ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা পূরণে জাপানকে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা পূরণে জাপানকে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানির চাহিদা পূরণে জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বাংলাদেশে শিল্পকারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলা, মহাকাশ প্রযুক্তিতে সহযোগিতা এবং ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়াল সড়ক ও উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক নির্মাণে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

বুধবার টোকিওতে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং জাপান–বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের যৌথ আয়োজনে ‘বাংলাদেশ–জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। জেট্রোর প্রধান কার্যালয়ে এ বিনিয়োগ ফোরাম অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন বিনিয়োগকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। বাংলাদেশের উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান আমাদের পাশে ছিল। এখন আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি, আমাদের সঙ্গে মিলে শিল্পকারখানা গড়ে তুলুন, নতুন সুযোগ সৃষ্টি করুন এবং বাংলাদেশের সঙ্গে এগিয়ে চলুন।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য সুস্পষ্ট। আসুন, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে পরিণত করি। আমাদের জনগণ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পারস্পরিক সুযোগ সৃষ্টি করি এবং আমাদের দুই মহান দেশের জন্য সমৃদ্ধি নিশ্চিত করি।’

তিন খাতে বিনিয়োগের আহ্বান

বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করলে জাপানি বিনিয়োগকারীরা একটি বড় ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ ও সুবিধা কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন।

তিনি জানান, জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, বৃহৎ খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত জাপানিজ ইকোনমিক জোনে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।

ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য জাপানি কোম্পানিগুলোকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তারেক রহমান। খাতগুলো হলো—জ্বালানি, প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতা এবং পরিবহন অবকাঠামো।

জ্বালানি নিরাপত্তায় সহযোগিতার জোর

জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অপরিহার্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়; বরং এটি একান্ত প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানির চাহিদা পূরণে জাপানি কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসার এবং জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

প্রযুক্তি পার্ক ও মহাকাশ সহযোগিতা

প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ–জাপান সহযোগিতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, জাপানি কোম্পানি, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ততায় বাংলাদেশ–জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে সরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে কেন্দ্র করে উদ্ভাবনভিত্তিক একটি প্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলা হবে।

মহাকাশ প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ তার মহাকাশ সক্ষমতা জোরদার করতে আগ্রহী। মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের উন্নত সক্ষমতা এবং ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ কারণে এ খাতে জাপানের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট সহযোগিতার সুযোগ খতিয়ে দেখতে চায় বাংলাদেশ।

৬ বিভাগীয় শহর যুক্ত হবে উড়াল সড়ক ও উচ্চগতির রেলে

যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্য শহর ও গ্রামের মধ্যে এবং কারখানা ও বন্দরের মধ্যে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকার এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যা মানুষকে নতুন সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করবে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহন আরও কার্যকর করবে।

এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়াল সড়ক ও উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।

তারেক রহমান বলেন, অবকাঠামো উন্নয়নে জাপান বিশ্বজুড়ে সুনাম অর্জন করেছে। তাই দেশব্যাপী উড়াল সড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে জাপানের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে সম্ভাবনাময় প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেও জাপানের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানানো হবে।

বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সরকারের উদ্যোগ

বাংলাদেশে ব্যবসা ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলো তিনটি প্রধান উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। এগুলো হলো—নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং শুল্ক ছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতা।

তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের উদ্বেগের কথা শুনেছি। এরই মধ্যে কিছু সমস্যার সমাধান করেছি। বাকি বিষয়গুলো সমাধানেও আমরা জোরালোভাবে কাজ করছি।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ব্যবসা পরিচালনার জন্য নিশ্চিততা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থা প্রয়োজন। এ দুটি নিশ্চিত করার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব।

শিক্ষার্থী ও ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব

বাংলাদেশ–জাপান অংশীদারত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে জনগণের মধ্যে সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য জাপানে আসেন এবং মূল্যবান দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেশে ফিরে তাঁরা জাপানের দূত হিসেবে কাজ করেন এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। তিনি এমন একটি ভবিষ্যৎ দেখতে চান, যখন বাংলাদেশের লাখ লাখ তরুণ জাপানি ভাষা শিখবেন ও বলতে পারবেন এবং বাংলাদেশ–জাপান সম্পর্ক আরও গভীর করতে অবদান রাখবেন।

শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্প্রতি স্বাক্ষরিত অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, ইস্পাত, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক উপাদানসহ জাপানের বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে।

অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বক্তব্য দেন। জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রেসিডেন্ট কাতাওকা সুসুমু অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন