শিপইয়ার্ডে দুই ভাইয়ের ১৭ বছরের কর্মজীবন মৃত্যুও একসঙ্গে

শিপইয়ার্ডে দুই ভাইয়ের ১৭ বছরের কর্মজীবন
মৃত্যুও একসঙ্গে

ছোটবেলা থেকেই বাবার আদেশের বাইরে যাননি দুই ভাই মো. মনছুর আলী ও নাছির উদ্দিন। বাবার কথাই যেন তাদের কাছে আইন। সংসারে দারিদ্র্য নিত্য সঙ্গী হলেও অভাব-অনটনের দিনগুলো পার করেছেন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে। কখনো বড় ভাই চাল আনলে, ছোট ভাই আনতেন ডিম, ডাল। এভাবেই যাচ্ছিল তাদের সংসার। দুজনের চাকরিও একই প্রতিষ্ঠানে একটানা ১৭ বছর ধরে। শিপইয়ার্ডের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ দেড় যুগ ধরে করছেন একসঙ্গে। সেই কর্মস্থলেই দুর্ঘটনায় একসঙ্গেই হলো তাদের জীবনাবসান।

বিজ্ঞাপন

শুক্রবার সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের সমুদ্র উপকূলে অবস্থিত ফেরদৌস স্টিল শিপইয়ার্ডে ভয়াবহ গ্যাস লিকেজের দুর্ঘটনায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে দুজন হলেন আপন দুই ভাই মনছুর ও নাছির। হঠাৎ তাদের মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, পুরো ভাটিয়ারী গ্রামে এখন শোকের ছায়া। বাড়ির উঠানে শোকের মাতম করছেন স্বজনরা।

বাবাকে হারিয়ে মনছুর ও নাছিরের মেয়েরা পাগলপ্রায়। তাদের স্ত্রীও মূর্ছা যাচ্ছেন বারবার। বৃদ্ধ সেকান্দর আলীও বাকরুদ্ধ দুই সন্তানকে একইসঙ্গে হারিয়ে।

মনছুরের বড় মেয়ে রূপা আক্তার বলেন, ‘চাচাতো বোনসহ আমরা তিন বোন। আমাদের কোনো ভাই নেই। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন বাবা ও চাচা। এখন আমরা কীভাবে চলব, বুঝতে পারছি না।’

মনছুরের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, মনছুর ও নাছির এলাকায় ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। ১৭ বছর ধরে তারা একইসঙ্গে শিপইয়ার্ডে কাজ করছিলেন। তবে সংসারে অভাব-অনটন লেগেই ছিল। অর্থের অভাবে মেয়েদেরও পড়াশোনা করাতে পারছিলেন না তারা। স্বল্প বেতনে শিপইয়ার্ডের চাকরি দিয়েই তাদের সংসার চলত। একসঙ্গে দুই চাচাতো ভাইয়ের কবর খুঁড়তে হবে কখনো ভাবিনি।

বৃদ্ধ সেকান্দর আলী বলেন, গত বৃহস্পতিবারও দুই ছেলেকে নিয়ে একসঙ্গে দুপুরের ভাত খেয়েছি। সেটাই যে শেষ খাওয়া হবে ভাবিনি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তড়িঘড়ি করে জাহাজটি কাটা শেষ করতে ছুটির দিনেও শ্রমিকদের রেহাই দিচ্ছিল না প্রতিষ্ঠানটি। শুক্রবার মনছুর ও নাছিরকে জোরপূর্বক কাজে নেওয়া হয়। কাজে না গেলে তাদের চাকরি থেকে বরখাস্তের হুমকি দেওয়া হয়। ফলে সকাল সাতটায় তারা কাজে চলে যান। সূর্যের তাপ বাড়ার আগেই সমুদ্রের কাদা পানিতে নেমে জাহাজ কাটিং শুরু করতে হয় তাদের। কিন্তু জাহাজের ভেতরে থাকা কয়েকটি ট্যাংকে জমে ছিল বিষাক্ত গ্যাস। গ্যাস দিয়ে লোহা কাটার সময় সেই জমে থাকা গ্যাস লিকেজ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ইয়ার্ডে। এতে ঘটনাস্থলেই মনছুর ও নাছিরসহ সাতজনের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে মারা যান আরো দুজন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন।

এমই

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন