ধর্ষণ ও জোর করে ভ্রূণ নষ্টের অভিযোগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রশিবিরের বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা জিসান প্রধানকে নিয়ে জাতীয় সংসদে উত্তাপ ছড়িয়েছে।
রোববার জাতীয় সংসদে পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ ও শিবির নেতা জিসান মিয়া প্রধানকে নিয়ে ৩০০ বিধিতে দুটি বিবৃতি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। ৩০০ বিধিতে একটি বিবৃতি দেওয়ার নিয়ম থাকলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুটি বিবৃতি দেওয়া এবং জিসান প্রধানের বিষয়টি বিচারাধীন অবস্থায় সংসদে তোলায় প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। তিনি ওই বক্তব্য এক্সপাঞ্জ (প্রত্যাহার) চান। এ সময় সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে হৈ-চৈ করতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একপর্যায়ে রুলিং দেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে রোববার সংসদ অধিবেশনে পুলিশের সাবেক আইজি বেনজির আহমদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়ার জন্য দাঁড়ান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। ওই বিবৃতি শেষ হওয়ার পর তিনি আরেকটি বিবৃতি দেওয়ার জন্য স্পিকারের অনুমোদন চান। জবাবে স্পিকার বলেন, যদি আরেকটা এরকম গ্রেট নিউজ থাকে তাহলে অফকোর্স অ্যালাউড।
এ সময়ে কোনো রাজনৈতিক দলের নাম উল্লেখ না করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটা বিষয়ে কিছু ক্লেইম করা হয়েছে সেজন্য বিবৃতি দিচ্ছি। এরপর তিনি জিসান মিয়ার প্রধানের গ্রেফতারের বিষয় তুলে ধরে বলেন, পাঁচ ছয় মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে জনৈক একজন নারীর সাথে মোহাম্মদ জিসান মিয়া প্রধানের পরিচয়ের সূত্র ধরে তাদের মধ্যে মোবাইল ফোনে কথাবার্তা শুরু হয় এবং প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কুমিল্লা জেলা পুলিশের তথ্যমতে, বিভিন্ন সময়ে জিসান মিয়া মেয়েটিকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করলে মেয়েটি অন্তঃসত্তা হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে জিসান মিয়া প্রধান ভিকটিম মেয়েটিকে জোরপূর্বক ভ্রূণ নষ্ট করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে এবং ভ্রূণ নষ্ট না করলে ভিকটিমকে মেরে ফেলার হুমকি প্রদান করে। তার এক পর্যায়ে ভিকটিম মেয়েটি জীবনের ভয়ে বাচ্চা নষ্ট করতে রাজি হয়। জিসান মিয়া প্রধান তার পূর্ব পরিচিত ও ঘনিষ্ঠ সিকান্দর আলীর ওষুধের দোকান হতে ভ্রূণ নষ্ট করার ট্যাবলেট কিনে ভিক্টিম মেয়েটিকে খাওয়ায়। ভ্রূণ নষ্ট হওয়ায় ওষুধ সেবানোর ফলে ভিক্টিমের প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ শুরু হলে ভিকটিম নিজেই জিসানকে বিষয়টি জানায়। তখন জিসান পুনরায় একই ফার্মসি থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে ভিক্টিমের বাড়িতে পৌঁছে দেয়। ওষুধের পর রক্তক্ষরণ বন্ধ হলে ভিক্টিম জিশানকে বিয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ে জিশান ১২ জুন বিয়ে করতে সম্মতি জ্ঞাপন করে। ১১ জুন রাত সাড়ে ৮টায় বিয়ে না করার টালবাহানায় জিসান নিজেই আত্মগোপন করে।
জিসান প্রধানকে গ্রেপ্তার ও মামলার বিবরণ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে অনেকেই ভেরিফাইড ফেসবুক পেইজে তার নিখোঁজের বিষয়টি অন্যভাবে বর্ণনা করে সরকারকে দায়ী করতে চেয়েছিল। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের পরে সেটা আমরা মনে করলাম এই ঘটনা জাতির সামনে প্রকাশ করা দরকার। তাই আমি এই মহান জাতীয় সংসদের মাধ্যমে এটা প্রকাশ করলাম।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পরই হাত তোলেন বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের ঘটনা পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুটি বিবৃতি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ সময় স্পিকার বলেন, ৩০০ বিধি নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যায় না। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হৈ চৈ করতে থাকেন। স্পিকার তখন বিরোধী দলীয় উপনেতাকে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান।
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরবর্তী পর্যায়ে যে সাবজেক্টটা বলেছে আপনার এটা এলাও করা উচিত হয়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরবর্তী পর্যায়ে কোন একটি দলকে লক্ষ্য করে একটি বিতর্কিত বিষয়ে পার্লামেন্টে এভাবে বক্তব্য রাখা বোধহয় বাংলাদেশের পার্লামেন্ট ইতিহাসে এই প্রথম। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি দলকে কনডেম করার জন্যে ইনটেনশনালি এটা এখানে উপস্থাপন করেছেন। আমি জানতে চাচ্ছি, জিসান এখন কোথায় আছে? কুমিল্লার পুলিশ জিসানের সঙ্গে কারো কথা বলতে এমনকি সাংবাদিক কথা বলতে দিচ্ছে না। যে মেয়েটার কথা বলা হয়েছে ওই মেয়েটার সঙ্গেও কাউকে কথা বলতে দেওয়া হচ্ছে না। তাহলে এটা কেন এখানে (সংসদে)? কি কোন প্লট তৈরি হচ্ছে? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যটা মনে হচ্ছে যে উনারা একটা প্লট তৈরি করার জন্যই পুলিশ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একই লাইনে আলোচনা করে এই কাজটি করছে। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানান। এ সময় সরকার ও বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্য দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিতে চান।
এ পর্যায়ে স্পিকার বলেন, এটা আমাদের দেশের সর্বোচ্চ জায়গা। আমরা সবাই দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিবো। আমরা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখব যদি সংসদীয় রীতিনীতির বাইরে কিছু হয়ে থাকে সেটা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সবাই দয়া করে বসেন। আমরা দিনের কার্যসূচিতে যাচ্ছি। পরে দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের সম্পূরক বাজেট সম্পর্কে আলোচনা শুরু হয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


