সংবাদকর্মীদের দলীয় অন্ধ আনুগত্য বর্জন করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর চেষ্টা করার আহ্বান জানিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। তিনি বলেন, যারা শাসকগোষ্ঠী, তারা এসে শুরুতেই মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন। কারণ মিডিয়া জনমত তৈরি করে এবং সরকারের নানা অনিয়ম কাভার দেওয়ার চেষ্টা করে।
শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে 'মঞ্চ ২৪' আয়োজিত ‘মুক্ত গণমাধ্যম, বাক-স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহিংসতা’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সাংবাদিকদের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, আমি সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে কিছু বলছি না, আপনাদের সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ মিডিয়া হাউসগুলো নিয়ন্ত্রণ করে অলিগার্করা। তবে দলের প্রতি যে অন্ধ আনুগত্য, তা থেকে আপনাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কাদের ছত্রচ্ছায়ায় কিশোর গ্যাং গড়ে উঠছে তা বের করুন, প্রশ্ন তুলুন। কোথায় নিখোঁজ শিশুরা যাচ্ছে, সেগুলো খুঁজে বের করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করুন। গণমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ, এর কাজ হলো রাষ্ট্রের চরিত্রকে ঠিক রাখা।
গুম কমিশন প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর সবাই ভেবেছিল সব আইন ও ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে এবং মানুষ একটি সুস্থ জীবন ফিরে পাবে। কিন্তু গুম কমিশনকে বাদ দেওয়া জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন।
সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে দিলারা চৌধুরী বলেন, একলা একলা বসে সংবিধান বানাচ্ছেন, আবার বলছেন অনুচ্ছেদ বদলাতে গণভোট বা রেফারেন্ডাম হবে। ক্যালিফোর্নিয়ার মতো কিছু অঙ্গরাজ্যে রেফারেন্ডামের বিধান আছে, কিন্তু সংবিধানের অনুচ্ছেদ বদলাতে রেফারেন্ডাম—এমন কথা আমি আগে শুনিনি। রাজনীতি বুঝতে হলে ডক্টর সালাউদ্দিনের সঙ্গে ক্লাস করতে হবে! তা না হলে উনি কী বলেন বোঝা যায় না, আর উনি যা বলছেন সেটাই কি সংবিধান?
কথায় কথায় ট্যাগ লাগানো বন্ধ করার আহ্বান জানান অধ্যাপক দিলারা। তিনি বলেন, জামায়াতপন্থী, রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী এ ধরনের ট্যাগিং দেওয়া হয়। আমি আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপে বিশ্বাস করি। সবার কথা শুনতে রাজি, কারণ সব মতের নির্যাস থেকে দেশের জন্য যা ভালো, তা তুলে ধরাই আমাদের মতো শিক্ষকদের কাজ। জামায়াত, না স্বাধীনতাবিরোধী, না রাজাকার –এসমস্ত প্রশ্ন তোলে। আর রাজাকার হলে পরে তো মির্জা ফখরুল ইসলামের বাবার কথাও তো উঠেছে যিনি রাজাকার ছিলেন। তো উনি প্রেসিডেন্ট হয়ে বসে আছেন, আর বাকি সবাইকে আপনি রাজাকার ডাকছেন আপনার ইচ্ছেমতো। এভাবে রাষ্ট্র চলতে পারে না। রাষ্ট্র যেমন খুশি তেমন চলতে পারে না। রাষ্ট্র চলে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের ভেতরে। সিভিল সোসাইটি, শিক্ষক, গণমাধ্যম, সেনাবাহিনী, আমলাতন্ত্র, সবাই মিলেই দেশ গড়তে হবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা থাকলে রাষ্ট্র ঠিকমতো কাজ করতে বাধ্য হবে, তবে গণমাধ্যমকে ইচ্ছামতো ছেড়ে দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং জবাবদিহিতার জায়গাটিও ঠিক রাখতে হবে।
মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকীর সভাপতিত্বে সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন মানবাধিকারকর্মী রুবী আয়াতুল্লাহ, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান বীর প্রতীক ও ড. ফয়জুল হকসহ অনেকে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


