বিগত ১৫ বছরে দেখা গেছে, ঈদ আসলেই সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অন্ত ছিল না। একদিকে ঈদে ঘরমুখো মানুষের রাস্তায় ভোগান্তি, অন্যদিকে বাজারে হু হু করে বেড়ে যেত সব ধরনের পণ্যের দাম। জুলাই বিপ্লবে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে সেই চিত্র আর নেই। ঈদুল ফিতরের পর এবার ঈদুল আজহায় সর্বত্রই মানুষের মধ্যে স্বস্তি বিরাজ করছে।
বাজারে নেই সিন্ডিকেটের দাপট। বিগত বছরগুলোর তুলনায় অধিকাংশ নিত্যপণ্যের দাম কমেছে। এমনকি কোরবানির হাটেও দুর্নীতিবাজদের দাপট নেই। সাধারণ মানুষ কোরবানির পশুও কেনাবেচা করছেন নিরাপদে।
আগের বছর কোরবানি ঈদের ঠিক আগের কয়েকদিনে খুচরায় প্রতি কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকায়। এবছর ঠিক কোরবানি ঈদের আগমুহূর্তে গতকাল বৃহস্পতিবার বাজারে কাঁচামরিচ বিক্রি হয়েছে কেজিতে ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। সে হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কাঁচামরিচের দাম কমেছে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। শুধু কাঁচামরিচ নয়, এমনিভাবে গত বছরের তুলনায় এবার আলু, পেঁয়াজ, মুরগির মাংস, ডিম, চিনি, শাকসবজি-তরিতরকারি ও মসলাসহ অধিকাংশ পণ্যের দাম কমেছে।
দ্রব্যমূল্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত বছর ১৫০ টাকায় বিক্রি হওয়া চিনি কেজিতে ৪০ টাকা কমে এবার ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৮০ টাকার আলু কেজিতে ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কমে ২০ থেকে ২৫ টাকায়, ৯০ টাকার পেঁয়াজ কেজিতে ৪০ টাকা কমে ৫০ থেকে ৫২ টাকায়, ১৯০ থেকে ২০০ টাকার ব্রয়লার মুরগি ৪০ থেকে ৫০ টাকা কমে ১৫০ টাকায় এবং ১৬০ টাকার মুরগির ডিম (লাল) ডজনে ৪০ টাকা কমে ১২০ টাকায় এবং ১৫০ টাকার সাদা ডিম ৪০ টাকা কমে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মাঝখানে মিনিকেট চালের দাম কিছুটা বাড়লেও নতুন চাল বাজারে আসার পর কেজিতে ২০ টাকা কমে বর্তমানে আগের বছরের দামেই চাল বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া শাকসবজি-তরিতরকারিসহ বেশির ভাগ পণ্যের দাম কমেছে। এতে দ্রব্যমূল্যের সরবরাহ ও দামের বিষয়ে ভোক্তাদের মধ্যে একধরনের স্বস্তি বিরাজ করছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের রাসেল মিয়া বলেন, গত বছরের তুলনায় সব ধরনের ডালের দাম কমেছে। এ ছাড়া আটা, চিনি ও মসলার দামও কমেছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সরকার না থাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে এবার বড় বড় কোম্পানির ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করতে পারছেন না।
আগের বছরের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ টাকা কমে ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। লেয়ার মুরগি ৩০০ টাকার বদলে ২৮০ থেকে ২৯০ এবং সোনালি কক ২৮০ টাকার বদলে ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকার গরুর মাংস ৭৩০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে খাসি, ছাগল, দেশি মুরগি ও হাঁসের দাম প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রতি কেজি খাসির মাংস এক হাজার ১৫০ টাকা থেকে এক হাজার ২৫০ টাকা ও ছাগলের মাংস বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ১০০ টাকায়, দেশি মুরগি ৫৫০ এবং হাঁস ৭০০ টাকা কেজি ধরে বিক্রি হচ্ছে।
গত বছরের তুলনায় অধিকাংশ ভোগ্যপণ্যের দাম কমলেও সরু জাতের চাল ও মোটা চালের দামে তেমন হেরফের হয়নি। তবে আটার দাম কমেছে। গত বছর প্যাকেটজাত আটা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং খোলা আটা ৫০ টাকা কেজি ছিল। গত বছরের তুলনায় ১০ টাকা কমে গতকাল সোমবার খোলা আটা ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে এবং প্যাকেটজাত আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।
তবে গত বছরের তুলনায় ভোজ্য তেলের দাম বেড়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের দেওয়া গত বছরের ১৩ জুনের বাজার দরের তালিকায় দেখা যায়, প্রতি লিটার খোলা সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৪১ টাকা, বোতলজাত সয়াবিনে দাম ছিল ১৬৪ টাকা। বর্তমানে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েল ১৬৯ টাকা এবং বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৮৯ টাকা লিটারপ্রতি বিক্রি হচ্ছে।
এদিকে গত বছরের তুলনায় এবার কাঁচা সবজি ও তরিতরকারির দাম ক্রেতার নাগালেই রয়েছে। বরং গত বছরের তুলনায় দাম অনেক কম। গত বছর যেখানে ২০০ টাকা কেজি কাঁচামরিচ বিক্রি হতো, এবার তা ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গাজর ৫০ টাকার স্থলে এবার ২০ থেকে ২৫ টাকা, বেগুন ১০০ টাকার বদলে ৫০ থেকে ৬০ টাকা, ১০০ টাকার টমেটো ৪০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
এর আগে ৫৪ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম রমজান মাসে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ছিল। এর সুফলও ভোগ করেছেন দেশের সাধারণ মানুষ। ওই সময় সরকার বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করায় এমনটি সম্ভব হয়েছিল, মনে করেন ভোক্তা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বাজার সংশ্লিষ্টরা। এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সামনের দিনগুলোতে বাজার দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল রাখতে বেশকিছু উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।
এর মধ্যে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে গড়ে ওঠা বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া, সুনির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির কাছে যাতে দ্রব্যমূল্যের নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি না থাকে, সেজন্য নতুন ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন পণ্য আমদানির অনুমতি দেওয়া, বাজার মনিটরিং, নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় এবং ভোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাসহ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, সরকার সিন্ডিকেটকে সাপোর্ট করে না। সার্বিক বাজার ব্যবস্থা দুর্বৃত্তায়ন থেকে বের হয়ে বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। মাহে রমজানে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, তা সফল হয়েছে। তাই রমজান মাসের মতো কর কিংবা শুল্ক রেয়াত ছাড়া সম্ভাব্য সব এবং নতুন পদক্ষেপ আবারও নেওয়া হচ্ছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা যায়।
কোরবানির পশুর হাটে স্বস্তি
রাজধানীসহ সারাদেশের প্রতিটি কোরবানির পশুর হাট এখন জমজমাট। ক্রেতারা জানিয়েছেন, বিগত বছরগুলোর মতো এবার পশুর হাটে দুর্নীতিবাজ, আমলা ও রাজনীতিবিদদের দাপট নেই। অনেকটাই স্বস্তিতে কোরবানির পশু কেনাকাটা করছেন সাধারণ ক্রেতারা।
তবে বিক্রেতারা বলছেন, দুর্নীতিবাজ, আমলা ও রাজনীতিবিদদের অনুপস্থিতিতে পশুর হাটে এর প্রভাব পড়েছে। এতে এবার বড় গরুর দাম একেবারেই কম বিক্রি হচ্ছে। দামও পড়ে গেছে। ছোট-মাঝারি গরুর তুলনায় বড় গরুর দাম খুবই কম। কেরানিগঞ্জ মডেল টাউনের বাসিন্দা নজিবুল্লাহ বলেন, বর্তমান বাজারে ছোট-মাঝারি গরুর মাংসের দাম পড়বে সাতশো থেকে আটশো টাকা। সেখানে বড় গরুর মাংসের দাম পড়বে চারশো থেকে সাড়ে চারশোর মধ্যে।
এবার বাজারে ছোট গরু ৭৫ থেকে ৯০ হাজার টাকা, মাঝারি গরু এক লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা এবং বড় গরু তিন লাখ থেকে ছয়-সাত লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে শহরের হাটগুলোয় গরুর ওজন অনুসারে বিক্রি হচ্ছে।
ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের মহাসড়কেও স্বস্তি
ঈদুল আজহার টানা ১০ দিনের ছুটি গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে। গত বুধবার শেষ কর্মদিবস ছিল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ অনেকের। ফলে গতকাল সকাল থেকে বাস, ট্রেন ও লঞ্চে ঘরমুখী মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকে নাড়ির টানে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হওয়ায় স্টেশনগুলোতে যাত্রীদের চাপ বেড়ে যায়।
ঈদের বিশেষ বাস, ট্রেন ও লঞ্চ সেবা শুরু হওয়ায় খুব একটা ঝক্কিঝামেলায় পড়তে হচ্ছে না যাত্রীদের। সড়ক-মহাসড়কেও দীর্ঘ যানজট নেই। ট্রেনের টিকিট নিয়েও হাহাকার দেখা যায়নি। নেই অন্যবারের মতো শিডিউল বিপর্যয়। ফলে স্বস্তিতে প্রিয়জনদের কাছে যেতে পারছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। এর আগে টানা ১০ দিনের এমন দীর্ঘ ঈদের ছুটি দেখা যায়নি। ফলে এবার এই ছুটিতে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে অনেকেই গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

