হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা সদস্যকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা অবসরপ মেজর আখতারুজ্জামানের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।
রোববার দুপুর সোয়া তিনটার দিকে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জামসেদ আলমের আদালতে উভয়পক্ষের আবেদনের ওপর শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
জামিন শুনানির জন্য আজ দুপুর আড়াইটার দিকে আখতারুজ্জামানকে কঠোর পুলিশি পাহাড়ায় এজলাসে তোলা হয়। আদালতে তোলার পরে বেলা ২টা ৪০ মিনিটের দিকে এজলাসের মধ্যে বিএনপি এবং জামাতপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে বাকবিতন্ডার এক পর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এ অবস্থায় বিচারক এজলাস থেকে নেমে যান। কয়েক মিনিট ধরে চলে এই ধাক্কাধাক্কি।পরে রাষ্ট্রপক্ষে পিপি ওমর ফারুক ফারুকী ও আসামিপক্ষে আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সবাইকে অনুরোধ করেন। বেলা ২টা ৪৫ মিনিটে বিচারক পূনরায় এজলাসে উঠলে আখতারুজ্জামান তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, "১০ জন আইনজীবী আমার পক্ষ থেকে শুনানি করবে তার অনুমতি চাই। এ সময় তার গলার সুর ভাঙা শোনা যায়। যদিও শুনানি শেষে আখতারুজ্জামান জামিন নামঞ্জুরের আদেশ শুনে এজলাসে দাড়িয়ে 'আল্লাহু আকবার' বলে স্লোগান দেন। পরে উপস্থিত আইনজীবীরা তাকে থেমে যেতে বলেন।
শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা গতকালের ব্রিফিংয়ে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকী জামায়েত নেতা আখতারুজ্জামানকে' বাতিল মাল 'বলে মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ করেন। এটি উল্লেখ করে আদালতে প্রতিবাদ জানান তারা। পরে উভয়পক্ষ উত্তেজিত হলে বিচারক তাদের থামতে বলেন।
এদিকে আদালতে আখতারুজ্জামানের জামিন শুনানির সময়কার আইনজীবীদের মধ্যকার ধাক্কাধাক্কি বাকবিতন্ডা গড়ায় আদালতের নিচ পর্যন্ত। শুনানি শেষে সিএমএম কোর্টের সামনের রাস্তায় বিএনপি এবং জামাতপন্থী আইনজীবীদের হট্টগোল এবং ব্যপক ধাক্কাধাক্কি চলে কয়েক মিনিট ধরে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরিশের চেষ্টায় তা নিয়ন্ত্রণে আসে।
আখতারুজ্জামানের পক্ষে আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজন জামিন শুনানি শুরু করেন। আব্দুর রাজ্জাক শুনানিতে আদালতে বলেন, কয়েকবারের সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান। তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। বিমানবন্দরের ঘটনায় তার কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়না। বিমানবন্দরের অনিয়মের বিরুদ্ধে কেবল তিনি প্রতিবাদ করেছেন। সেখানে তিনি মালামাল বহনের ট্রলি ছিলোনা। সেখানকার জুনিয়রদের ব্যপারে সিনিয়রদের কাছে কেবলমাত্র অভিযোগ দিয়েছেন মাত্র। হাল্কা বাকবিতন্ডার পরে কিন্তু তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। পরেরদিন এজাহার দিয়েছে সব সিসিফুটেজে রয়েছে বলে। তবে শারীরিকভাবে আঘাত করার কথা বলে যে অভিযোগ সেই জায়গায় সিসিটিভি ফুটেজে ছিলোনা বলে উল্লেখ করা হয়। আমরা মনে করি রাজনৈতিক কারনে এই মামলা করা হয়েছে। সে গুরুতর অসুস্থ, হাই ডায়বেটিকস, হার্টের সমস্যা রয়েছে তার। সবকিছু বিবেচনায় যে কোনো শর্তে তাকে জামিন দেয়া হোক। মামলার একটি ধারা ছাড়া সকল ধারা জামিন যোগ্য। মামলায় কিছু নেই।
শুনানিতে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী আদালতে বলেন, "আখতারুজ্জামান নিজেকে বাচাতে জামায়াতে যোগ দিয়েছেন এবং ওনারাও (জামায়াত) আমাদেরকে গালি দেওয়াতে আশ্রয় দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী আখতারুজ্জামানের জামিনের বিরোধিতা করে শুনানিতে বলেন, তিনি বিমানবন্দরে জমজমের পানি নিক্ষেপ করেছে এমনভাবে, যে কারো গায়ে গিয়ে পরবে তার খবর নেই। যে দৃশ্য টিভিতে সবাই দেখছে। পিপি আরও বলেন, প্রতিবাদ কোনো অপরাধ নয় কিন্তু এর ভাষা এবং ধরন যদি অস্বাভাবিক হয় তাহলে সেটা অবশ্যই অপরাধ। তিনি (আখতারুজ্জামান) বিমানবন্দরে কামাল উদ্দীন নামে এক কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে অপমান করেছেন। জমজমের পানি নিক্ষেপ এবং সেখানে অংশগ্রহণ হয়তো আখতারুজ্জামানের পরিকল্পিত বলে দাবি করেন পিপি।
পিপি ফারকী আরও বলেন, কোথায় সরকারকে গালাগালি করা যায় সেটা নিয়ে তারা ব্যস্ত। বিএনপি এদেশের বহু লোককে জন্ম দিয়েছে। অনেকে আমাদের ভুলে যায়। জামায়াতের আইনজীবীদের উদ্দেশ্য করে পিপি বলেন, আমাদের মধু খেয়ে আপনারা বেচে ছিলেন।তিনি বলেন, এ মামলায় তিনি জামিন পেলে তদন্তে ব্যঘাত ঘটবে।কোন উদ্দেশে কার কারণে বিমানবন্দরে এ ধরনের কাজ করেছে এবং জামিন অযোগ্য ধারা এজন্য তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হোক"।
মামলায় অভিযোগ, গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মদিনা থেকে আগত একটি ফ্লাইটের (BG-338) লাগেজ পেতে বিলম্ব হওয়ায় যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ ঘটনাস্থলে এলে মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া ও মারধরের হুমকি দেন।
এজাহারে আরো উল্লেখ করা হয়, আখতারুজ্জামানের সঙ্গীরা সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণ শুরু করলে নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বাধা দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মেজর আখতারুজ্জামান তাকেও গালাগাল ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন। এ ছাড়া তিনি সাধারণ যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ছুড়ে ফেলে দেন এবং বিমান বাংলাদেশ প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন। ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


