চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয় ২০২৪ সালের ৫ জুন। ইসলামের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী সৈয়ব আহমেদ সিয়াম ও দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী রাসেল আহমদের প্ল্যাকার্ড হাতে ব্যতিক্রমী প্রতিবাদের মাধ্যমে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুতই ক্যাম্পাসে ছড়িয়ে পড়ে। পরে ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা নেয়ামত উল্লাহ ফারাবীর উদ্যোগে ফেসবুকে ‘কোটা পুনর্বহাল চলবে না, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়’ গ্রুপ খোলার পর আন্দোলন আরো সংগঠিত হতে থাকে। প্রথমদিকে গোপনে ব্যানার ও মাইকসহ বিভিন্ন লজিস্টিক সহায়তা দেয় ছাত্রশিবির।
ঈদের ছুটির পর ১ জুলাই থেকে চবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু হয়। ৪ জুলাই শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়ক অবরোধ করেন। পরদিন ষোলশহরে প্রথম কর্মসূচির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চট্টগ্রাম শহরে ছড়িয়ে পড়ে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক রাসেল আহমদ, সহ-সমন্বয়ক খান তালাত মাহমুদ রাফী, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের বর্তমান সভাপতি আবদুর রহমান প্রমুখ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। এদের নেতৃত্বেই ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন। এসব কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ ছিল ছাত্রীদের। পাশাপাশি ছাত্রলীগের একটি অংশও এই আন্দোলনে শরিক হয়।
১১ জুলাই রেল ও সড়কপথ অবরোধের পর টাইগারপাসে পুলিশের লাঠিচার্জ এবং ১৪ জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’ আখ্যা দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই রাতেই চবির জিরো পয়েন্টে শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে, ‘তুমি কে, আমি কে?, রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দিলে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা তাদের উপর চড়াও হয়। পরদিন সহ-সমন্বয়ক রাফীকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা প্রক্টর কার্যালয়ে তুলে নেওয়াকে কেন্দ্র করে আবারও হামলার ঘটনা ঘটে। এতে মাহবুবুর রহমান (চাকসুর বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক) গুরুতর আহত হন। একই দিন বিকেলে ষোলশহর রেলস্টেশনে ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। শিক্ষার্থীরা পাথর নিক্ষেপ করে তাদের প্রতিহত করে।
এরপর ১৬ জুলাই মুরাদপুরের কর্মসূচিতে চবি, বিভিন্ন সরকারি কলেজ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদরাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এদিন শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণ করে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডাররা। এই ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম, ছাত্রশিবির নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত ও শ্রমিক ফারুক নিহত হন।
শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ থেকে গণআন্দোলন
চট্টগ্রাম ও রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৬ জুলাই সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হওয়ার পর আন্দোলন আর শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে। আন্দোলনে যুক্ত হতে শুরু করে সাধারণ জনতাও। এরপর থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্রশিবিরের নিয়ন্ত্রণে আন্দোলন চলে। চবি ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী (তৎকালীন অর্থ সম্পাদক) মাঠপর্যায়ে এই আন্দোলনের মূল সমন্বয়কারীর ভূমিকায় ছিলেন। সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ ও সহ-সমন্বয়ক রাফী নিরাপত্তার স্বার্থে ১৬-৩০ জুলাই পর্যন্ত আত্মগোপনে ছিলেন। এরপর থেকে তারা আবার আন্দোলনে যুক্ত হয়।
১৭ জুলাই লালদীঘি ময়দানে নিহতদের স্মরণে গায়েবানা জানাজা হয়। একই দিন বিকেলে চবি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে প্রশাসন। ছাত্রীদের সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে এবং ছাত্রদের রাত ১০টার মধ্যে আবাসিক হল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কিলোমিটার এলাকার মধ্যে থাকা মেস ও কটেজও বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
তবে হল ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান অনেক ছাত্রী। পরে তৎকালীন প্রক্টর অধ্যাপক ড. অহিদুল আলম ও ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক আলী আজগরের নেতৃত্বে প্রশাসনের কর্মকর্তারা তাদের হল ত্যাগে বাধ্য করেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা হল ছাড়লেও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন আবাসিক হলে অবস্থান করেন।
১৮ জুলাই সকাল ১০টায় নগরের নতুন ব্রিজ এলাকায় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। সেখানে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন সাধারণ মানুষও। কর্মসূচিস্থলে কয়েকশ পুলিশ সদস্য এবং রেড ক্রিসেন্টের উদ্ধারকারী দল মোতায়েন ছিল। প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী জড়ো হয়ে মিছিল শুরু হলে পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে বহু শিক্ষার্থী আহত হন।
একই দিন বহদ্দারহাট এলাকায় শিক্ষার্থীদের আরেকটি মিছিলে পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের গুলিতে চারজন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। পরে ২৩ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চবি শিক্ষার্থী হৃদয় চন্দ্র তরুয়া মারা যান।
১৯ জুলাই আবারও লালদীঘি ময়দানে গায়েবানা জানাজা হয়। প্রায় ২০ হাজার ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে এই জানাজা থেকে চবি ছাত্রশিবিরের সাবেক দাওয়া সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন শিপন ফ্যাসিস্ট হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে এক দফা ঘোষণা দেন। তবে সারা দেশে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকায় এই ঘোষণা সে সময় ব্যাপকভাবে প্রচার হয়নি।
কারফিউয়ের মধ্যে আন্দোলন
১৯ জুলাই কারফিউ ঘোষণার পর ২১ জুলাই সার্জিসক্যাপ হাসপাতালে চবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমানের সঙ্গে বৈঠক করেন ছাত্রশিবির নেতা মোহাম্মদ আলী। এতে ২২ জুলাই কারফিউ ভেঙে প্রবর্তক মোড়ে সীমিত পরিসরে মিছিল করার সিদ্ধান্ত হয়। ২৩-২৮ জুলাই বড় কোনো প্রকাশ্য কর্মসূচি না থাকলেও ২৭ জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্মরণে আবারও গায়েবানা জানাজা হয়। লালদীঘি ময়দান, আন্দরকিল্লা, রিয়াজুদ্দিন বাজার ও নিউমার্কেট এলাকা জামায়াত অধ্যুষিত হওয়ায় এখানে নিয়মিত আন্দোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২৯ জুলাই চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের কর্মসূচি শেষে চেরাগী পাহাড় মোড়ে নারী শিক্ষার্থীদের স্লোগানের মাধ্যমে আন্দোলনে নতুন গতি আসে। পরে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ ক্যাডারদের হামলার মধ্যে আটক শিক্ষার্থীদের রক্ষায় নারী শিক্ষার্থীরা মানবঢাল তৈরি করেন।
২ আগস্ট আন্দরকিল্লা থেকে টাইগারপাস পর্যন্ত মিছিল হয়। ৩ আগস্ট নিউমার্কেট এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাধারণ জনতা অংশ নেন। এখানেই এক দফার পক্ষে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন সমন্বয়ক রাসেল আহমেদ। ৪ আগস্ট একই এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা, গুলি ও টিয়ারগ্যাসে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। এতে অসংখ্য ছাত্র-জনতা আহত হন।
৫ আগস্ট ‘মার্চ ফর ঢাকা’ কর্মসূচির কারণে চট্টগ্রামে আলাদা কর্মসূচি ছিল না। তবে হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে শিক্ষার্থীরা বিজয় মিছিল নিয়ে চবিতে ফিরে আসেন। পরে তারা বিভিন্ন আবাসিক হলের ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করেন।
পাশে যারা ছিলেন
১১ জুলাই শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনার পর চবির একদল শিক্ষক ‘নিপীড়নবিরোধী শিক্ষক ঐক্য’ গঠন করেন। সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিলেন ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান এবং প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আতিয়ার রহমান। ৩ আগস্ট নিউমার্কেট এলাকার আন্দোলনেও এই সংগঠনের বেশকিছু শিক্ষক অংশ নেন।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে অংশ নেন আইনজীবীরাও। ৩১ জুলাই চট্টগ্রাম কোর্ট প্রাঙ্গণে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করেন তারা। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের সময় যেসব ছাত্র-জনতা আহত হয়েছেন, তাদের প্রায় বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন হাসপাতাল, পার্কভিউ ও আইএমসি হাসপাতাল।
জানতে চাইলে চবি ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, জুলাইয়ের শুরুতে যেহেতু এটি ছাত্রদের অধিকারভিত্তিক আন্দোলন ছিল, তাই আমরা বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা দেওয়া শুরু করি। একই সঙ্গে আমাদের সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৩ জুলাই থেকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেন। ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের পর থেকে চট্টগ্রাম মহানগর এবং বিভিন্ন জেলা শাখার সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। সমন্বয়কদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের বৈঠকেও কর্মসূচির স্থান ও কৌশল নির্ধারণ করা হতো। পরে সেসব প্রস্তাব সমন্বয়কদের সভায় উপস্থাপন করা হতো।
চবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, আমরা নিজ উদ্যোগে ১০ জুলাই থেকেই আন্দোলনে যুক্ত হই। পরে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ছাত্রদল সাংগঠনিকভাবে ১৪ জুলাই চট্টগ্রামে আন্দোলনে অংশ নেয়। ১৫ ও ১৬ জুলাই ছাত্রলীগ ও আওয়ামী সন্ত্রাসীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে মিছিলের নেতৃত্ব দিই। ১৬ জুলাইয়ের পর কারফিউ ও ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকলেও আমরা প্রতিদিন সহযোদ্ধাদের সংগঠিত করে আন্দোলন অব্যাহত রাখি।
ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ চবি শাখার সভাপতি আব্দুর রহমান বলেন, আমরা ৫ জুন কয়েকজন মিলে প্রথম আন্দোলন শুরু করি। এরপর ঈদের ছুটিতে ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যায়। জুলাইয়ের শুরু থেকে আবার আন্দোলন শুরু করি। একপর্যায়ে আন্দোলন শহরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যেখানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। সেই ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই চট্টগ্রামে আন্দোলনের সময় তিনজন নিহত হন। এরপর আন্দোলন আরো বেগবান হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রূপ নেয়।
চবি মার্কেটিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া শিকদার বলেন, আমরা নারী শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয় ছিলাম। তবে আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক ক্ষেত্রে তারা ঢালের মতো সামনে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জুলাই-পরবর্তী সময়ে নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ধর্ষণ ও সাইবার বুলিংয়ের মতো ঘটনা ঘটেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও এসব ঘটনার কার্যকর প্রতিরোধ নিশ্চিত হয়নি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


