নাগরিকের ব্যক্তিগত বেচাকেনার গুরুতর অভিযোগে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)’র চার পুলিশ কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
গ্রেপ্তার চারজন হলেন—ডেমরা থানার কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ, কনস্টেবল মাসুম মিয়া, ওয়ারী থানার কনস্টেবল নিজাম উদ্দীন এবং তুরাগ থানার কনস্টেবল মো. জিহাদ মিয়া। গত ২৯ সেপ্টেম্বর তাদের বিরুদ্ধে রমনা থানায় মামলা করেন ডিবির এসআই আবিদুর রহমান।
মামলায় অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করছে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ। বলা হচ্ছে, থানার সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে ভুয়া জিডি ও মামলার সূত্র দেখিয়ে সংগ্রহ করা হয়েছে মানুষের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), এনআইডিসহ নানা গোপন তথ্য। পরে এসব তথ্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম গ্রুপে।
বুধবার রাতে আমার দেশ’কে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার (সাইবার) অতিরিক্ত ডিআইজি হারুনুর রশিদ। মামলা হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তাধীন থাকায় বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি হননি তিনি।
জানা গেছে, ডিবির সাইবার মনিটরিংয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রথমে বিষয়টি ধরা পড়ে। ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্ট, হোয়াটসঅ্যাপের একটি অ্যাকাউন্ট এবং টেলিগ্রামের একটি গ্রুপে বিভিন্ন মোবাইল নম্বরের সিডিআর বিক্রির প্রচারণা নজরে আসে। অনুসন্ধানে সিডিআর বিক্রির টাকা নেওয়ার একটি বিকাশ নম্বরেরও সন্ধান মেলে। এরপর মোবাইল অপারেটরের তথ্যের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম মিলিয়ে দেখতে গিয়ে তদন্তকারীদের কাছে সরকারি ব্যবস্থার অপব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। অভিযোগের ধরন দেখে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম উত্তর বিভাগ অনুসন্ধান শুরু করে।
তদন্তে তুরাগ থানার একটি সরকারি ই-মেইল ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসে। ওই ই-মেইল থেকে ১১টি মোবাইল নম্বরের তিন মাসের সিডিআর ও এনআইডি-সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হয়েছিল। আবেদনে একটি জিডির নম্বর এবং একজন এএসআইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়। কিন্তু যাচাই করে তদন্তকারীরা দেখেন, উল্লেখ করা জিডিটি থানার নথিতেই নেই। এমনকি যে পুলিশ কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করা হয়েছিল, তিনিও ওই নম্বরগুলোর তথ্য চেয়ে কোনো আবেদন করেননি। এজাহার অনুযায়ী, তুরাগ থানায় কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্ব পালন করা কনস্টেবল জিহাদ মিয়া সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে এই তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ডেমরা থানার ক্ষেত্রেও প্রায় একই পদ্ধতি অনুসরণের অভিযোগ উঠেছে। থানার ওসির সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে চারটি মোবাইল নম্বরের সিডিআর চাওয়া হয়। সেখানে একটি মামলার নম্বর ও এক এসআইয়ের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে তদন্তে দেখা যায়, উল্লেখ করা মামলাটিই থানায় রুজু হয়নি। সংশ্লিষ্ট এসআইও ওই নম্বরগুলোর সিডিআর চাননি। এজাহারে এই তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে কনস্টেবল সাইমন হোসেন রাশেদ ও মাসুম মিয়ার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কনস্টেবল নিজাম উদ্দীনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, ডেমরা থানায় কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে থাকার সময় তিনি সিডিআর সংগ্রহ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্রি করতেন। পরে ওয়ারী থানায় বদলি হওয়ার পরও সরকারি ই-মেইল ব্যবহার করে বিভিন্ন নম্বরের তথ্য সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ও হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য পর্যালোচনা করে সিডিআর আদান-প্রদান এবং অর্থ গ্রহণের আলামত পাওয়ার কথা এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিবির অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, চার পুলিশ সদস্যের কয়েকজন থানায় কম্পিউটার অপারেটরের দায়িত্ব পালন করতেন। ফলে ওসিদের সরকারি ই-মেইল ব্যবহার এবং তথ্য চাওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ ছিল। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চক্রটির আগ্রহ শুধু কলের হিসাবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মোবাইল নম্বরের কললিস্ট, সর্বশেষ অবস্থান, এনআইডি, সিমের মালিকানা, আইএমইআই-সংক্রান্ত তথ্যসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের তথ্য কারও হাতে চলে গেলে একজন ব্যক্তির চলাফেরা, যোগাযোগের পরিধি এবং পরিচয়-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সহজেই অন্যের কাছে চলে যেতে পারে। ফলে ঘটনাটি কেবল অনৈতিক তথ্য বেচাকেনার অভিযোগ নয়; ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্যের গোপনীয়তা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


