বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশের স্টিল শিল্প অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)।
সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি টন রড উৎপাদনে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৭৮৫ টাকা, যা আনুষঙ্গিক অন্যান্য খরচ যোগ হলে তিন হাজার ৫৬০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের বর্ধিত ট্যারিফ অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন স্টিল শিল্প মালিকরা
সোমবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএর পক্ষ থেকে এ দাবি জানানো হয়। এতে সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের নতুন ট্যারিফ কার্যকর হওয়ায় প্রতি মেট্রিক টন রড উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার ৭৮৫ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। এর সঙ্গে ভ্যাট, বন্দর মাশুল, জ্বালানি ও পরিবহন খরচসহ বিভিন্ন উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব যুক্ত হলে বাড়তি ব্যয় প্রতি টনে প্রায় তিন হাজার ৫৬০ টাকায় পৌঁছাতে পারে।
সংগঠনটির মতে, বর্তমানে বাজার পরিস্থিতির কারণে উৎপাদন ব্যয়ের এই অতিরিক্ত চাপ পুরোপুরি ভোক্তাদের ওপর স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। কারণ দাম বাড়ালে বিক্রি আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে উদ্যোক্তাদেরই ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হবে, যা শিল্পকারখানাগুলোর আর্থিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তুলবে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নির্মাণ খাতে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা, বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া, উচ্চ সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সংকট, ঋণপত্র (এলসি) খোলার জটিলতা, কার্যকর মূলধনের ঘাটতি এবং গ্যাস সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে স্টিল খাত আগে থেকেই নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের বাড়তি মূল্য নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিএসএমএর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০টি আধুনিক স্টিল মিল এবং ১৫০টির বেশি রি-রোলিং মিল রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ মেট্রিক টন। তবে দেশের মোট চাহিদা বছরে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় অধিকাংশ কারখানা তাদের সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করছে।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দেশের বড় স্টিল কারখানাগুলো ৩৩, ১৩২ ও ২৩০ কেভি উচ্চ ভোল্টেজ লাইনের সরাসরি গ্রাহক। তারা নিজস্ব অর্থায়নে সাবস্টেশন, ট্রান্সফরমার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সিস্টেম, সঞ্চালন কিংবা বিতরণজনিত ক্ষতি নেই। এরপরও ডিমান্ড চার্জ, পাওয়ার ফ্যাক্টর চার্জ, ভ্যাট ও অন্যান্য ফি শিল্পখাতের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে উৎপাদিত মোট স্টিলের প্রায় ৬০ শতাংশ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে সরকারি অবকাঠামো নির্মাণের খরচও বৃদ্ধি পাবে। এতে জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিএসএমএর নেতাদের মতে, বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত অদক্ষতা, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং নীতিগত সীমাবদ্ধতার আর্থিক বোঝা উৎপাদনশীল শিল্পের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। এর ফলে শিল্প উৎপাদন কমবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবে, কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব ড. সুমন চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকার বিপুল পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করছে। এসব চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ের বিষয়ে আরও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
স্টিল শিল্পকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পখাত উল্লেখ করে বিএসএমএ জানায়, এক লাখ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগসমৃদ্ধ এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। তাই শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামো উন্নয়নের স্বার্থে বিদ্যুতের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে আগের ট্যারিফ পুনর্বহালের জন্য সরকার ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে বিএসএমএর ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ, সাবেক সভাপতি মানোয়ার হোসেন, ভাইস প্রেসিডেন্ট মারুফ মহসীন ও রেজাউল করিম, জয়েন্ট সেক্রেটারি জাকারিয়া জাকি, কেএসআরএমের উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) আশফাকুল ইসলাম এবং বিএসআরএমের হেড অব মার্কেটিং কাজী আনোয়ার আহমেদসহ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

