২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষা উপলক্ষে কুমিল্লার শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থীদের জন্য খাতা কেনাকাটা ও সরবরাহে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে । কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের দরপত্র (টেন্ডার) প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত মূল্যে খাতা ক্রয় দেখিয়ে নিম্নমানের কাগজ সরবরাহ করা হয়েছে।
দরপত্রে উল্লিখিত স্পেসিফিকেশন বা মান অনুযায়ী খাতা সরবরাহ না করে, কম দামের ও নিম্নমানের কাগজ দিয়ে পরীক্ষার খাতা তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করে নির্দিষ্ট ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং বোর্ড কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের কমিশন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে কয়েকটি পরীক্ষাকেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা যায় ৬৫ গ্রামের খাতার পরিবর্তে পরীক্ষার্থীদের দেওয়া হয়েছে ৫৫ গ্রাম মানের খাতা । কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের কয়েকটি কেন্দ্রের কয়েকজন শিক্ষকের মতামত নেওয়া হলে তারা জানান, অন্যান্যবারের তুলনায় এবার পরীক্ষার খাতার মান খুবই খারাপ ।
দরপত্র অনুযায়ী এইচএসসি পরীক্ষার মূল উত্তরপত্র বা খাতা সাধারণত ৬৫ জিএসএম ঘনত্বের কাগজের হয়ে থাকে। কাগজের পরিমাপের একক হিসেবে জিএসএম বলতে ‘গ্রামস পার স্কোয়ার মিটার’ বোঝায়, শিক্ষা বোর্ডগুলোর নিয়ম অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার প্রতিটি খাতায় পর্যাপ্ত পৃষ্ঠা থাকে, যা দিয়ে শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে তাদের সৃজনশীল ও বহুনির্বাচনি বা রচনামূলক প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে ।
জানা গেছে, এবার এইচএসসি পরীক্ষার খাতা সাপ্লায়ার হিসেবে কাজ পায় ঢাকার গণলিপি নামের একটি প্রতিষ্ঠান, যাদের সঙ্গে কন্ট্রাক ৬৫ গ্রামের খাতা দেওয়ার, কিন্তু তারা ৫২ গ্রামের খাতা দিয়েছে । এতে করে তারা টাকার অঙ্কে ৪৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে ।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সূত্রে জানা গেছে, এ বছর কুমিল্লা বোর্ডে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলার ৪৬৪টি প্রতিষ্ঠানের ৯৪ হাজার ৮০২ জন শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছে। এর মধ্যে মেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ১৯৬ জন এবং ছেলে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৭ হাজার ৬০৬ জন। এ বছরও ছেলে পরীক্ষার তুলনায় মেয়ে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৫৯০ জন বেশি।
এবার এইচএসসি পরীক্ষার খাতা কেনার জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। যে পরিমাণের খাতা দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, তা টাকার মূল্যে দাঁড়ায় ৮০ থেকে ৮৫ লাখ । প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকা বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা হাতিয়ে নিয়েছেন ।
কুমিল্লা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের ক্রয় ও মূল্যায়ন কমিটিতে আছেন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর জাহাঙ্গীর আলম, কুমিল্লার শিক্ষা প্রকৌশলী শাহীনুর ইসলাম, কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের উপপরিচালক মো. শাহজাহান, বোর্ডের সহকারী সচিব আমিনুল ইসলাম, বোর্ডের সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট বিকাশ চন্দ্র মল্লিক ।
এ বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গণলিপির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি ।
কুমিল্লা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রকৌশলী এবং শিক্ষা বোর্ডের ক্রয় ও মূল্যায়ন কমিটির সদস্য শাহিনুর ইসলাম এবং কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সচিব প্রফেসর জাহাঙ্গীর আলমকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠানো হলেও তারা কোনো উত্তর দেয়নি ।
৬৫ গ্রাম জিএসএম খাতা দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ৫২ থেকে ৫৫ গ্রাম জিএসএম খাতা । এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের উপপরিচালক মো. শাহজাহান বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব হলো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে খাতাগুলো বুঝে নেওয়া । বোর্ড থেকে যখন কেন্দ্রে পাঠানো হয়, তখন কী হয় সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা বোর্ডের কলেজ পরিদর্শক মোহাম্মদ শিপন মিয়া আমার দেশকে বলেন, বিষয়টি দেখার দায়িত্ব আমার নয়, এটি বোর্ডের মূল্যায়ন কমিটি দেখাশোনা করে ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আহসান পারভেজ আমার দেশকে বলেন, আমি মাত্র কয়েক দিন হলো বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে যোগদান করেছি । টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং খাতা কেনাকাটা আমি আসার আগেই হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখতে হবে ।
এমএইচ
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

