আল মাহমুদের ‘বাঙালি মুসলমানের শত্রুমিত্র’

সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের বুদ্ধিবৃত্তিক ইশতেহার

সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের বুদ্ধিবৃত্তিক ইশতেহার

“আমি মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব, মানবজাতির শ্রম ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের বিস্ময়কর ব্যাখ্যা, শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও পুঁজিগঠনের দুঃসাহসিক বর্ণনার সাথে সাথে উদ্বৃত্ত পুঁজির কেন্দ্রীভূত হওয়ার গূঢ় কারণসমূহের পঠনপাঠন একদা গভীর অভিনিবেশ সহকারে করেছিলাম বলেই পবিত্র কুরআন হৃদয়ঙ্গম করা সহজ হয়েছে।”—আল মাহমুদের ‘কবির আত্মবিশ্বাস’ প্রবন্ধের এই স্বীকারোক্তি তার সমগ্র মননযাত্রার এক অনন্য চাবিকাঠি। এখানে একজন অনুসন্ধানী বুদ্ধিজীবীর আত্মজিজ্ঞাসার পাশাপাশি প্রতিভাত হয় এমন এক সাহিত্যিকের আত্মরূপ, যিনি কোনো মতাদর্শের অন্ধ অনুগামী না হয়ে জীবন, ইতিহাস ও সভ্যতার নানা পরিক্রমা অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত নিজের জাতিসত্তা, আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার ও সাংস্কৃতিক শিকড়ে প্রত্যাবর্তন করেছেন। সে কারণেই তার প্রবন্ধগুলো কেবল মতামতের সমষ্টি নয়; বরং এক দীর্ঘ বুদ্ধিবৃত্তিক সফরের দলিল।

আল মাহমুদের দ্রোহবিষয়ক কবিতার প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ‘দ্রোহের কবি আল মাহমুদ’ বইয়ের কাজ করার সময় প্রথম তার প্রবন্ধসাহিত্যে গভীরভাবে প্রবেশের সুযোগ হয় আমার। তখনই অনুভব করি, কবিকে বুঝতে হলে তার গদ্য এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তার বহু প্রবন্ধ আমাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল তখন। এরপর জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাস্তবতায় হাতে আসে মুহিম মাহফুজ সম্পাদিত ‘বাঙালি মুসলমানের শত্রুমিত্র’। তখন মনে হয়েছে, সময় যেন এই বইটিকে নতুন করে পাঠ করার আহ্বান জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাহিত্যের পাটাতনে এমন কিছু গ্রন্থ রয়েছে, যেগুলো কেবল পাঠের জন্য নয়; বরং আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের জন্যও অপরিহার্য। বাঙালি মুসলমানের শত্রুমিত্র তেমনই একটি সংকলন বলেই মনে হয়। এর উপশিরোনাম— ‘সাংস্কৃতিক স্বৈরাচার মোকাবেলায় নির্বাচিত প্রবন্ধ’—বইটির প্রকৃতি সম্পর্কে শুরুতেই স্পষ্ট ধারণা দেয়। এটি বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধের সমাবেশ নয়; বরং দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলমান একটি বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলার দলিল। ৭৮টি প্রবন্ধের প্রত্যেকটির বিষয়ভিত্তিক স্বতন্ত্র আলোচনা করতে গেলে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাগ্রন্থ রচিত হতে পারে। ফলে এই আলোচনার উদ্দেশ্য মূলত সংকলনের সামগ্রিক পরিচিতি ও তাৎপর্য অনুধাবন করা।

চার দশক ধরে আল মাহমুদ সাংস্কৃতিক স্বৈরাচার, বুদ্ধিবৃত্তিক একচেটিয়াকরণ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সভ্যতাগত পরিচয়কে প্রান্তিক করে রাখার প্রবণতার বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্নভাবে কলম ধরেছেন। জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর তার সেই দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম নতুন আলোয় প্রতিভাত হয়েছে। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আল মাহমুদের বেশকিছু কবিতা আবৃত্তি ও দেয়াললিখনে স্থান পেয়ে কবির সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা আবারও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। এটা নিয়ে আমার পৃথক একটা প্রবন্ধ ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আল মাহমুদ’ গত বছর প্রকাশিত হয়। তাই এই পর্যবেক্ষণ কোনো আবেগঘন ব্যক্তিতোষণ নয়; বরং বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি ধারাবাহিকতার স্বীকৃতি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি যে আত্মপরিচয় সংকট, সাংস্কৃতিক আধিপত্য এবং ঐতিহাসিক স্মৃতিবিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন, আজ সেই প্রশ্নগুলো আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে।

আল মাহমুদের কাছে বাঙালি মুসলমানের পরিচয় ছিল না কেবল ধর্মীয় কিংবা ভাষাভিত্তিক; বরং ইতিহাস, ঈমান, ঐতিহ্য, ভাষা, ভূখণ্ড ও সভ্যতার সম্মিলিত উত্তরাধিকার। তার বিশ্বাস ছিল, যে জাতি নিজের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক শিকড় বিস্মৃত হয়, সে শেষ পর্যন্ত অন্যের বয়ানের ভেতর আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হয়। তাই তার প্রবন্ধে যেমন বাংলা সভ্যতার উত্তরাধিকার ফিরে ফিরে এসেছে, তেমনি এসেছে বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি, কৃষিজীবন, নদীমাতৃক ভূপ্রকৃতি এবং এই ভূখণ্ডে বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। এই সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই তার প্রবন্ধকে নিছক রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া থেকে উত্তীর্ণ করে সভ্যতাগত আত্মপরিচয়ের আলোচনায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

সম্পাদকের ভূমিকায় মুহিম মাহফুজ যথার্থই বলেছেন, আল মাহমুদের সমুদয় রচনার মধ্যে তার ব্যক্তিসত্তা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে প্রবন্ধাবলিতে। নির্বাচনেও তিনি সুস্পষ্ট নীতি অনুসরণ করেছেন। বাংলাদেশ, বাঙালি মুসলমান এবং তাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য, ইতিহাস ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে যেখানে আল মাহমুদ প্রত্যক্ষভাবে কথা বলেছেন, সেসব রচনাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে সংকলনটি পাঠ করতে করতে একজন কবির পাশাপাশি একজন মননশীল চিন্তক, সাংস্কৃতিক সংগ্রামী এবং আত্মপরিচয়কামী ভাষ্যকারের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটবে।

বইটির সূচিপত্রই যেন একটি বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্র। ‘অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়তে হলে’, ‘ইসলামকে তালগোল পাকিয়ে ফেলা শুভ লক্ষণ নয়’, ‘ফেব্রুয়ারি: সাংস্কৃতিক মাস্তানির মাস’, ‘কলকাতার বই: মুখোশধারী আধিপত্য’, ‘লেখক শিবিরের ইসলাম বিরোধিতা’, ‘ধর্ম নিয়ে ফাজলামি’, ‘আজান ও উলুধ্বনিকে একাকার ভাববেন না’—এই শিরোনামগুলো তার চিন্তার প্রধান রণাঙ্গনকে স্পষ্ট করে। আবার ‘রবীন্দ্রপ্রতিভা ও সভ্যতার আকাঙ্ক্ষা’, ‘ভারতের বিশালত্বের অহংকার’ কিংবা ‘পশ্চিমবঙ্গ মুসলিম জনসংখ্যা এবং অনুপ্রবেশের স্লোগান’ প্রবন্ধগুলো দেখায়, তার চিন্তার পরিধি কেবল রাষ্ট্রসীমায় আবদ্ধ নয়; বরং সমগ্র উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক ভূরাজনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত। সংকলনের শেষাংশে কাজী নজরুল ইসলাম, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, ফররুখ আহমদ, তাহেরা সফরজাদেহ, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান প্রমুখকে নিয়ে লেখা স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়নধর্মী প্রবন্ধ সংযোজিত হয়েছে। পাশাপাশি ‘তসলিমার ব্যাপারে বাইরের হস্তক্ষেপ’, ‘মার্কসবাদীদের কাব্য বিচার’ এবং ‘দাউদ হায়দার ও কালো বিড়াল’ কেবল সমকালীন বিতর্কের দলিলের চেয়ে মননের বিবর্তনের সাক্ষ্য হিসেবে ধরা পড়ে। এখানেই স্পষ্ট হয়, আল মাহমুদের বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়; বরং আত্মবিস্মৃতি, সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ এবং সভ্যতাগত বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে।

এই সংকলনের আরেকটি বড় শক্তি আল মাহমুদের গদ্য। তার ভাষা একই সঙ্গে কাব্যময়, তীক্ষ্ণ এবং প্রত্যয়দীপ্ত। অলংকারের চেয়ে যুক্তি, ভণিতার চেয়ে সত্যকথন এবং আপসের চেয়ে বিশ্বাসের দৃঢ়তা তার গদ্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সমকালকে তিনি একই সূত্রে গেঁথে এমন এক ভাষা নির্মাণ করেছেন, যা পাঠককে কেবল তথ্য নয় বরং আত্মপরিচয় নিয়ে পুনর্বিবেচনায় আহ্বান জানায়।

আজ যখন স্বৈরাচার পলায়নের পর বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়, সাংস্কৃতিক অধিকার এবং সভ্যতাগত উত্তরাধিকার নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে, তখন বাঙালি মুসলমানের শত্রুমিত্রকে একটি প্রবন্ধ-সংকলন হিসেবে পাঠ করার চেয়ে আত্মপরিচয় পুনর্জাগরণের এক গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল হিসেবে বোঝা উচিত। আল মাহমুদের সব বক্তব্যের সঙ্গে আপনার একমত হওয়া জরুরি নয়; কিন্তু তাকে পাঠ না করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিতর্ক, বাঙালি মুসলমানের মননযাত্রা এবং আত্মপরিচয় নির্মাণের ইতিহাস পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবন করা নিঃসন্দেহে কঠিন। এক্ষেত্রে মুহিম মাহফুজের এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন