বিচারের রায় কার্যকরের দাবি

আবরার ফাহাদের শাহাদাতবার্ষিকীতে আধিপত্যবাদবিরোধী অঙ্গীকার

আবরার ফাহাদের শাহাদাতবার্ষিকীতে আধিপত্যবাদবিরোধী অঙ্গীকার

ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে সারারাত নির্মম ও পাশবিক নির্যাতন করে হত্যা করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ। তার সপ্তম শাহাদাৎবার্ষিকীতে ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অঙ্গীকার ব্যক্ত করে অতি দ্রুত হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায় কার্যকরের দাবি জানানো হয়েছে। সেইসঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতিত শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বানানো রাষ্ট্রকাঠামো বদলাতে সংস্কারের দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর পলাশী চত্বরে ‘আগ্রাসনবিরোধী আট স্তম্ভের’ পাদদেশে শহীদ আবরার ফাহাদের সপ্তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে স্মরণসভার আয়োজন করে আবরার ফাহাদ স্মৃতি সংসদ। এতে বক্তব্য রাখেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অধিকার সম্পাদক আদিলুর রহমান খান, লেখক ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক মাহফুজ আলম, এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, আবরার ফাহাদের বাবা মো. বরকতউল্লাহ প্রমুখ।

বিজ্ঞাপন

আবরার ফাহাদের শাহাদাতকে সম্মান জানাতে নিজেদের ভুল-ত্রুটি নিয়ে আত্মসমালোচনার আহ্বান জানিয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, আজকে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে আবরারকে সম্মান করতে চাই, তার শাহাদাতকে সত্যিকার অর্থে সম্মান জানাতে চাই, আমাদের আত্মসমালোচনা করতে হবে—কোথায় আমরা ভুল করেছি।

ফরহাদ মজহার বলেন, আবরার ফাহাদের ইস্যুটা আপনারা যেভাবেই আলোচনা করেছেন, এখানে কিছুটা ঘাটতি আছে বড় ধরনের। ঘাটতি হলো—আবরার ফাহাদের বিষয়টি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ। এটা সঠিক, এতে কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু ব্যাপার তো শুধু মতপ্রকাশের ব্যাপার ছিল না।

আবরার হত্যার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নির্যাতন ও ‘টর্চার সেল’-এর বাস্তবতাও সামনে এসেছিল বলে মন্তব্য করেন ফরহাদ মজহার। তার মতে, ফ্যাসিবাদকে বোঝার ক্ষেত্রে এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।

তরুণদের উদ্দেশে ফরহাদ মজহার বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের বিষয়টি বুঝতে আরও পড়াশোনা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আপনাদের রাস্তার শক্তি, সাংগঠনিক শক্তি অসাধারণ, কিন্তু দয়া করে একটু পড়াশোনা করেন।

গণঅভ্যুত্থানের পরও দেশে শেখ হাসিনার সংবিধান ও রাষ্ট্রকাঠামো বহাল রয়েছে মন্তব্য করে হাসিনাহীন হাসিনা ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে মুক্ত থাকা যাবে—এমন ধারণাকে সরলীকৃত বলে মন্তব্য করেন ফরহাদ মজহার। গণঅভ্যুত্থানের অর্জনকে অর্থবহ করতে রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মাহফুজ আলম বলেন, বাংলাদেশে আমরা যখন শেখ হাসিনার আমলে আবরার ফাহাদের শাহাদাতের ঘটনা দেখেছি, তখন আমাদের অবস্থান ছিল—বাংলাদেশকে ভেতর থেকে স্বাধীন করতে হবে। আজও একই প্রশ্ন আমাদের সামনে আছে। ভারতের দিক থেকে উপনিবেশ ও সম্প্রসারণবাদের বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে জনগণের রাজনৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতার মধ্যেও যদি উপনিবেশের প্রতি আকাঙ্ক্ষা বা এক ধরনের আত্মীয়তা থেকে যায়, তাহলে বাইরে থেকে কাউকে দেশকে উপনিবেশ বানানোর প্রয়োজন হয় না।

তিনি বলেন, শহীদ আবরার ফাহাদ আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল এই বিচারগুলোর জন্য। আমরা মনে করি, শহীদ আবরার ফাহাদের বিচারের সঙ্গে সঙ্গে অন্য যেসব মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকে আমরা মুক্ত হয়েছি, গণতন্ত্রের ধারায় ফিরে আসতে পারছি, তাদেরও আমরা স্মরণ করব। আমাদের লড়াইটা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটা পর্ব পার হয়েছে। সামনে আমাদের লড়াই হচ্ছে আট স্তম্ভের যে কথাগুলো ছিল—সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন, জাতীয় সম্পদ রক্ষার প্রশ্ন ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আবরার ফাহাদ আমাদের কাছে জাতীয় মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। আবরার ফাহাদ জাতীয় স্বার্থের পক্ষে, বাংলাদেশ যেন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা পায় সেজন্য লেখালেখি করেছিলেন। আমরা যে দাস নই, এটা আবরার ফাহাদ দেখিয়েছিলেন। বাংলাদেশের নদীর পানি যেন আমরা পাই সেটাই আবরার ফাহাদের চেতনা। আবরার ফাহাদের শাহাদাতকালে আমরা ‘দিল্লি না ঢাকা’ স্লোগান দিয়েছিলাম। আমরা বলেছিলাম, দিল্লির আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ তথা যে সার্বভৌমত্ব, সেটি আমরা অক্ষুণ্ন রাখব। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের রায় অবিলম্বে সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পাদন করে কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।

আখতার হোসেন বলেন, সাহস করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের পক্ষে কথা বলার কারণে আবরার ফাহাদকে রাতভর নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। তারই প্রতিবাদে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পাসে এবং রাজপথে লাখো মানুষ নেমে এসেছিলেন আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে। আমরা বিচার শুরু হতে দেখেছি, কিন্তু এখনো পর্যন্ত সে বিচার সমাপ্ত হতে দেখি নাই। আমরা আজকের এই স্মরণসভা থেকে সরকারের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানাব—অতি দ্রুত আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যকর করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন