আলোচনা সভায় বক্তারা

সমুদ্রসীমা ও সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে

সমুদ্রসীমা ও সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে

জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এটি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা দেশ ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্টজনেরা।

তারা বলেন, বিদেশি অস্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শক্তিশালী গণতন্ত্র, বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর, সংখ্যালঘুদের অধিকার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আধিপত্যবাদবিরোধী নাগরিক সমাজ আয়োজিত ‘নতুন বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রে সার্বভৌমত্ব কৌশল’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তারা এসব কথা বলেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, মধ্যযুগে একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রকে দখল করতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করত। কিন্তু আধুনিক যুগে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ধরন বদলেছে। এখন শুধু ভূখণ্ড দখল নয়, একটি দেশের প্রতিষ্ঠান, সম্পদ ও জনগণের চিন্তা-চেতনার ওপর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমেও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়।

তিনি বলেন, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এ অঞ্চলের প্রতি একাধিক পরাশক্তির আগ্রহ রয়েছে। ফলে সমুদ্রসীমা, সামুদ্রিক সম্পদ ও দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সরকারের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সমঝোতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক দেশে সরকার কী ধরনের চুক্তি করছে এবং সেগুলো দেশের স্বার্থে হচ্ছে কি না—তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি কিংবা সৌদি আরব, আরব ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামরিক ও অন্যান্য চুক্তিগুলো জনসম্মুখে আনা প্রয়োজন। এসব বিষয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত। জনগণকে অন্ধকারে রেখে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি করা উচিত নয়,’ বলেন তিনি।

নাগরিক সভায় সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, সার্বভৌমত্ব মানে অর্থনীতি, রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, জ্বালানি ও সামরিক নীতির বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। এজন্য সামরিক ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য ও শক্তিশালী নেতৃত্ব প্রয়োজন। বিদেশি অস্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

জনতার দলের মুখপাত্র ও মুখ্য সমন্বয়ক মেজর (অব.) ডেল এইচ খান বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব কোনো একটি রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। সরকার পরিবর্তন হলেও এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নীতি অপরিবর্তিত থাকা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরকে কোনোভাবেই ইজারা দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, আধিপত্য মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র, পশ্চিমা দেশ ও চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শক্তিশালী গণতন্ত্র, বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর, সংখ্যালঘুদের অধিকার ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে এয়ার পাওয়ারে পারি না। আমাদের যদি এয়ার পাওয়ার সক্ষমতা থাকত, মিয়ানমার জীবনেও এই ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আমাদের মাটিতে পুশব্যাক করত না। এসব জায়গায় আমাদের অবশ্যই নিতে হবে। আমাদের মিলিটারি সাইজ বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, আমাদেরকে এখনও ড্রোন কিনতে হয়; এটি তৈরির কোনো সামর্থ্য নেই। আমাদের ব্যালিস্টিক টেকনোলজি বলে কিছু নেই। আমাদের কিছু খালি ক্যান্টনমেন্ট আছে। সারা দেশজুড়ে কিছু ক্যান্টনমেন্ট করে রেখেছি। কেউ যদি আমাদের অ্যাটাক করতে চায়, এক মিনিটেই এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে বিকল করে দিতে পারে। এক মিনিটে জেনারেলরা কোথায় আছে, সেটা সে রেকর্ড করতে পারে।

সংসদ সদস্য মারজিয়া মমতাজ বলেন, দেশের গ্যাস সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্টদের আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরকে ব্লু ইকোনমি ঘোষণা করা হলেও এখনো এ নিয়ে কার্যকর কাজ শুরু হয়নি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী ও চিত্র সাংবাদিক ড. শহিদুল আলম বলেন, শুধু সরকার পরিবর্তন হলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না; রাজনৈতিক ও সামাজিক চরিত্রের পরিবর্তন প্রয়োজন। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সরকারকে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে বারবার বিতর্ক তৈরির চেষ্টা হচ্ছে। জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা না পাওয়া এবং জুলাই জাদুঘর থেকে ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী আন্দোলনসংক্রান্ত কিছু প্রদর্শনী সরিয়ে নেওয়ার বিষয়েও জবাবদিহি প্রয়োজন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন