স্থায়ীভাবে জাতীয় ভূমি ও কৃষি সংস্কার এবং পরিবেশ সুরক্ষা কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে সাময়িক, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ৩৬টি প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন ১৩টি নাগরিক, সামাজিক ও পরিবেশ সংগঠন।
রোববার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম হলে ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি তুলে ধরেন তারা। সংগঠনগুলো হলো— এএলআরডি, নিজেরা করি, টিআইবি, বেলা, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, ব্লাস্ট, এইচডিআরসি, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, বারসিক, নাগরিক উদ্যোগ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম ও কাপেং ফাউন্ডেশন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, দেশের কৃষিকাজ উন্নয়নে একটি স্থায়ী জাতীয় ভূমি ও কৃষি সংস্কার এবং পরিবেশ সুরক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে।
গঠিত কমিশন সিএস রেকর্ডসহ নির্ভরযোগ্য রেকর্ড অনুযায়ী খাস জমি এবং নগরের অকৃষি খাস জমির পূর্ণাঙ্গ জেলা-উপজেলা, পৌর এলাকা ও মহানগরভিত্তিক তালিকা প্রণয়ন; অবিলম্বে খাস কৃষি জমি গ্রামীণ ভূমিহীন, প্রান্তিক কৃষক, কৃষিজীবী দলিত, সমতলের আদি জাতিগোষ্ঠীর ভূমিহীনদের মধ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বণ্টনের নির্দেশনা জারি করাসহ নারীদের ক্ষেত্রে সক্ষমপুত্র সন্তান থাকার অবৈধ, বৈষম্যমূলক বিধানটি অবিলম্বে বাতিল করতে। এছাড়াও কৃষি জমি সুরক্ষা আইন অবিলম্বে অধ্যাদেশ আকারে জারি করা এবং কৃষি জমি সুরক্ষার কঠোর সুব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
ভূমি জোনিং ব্যবস্থা সুচারু রূপে সম্পন্ন করে নগরায়ন, শিল্পায়ন, আবাসন এবং অন্যান্য প্রয়োজনে নিরিখে অকৃষি জমি শনাক্ত করা এবং একই সাথে দুই/তিন ফসলা কৃষি জমিতে যে কোনো সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প না করা এবং থাকলে তা বাতিল করা, কৃষি জমিতে আবাসন কিংবা ইটের ভাটা অবিলম্বে উচ্ছেদ করা; কৃষি জমি অথবা জলাধারের মধ্যে অনুমোদনবিহীন আবাসান প্রকল্প কিংবা শিল্প স্থাপনার সাইনবোর্ড সম্পূর্ণ অবৈধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা; নগর দরিদ্র বিশেষত বস্তিবাসী দরিদ্রদের নিবন্ধন এবং তাদের ডাটাবেজ প্রণয়নের নির্দেশনা জারি করা, তাদের নগরে অস্থায়ী এবং স্থায়ী আবাসন সুবিধার প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়ারও দাবি জানান তিনি।
তিনি বলেন, ভূমি মামলার জট কমাতে এবং দরিদ্রদের ভূমি বঞ্চনা দূর করে তাদের বিচার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ভূমি ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভূমি সংক্রান্ত আইনের প্রয়োজনীয় সংস্কার, বিশেষত দেওয়ানী কার্যবিধির যুগোপযোগী পরিবর্তন অত্যাবশ্যক। অধিক সংখ্যক মেধাবী বিচারক নিয়োগ এবং তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ জরুরি।
শামসুল হুদা বলেন, ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে দশকের পর দশক বিচারাধীন মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য দেওয়ানী আদালতে ট্রান্সফারের উদ্যোগ নেয়া, এই আইনের সংস্কার এবং অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগ দেয়া জরুরি এবং ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল অধ্যাদেশ জারি করে অবলুপ্ত ঘোষণা করা হলে মানুষ ভোগান্তি থেকে রেহাই পাবে।
ভূমি সংস্কার বোর্ডকে আরো কার্যকর ও গতিশীল করার জন্য ভূমি সংস্কার বোর্ডে ভূমি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক প্রতিনিধিদের মধ্যে যারা অভিজ্ঞ, সদস্য হিসাবে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে পুনর্গঠন করার কথাও বলেন এই বিশেষজ্ঞ।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের উপকূলে বাংলাদেশের দক্ষিণ দিকে যে বিশাল চর জেগে উঠছে, তাকে পরিবেশ ও বিজ্ঞান সম্মতভাবে সুরক্ষা দেয়ার জন্য এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টিম গঠন করা এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন বন্ধুদেশের এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ সংস্থাসমূহের সহযোগিতার জন্য এখনই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। কৃষি এবং সম্প্রসারিত কৃষির (পশু পালন, মৎস্য চাষ, হাঁস মুরগির খামার ইত্যাদি) জন্য দরিদ্র কৃষক, নারী কৃষক, সমবায়ী ও আদি জাতিগোষ্ঠীর কৃষকদের বিশেষ সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে জাতীয় কৃষি ঋণ নীতিমালায় বিশেষ বিধান নিশ্চিত করতে হবে।
শামসুল হুদা বলেন, ছোট কৃষক, বর্গা কৃষক মৎস্য চাষি কিংবা পশু পালনে নিয়োজিত খামারিদের সমবায়ে উৎসাহিত করতে বিশেষ প্রণোদনা, ঋণ সুবিধা এবং কৃষি বাজারে অভিগম্যতা নিশ্চিত করতে নীতিমালা প্রণয়ন করা এবং তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
বিদ্যমান সমবায় আইনটির আমূল সংস্কার বা পরিবর্তন জরুরি জানিয়ে তিনি আরো বলেন, জাতীয় বাজেটে দরিদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, কৃষিজীবী, আদি জাতিগোষ্ঠীর (সমতল ও পাহাড়ে) মানুষকে এবং নারী কৃষকদের ও ভূমিহীনদের প্রণোদনা দিতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেয়া এবং খাত বা উপখাত হিসাবে তা নির্দিষ্ট করে দিতে হবে।
এছাড়াও লিখিত বক্তব্যে তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য করণীয় ও মধ্য-দীর্ঘমেয়াদী নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। যার মধ্য দিয়ে জাতীয় ভূমি ও কৃষি সংস্কারের পরিবেশ সুরক্ষা কমিশনকে একটি স্থায়ী ও স্বাধীন কমিশন হিসাবে সুপ্রতিষ্ঠিত ও শক্তিশালী করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বক্তব্য রাখেন, এএলআরডির চেয়ারপারসন তুষি কবির, নাগরিক উদ্যোগের পরিচালক জাকির হোসেন, বেলা পরিচালক তাসনিম ইসলাম, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিন্দ্র কুমার নাথ প্রমুখ।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

