্যাহত থাকে। গত বছরের মাঝামাঝি সময় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম এবং কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে বিএসএফের অব্যাহত উসকানির জবাবে বিজিবি সীমান্ত টহল দ্বিগুণ করে এবং বিএসএফকে লক্ষ্য করে পাল্টা চরম সতর্ক বার্তা জারি করে তাদের সম্পূর্ণ কোণঠাসা করে ফেলে।

সবশেষ চলতি বছরের শুরুর দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওয়াহেদপুর এবং সাতক্ষীরার কলারোয়া সীমান্তে বিএসএফ রাতের অন্ধকারে জিরো লাইনের কাছাকাছি এসে প্রজেক্টর লাইট দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আলো ফেলে দাদাগিরি দেখানোর চেষ্টা করলে স্থানীয় বিজিবি ক্যাম্পের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে। সে সময় বিএসএফের অতিরিক্ত বাড়াবাড়িতে ক্ষুব্ধ হয়ে সীমান্তবর্তী বীর গ্রামবাসী একজোট হয়ে লাঠিসোটা নিয়ে বিএসএফকে ধাওয়া করলে ভারতীয় জওয়ানরা দ্রুত নিজেদের সীমানার ভেতরে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। পরে বিজিবি নিজ নিজ বাংকারে ভারী অস্ত্রসহ চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান নিলে বিএসএফ পুরোপুরি পিছু হটে এবং ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ের জরুরি বৈঠকে বাংলাদেশের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে বাধ্য হয়।

গত সোমবারের সিলেট সীমান্তের সবশেষ গোলাগুলির ঘটনাসহ গত দুই বছরের সামগ্রিক সীমান্ত পরিস্থিতি এটাই প্রমাণ করে, বিএসএফের ক্রমাগত অন্যায় ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে পরিবর্তিত বাংলাদেশের বিজিবি ও সাধারণ জনগণের ইস্পাতকঠিন ও দেশপ্রেমিক প্রতিরোধ ভারতের একতরফা আগ্রাসী নীতিকে সীমান্তে পুরোপুরি ধূলিসাৎ ও ব্যর্থ করে দিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন