আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জাতীয় সংসদে বাড়ছে না নারীর প্রতিনিধিত্ব

এমরানা আহমেদ

জাতীয় সংসদে বাড়ছে না নারীর প্রতিনিধিত্ব

সদ্য অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া দুই হাজার ২৮ প্রার্থীর মধ্যে নারী ছিল ৮৫ জন, যা মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশের মতো। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ৮৫ নারীর মধ্যে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মাত্র সাতজন। অর্থাৎ বর্তমানে সংসদে নির্বাচিত নারী সদস্য দুই শতাংশের সামান্য বেশি।

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত ৫০টি আসনে নির্বাচন সম্পন্ন হলে সংসদে নারী সদস্য দাঁড়াবে ৫৭ জন। অর্থাৎ সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব হবে ১৬ শতাংশ। বিগত ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় নির্বাচনের চিত্রও ছিল একই রকমের। গত দেড় দশকে নারী প্রতিনিধি বাড়াতে নির্বাচন কমিশনের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত হারে সংসদে নারী নেতৃত্ব বাড়েনি। বিশেষ করে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারীর সংখ্যা বরাবরই এক অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। এমনই পরিস্থিতিতে আজ ৮ মার্চ রোববার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নারী দিবসে এবারের বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য ‘পারস্পরিক সংহতি ও নেতৃত্বে বিনিয়োগ’ এবং জাতীয় প্রতিপাদ্য ‘আজকের পদক্ষেপ, আগামীর ন্যায়বিচার, সুরক্ষিত হোক নারী ও কন্যার অধিকার’। দিবসটি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাণী দিয়েছেন।

জাতীয় সংসদের নারী আসনে নির্বাচনের আইন অনুযায়ী, নির্বাচনে প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত নারী আসনের কোটা নির্ধারণ হয়। এ হিসাবে এবারের সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি ৩৫টির মতো নারী আসন পাবে। জোটভুক্ত দল যুক্ত হলে তাদের আসন আরেকটি বাড়তে পারে। আর জামায়াতে ইসলামী ৬৮ আসনের বিপরীতে ১১ জন নারী প্রতিনিধি পাবে। এছাড়া এনসিপি একটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা একজন করে নারী প্রতিনিধি দিতে পারবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সাত নারী হলেনÑমানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির আফরোজা খানম রিতা, ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপির ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, সিলেট-২ আসনে তাহসিনা রুশদীর লুনা, নাটোর-১ আসনে বিএনপির ফারজানা শারমিন, ফরিদপুর-২ আসনে বিএনপির শামা ওবায়েদ ইসলাম, ফরিদপুর-৩ আসনে বিএনপির চৌধুরী নায়াব ইউসুফ আহমেদ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা। নির্বাচিত এ সাত নারীর মধ্যে তিনজন সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন।

কোন সংসদে কত নারী ছিলেন

নির্বাচন কমিশন, খান ফাউন্ডেশনের গবেষণা প্রতিবেদন ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের নিউজ লেটারসহ বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৩-১৯৭৫ মেয়াদের প্রথম জাতীয় সংসদে ১৫টি সংরক্ষিত আসনের প্রতিনিধিরাই ছিলেন সংসদের নারী প্রতিনিধিত্ব। ১৯৭৯-১৯৮২ মেয়াদে দ্বিতীয় সংসদে দুজন নির্বাচিত এবং ৩০টি নারী আসন মিলিয়ে ৩২ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৮৮-৯০ মেয়াদে চতুর্থ সংসদে সংরক্ষিত আসন ছিল না। ওই সংসদে চারজন নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৯১-১৯৯৫ মেয়াদে পঞ্চম সংসদে পাঁচজন নির্বাচিতসহ ৩৫ জন নারী সংসদ সদস্য ছিলেন। ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত ৭ম সংসদ নির্বাচনে সরাসরি নির্বাচিত হন আট নারী, নারী প্রতিনিধি ছিলেন ৩৮ জন। অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে সাতটি আসনে সরাসরি ও ৪৫টি সংরক্ষিত আসনসহ ৫২ জন নারী সংসদ সদস্য হন। নবম জাতীয় সংসদে ২১ জন নারী সরাসরি নির্বাচিত হন। এরপর সংরক্ষিত নারী আসন বাড়িয়ে ৫০টি করা হয়। এতে নারী সংসদ সদস্য হন ৭১ জন। আওয়ামী লীগের আমলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ছিল একতরফা, বিতর্কিত। এ তিনটি নির্বাচনে যথাক্রমে—১৮, ২৩ ও ১৯ জন নারী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির আমার দেশকে বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের সবস্তরে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এখন কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি গণতান্ত্রিক অপরিহার্যতা। অথচ সর্বশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে আসা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার জন্য এক সতর্কবার্তা। নির্বাচনি ব্যবস্থায় কাঠামোগত বাধা, ক্রমবর্ধমান লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও সাইবার বুলিং নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্বকে রুদ্ধ করছে। নারী প্রার্থীরাই এ দেশের সবচেয়ে সাহসী মানুষ। জয়ের সংখ্যার চেয়েও বড় বিষয় হলো এ নারীরা প্রতিকূল পরিবেশের মাঝেও একটি নতুন পথ তৈরি করেছেন। তবে আমরা শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি দেখতে চাই না, একটি প্রভাবশালী পরিবর্তন চাই।

সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ও নারীগ্রন্থ প্রবর্তনার নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার আমার দেশকে বলেন, সাধারণত ৩০০ আসনে রাজনৈতিক দলগু্লো কমপক্ষে ৫ শতাংশ মনোনয়ন দানে যে বিধান, তা নির্বাচন কমিশন রক্ষা করে চলে না। এ ব্যত্যয় সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন কোনো দলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আরপিও ভঙ্গের দায়ে যে ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশন নিতে বাধ্য, সেটা করতে তারা ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে, এটা না করলেও কোনো অসুবিধা নেই। এটা নারীকে জাতীয় সংসদে উপস্থিতির ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। অনেক রাজনৈতিক দল নারীদের কেবল প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করে। তৃণমূল পর্যায়ে নারীকর্মীরা সক্রিয় থাকলেও মনোনয়নের সময় পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো আবার পুরুষদেরই বেছে নেয়। এছাড়া সংরক্ষিত আসনের নারীরা সরাসরি নির্বাচিত না হওয়ায় তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা খর্ব হয় এবং দায়বদ্ধতাও জনগণের চেয়ে দলের প্রতি বেশি থাকে। অন্য আরেকটি বড় বাধা হচ্ছে সংরক্ষিত ৫০টি আসনে রাজনৈতিক দলগুলোকে মনোনয়নের সুযোগ দেওয়া এবং নারীকে সরাসরি নির্বাচিত হতে না দেওয়া। ফলে রাজনৈতিক দল তার দলীয় নারীনেত্রীদের এ কথা বলে সান্ত্বনা দেয়, তারা সংরক্ষিত আসনে তাদের নিয়ে আসবে। এটা নারীনেত্রীদের প্রতি চরম অপমান। সঠিকভাবে সংসদে নারীদের উপস্থিতি দেশে নারীদের অবস্থান উন্নত করার জন্য জোরালো ভূমিকা রাখতে পারবে। বর্তমান সরকারের সময়ে যারা সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের আমি অভিনন্দন জানাই। সেই সঙ্গে আমি মনে করি, মন্ত্রণালয় বণ্টনের ক্ষেত্রে একটা বৈষম্য করা হয়েছে। নির্বাচিত আরো কিছু নারীকে মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রীর পদ দেওয়া যেত।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী হিসেবে অংশ নেওয়া গণসংহতির তাসলিমা আখতার আমার দেশকে বলেন, নির্বাচনে অংশ নিয়েছি আন্দোলনের অংশ হিসেবে। আমার কাছে মনে হয়েছিল, জুলাই-পরবর্তী সময়ে জুলাই সনদ ও সংস্কার কমিশনে নারীদের সরাসরি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের গুরুত্বে বিষয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। নারী কমিশন ৩০০ আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিষয়ে বলে, অন্তত ১০০ আসনে যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। পরে এটি ৩৩ শতাংশ রাখার বিষয়ে বলা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি ৫ শতাংশে এসে দাঁড়ায়। এরপর বাস্তবে দেখা যায়, নারীর অংশগ্রহণ দাঁড়ায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশে। এটি উদ্বেগের বিষয়। কারণ গণঅভ্যুত্থানে আমরা নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখেছি, কিন্তু সে নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়, ঘরের বাইরে গিয়ে সংসদে দেখতে চাইলাম, কিন্তু তা করা হয়নি।

তিনি আরো বলেন, নারীর চেয়ে পুরুষ প্রার্থী অনেক বেশি সংখ্যক মনোনয়ন পেয়েছেন, সে তুলনায় ১৫ শতাংশ জয়ী হন। ফলে নারীরা খারাপ করেছেন, এটা বলার সুযোগ নেই। বেশিসংখ্যক মনোনয়ন দিয়ে যদি দীর্ঘদিন ধরে নারীদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করা হতো, তাহলে বেশিসংখ্যক নারী জয়ী হয়ে আসতেন।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে বড় সুযোগ তৈরি হলো, মাঠপর্যায় থেকে নারী নেতৃত্ব তুলে আনা ও নির্বাচনের জন্য আগে থেকে এলাকায় পরিচিত করাসহ আগামী নির্বাচনে নারীদের প্রার্থী হিসেবে প্রস্তুত করতে জোর দিতে হবে।

আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবস

প্রতি বছরের মতো এবারও আজ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী-পুরুষের সমতার লক্ষ্যেই ও নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনেই প্রতি বছর এ দিবস পালিত হয়ে আসছে। ১৮৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নারীশ্রমিকদের হাত ধরেই সূচনা ঘটে নারী দিবসের। নারীর ক্ষমতায়ন ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় কয়েকজন সাহসী নারী এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। প্রায় ১৫ হাজার নারী সেদিন নিউইয়র্ক সিটির রাস্তায় নেমেছিলেন। নারীর অধিকার রক্ষার আন্দোলন করেছিলেন তারা।

প্রধানমন্ত্রীর বাণী

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে নারী-পুরুষ সবাই সমান অধিকার ভোগ করবে। সম্মান ও মর্যাদা এবং নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজে কাজ করবে। তিনি বলেন, নারীদের রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতির মূলধারার বাইরে রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বিশেষ করে, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত না হলে ঘরে বাইরে সামগ্রিক উন্নয়নের সুফল সম্ভব নয়।

তিনি আরো বলেন, নারীর আর্থসামাজিক ক্ষমতায়নে দেশনেত্রী মরহুম খালেদা জিয়া দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা চালু করেছিলেন। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত। একই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করেছে।

আমাদের লক্ষ্য হলো, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা চালু করা, উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, মেয়েদের জন্য ফ্রি স্কুল ইউনিফর্ম, ডিজিটাল লার্নিং সুবিধা এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা। সরকার নারীর নিরাপত্তা বিধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাইবার বুলিং এবং অনলাইনে নারীর বিরুদ্ধে হয়রানি বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...