অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছিলেন, দেশে চলমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট সমাধানে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, বিষয়টি এমন নয় যান্ত্রিক ত্রুটি এবং জ্বালানি ঘাটতি দূর হলে দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। অন্যদিকে দেশের গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে বাস্তবিক অর্থে কোনো লোডশেডিং নেই দাবি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি—আমাদের বিদ্যুতের ঘাটতি নেই।’
বিদ্যুৎ ঘাটতির কথা জাতীয় সংসদে স্বীকার করে সেজন্যে দেশবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন একই দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। বলেছেন, আগামী ১৫ দিনের মধ্যেই পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি ঘটবে। সবশেষ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশ্বাস দিয়েছেন, আগামী পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে গ্যাস পরিস্থিতি আরো স্বাভাবিক হবে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্যে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান কত দূর?
এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর পাওয়া না গেলেও জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, সেহেতু পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি অবশ্যই হবে। এক্ষেত্রে জরুরি ভিত্তিতে ফার্নেস অয়েল আমদানি করে তা দিয়ে ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগকে প্রধান নিয়ামক হিসেবে দেখছেন তারা।
পাশাপাশি এলএনজিভিত্তিক ভাসমান টার্মিনালগুলো যেকোনো মূল্যে সচল রাখা, দেশীয় কূপগুলো থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়াতে এগুলোর কারিগরি ও যান্ত্রিক রক্ষণাবেক্ষণে মনোযোগ দেওয়া, ভারতীয় আদানির গোড্ডা প্ল্যান্টের যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত সারিয়ে তুলতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া এবং সর্বোপরি গ্যাস-বিদ্যুৎ চুরি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন তারা।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, গতকাল রোববার দেশে গ্যাসের মোট চাহিদা ছিল ৩৮০ কোটি ঘনফুট। এর বিপরীতে উৎপন্ন হয় ২৩৩ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ ১৪৭ কোটি ঘনফুট কম। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পপণ্যের উৎপাদন, সিএনজি পাম্পের প্রেশার এবং বাসাবাড়ির চুলার ওপর।
পিডিবির তথ্য বলছে, গতকাল দিনের পিক আওয়ারে দেশের বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৯৪৪ মেগাওয়াট। একই সময়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়েছে ১৪ হাজার ৭৬ মেগাওয়াট। লোডশেডিং করা হয় ১,৮৬৮ মেগাওয়াট। সন্ধ্যায় চাহিদা বেড়ে ১৭ হাজার ছাড়িয়ে গেলেও উৎপাদন তেমন বৃদ্ধি না পাওয়ায় লোডশেডিং বেড়ে ৩,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। ফলস্বরূপ শহরাঞ্চলে গড়ে তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলের ৭ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হয় বলে পিডিবি জানায়। গত ১০ আগস্ট দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ৩,৭৭৮ মেগাওয়াট।
গ্যাস-বিদ্যুতের এ ঘাটতির কারণে ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিপরীতে গতকাল উৎপন্ন হয় মাত্র ৪,৮০০ মেগাওয়াট। শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদনের চাকা সচল রাখতে দৈনিক প্রয়োজন ১২০ কোটি ঘনফুটের বেশি। সেখানে গতকাল সরবরাহ করা হয় ৭০-৭৫ কোটি ঘনফুট। ৫০-৫৫ কোটি ঘনফুট ঘাটতি নিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে উৎপাদন। দৈনিক ৩৩ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে আবাসিক খাতে গতকাল সরবরাহ করা হয় ২৮ থেকে ৩০ কোটি ঘনফুট।
সরবরাহ লাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় ঢাকা ও আশপাশের আবাসিক এলাকায় গতকাল দিনের একটা বড় অংশ রান্নার চুলা জ্বলেনি। অন্যদিকে সিএনজি পাম্পগুলোয় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দৈনিক চাহিদা ১২ থেকে ১৫ কোটি ঘনফুটের বিপরীতে গতকাল পাওয়া গেছে ১০ থেকে ১২ কোটি ঘনফুট। ফলাফল প্রতিটি সিএনজি স্টেশনেই গ্রাহকদের লাইনে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
দেশে গ্যাস-বিদ্যুতের এমন ঘাটতি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের বাস্তবায়ন কতটা সম্ভবÑজানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ম. তামিম আমার দেশকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেহেতু আশ্বস্ত করেছেন, নিশ্চয়ই তার কাছে কোনো প্ল্যান আছে। আগামী পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নয়ন কীভাবে ঘটাবেন, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে আমার কাছে মনে হয়, ফার্নেস তেলের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে বাড়তি ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, তিনি সেদিকেই আশা করে আছেন।
সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে এ উদ্যোগ ঠিকই আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে নতুন কূপ খননের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে পারলে সমস্যার আংশিক সমাধান সম্ভব। এক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া দুই বছরের সময়সীমাই যৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে কিছুটা যুক্তি আছে জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অনারারি অধ্যাপক বদরূল ইমাম আমার দেশকে বলেন, সরকার তো গ্যাস উত্তোলনের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সেখান থেকে এখনই তো গ্যাস পাওয়া যাবে না। ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়লেও সমস্যার তাৎক্ষণিক উন্নতি হবে। মাতারবাড়ীর এলএনজি টার্মিনাল দুটি চালু রাখার পাশাপাশি কয়লার সরবরাহ বাড়িয়ে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো সচল রাখতে পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুতই বাড়ানো সম্ভব। তিনি বলেন, আদানির গোড্ডা কেন্দ্রটি যেন চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ অব্যাহত রাখে সে নিশ্চয়তা তার কাছ থেকে আদায় করতে হবে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার আলোকে গ্যাস-বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে পেট্রোবাংলা ও পিডিবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, স্পট মার্কেট থেকে জরুরি আমদানির মাধ্যমে মাতারবাড়ীর দুটি টার্মিনালে সময়মতো এলএনজি কার্গোর উপস্থিতি অনেকটাই নিশ্চিত করা হয়েছে। যান্ত্রিক ত্রুটির বিষয়টিও গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। আদানির গোড্ডা কেন্দ্রের বন্ধ ইউনিটে উৎপাদন গতকাল সকালে পুনরায় চালু হয়েছে। জরুরিভিত্তিতে ফার্নেস তেলের আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে উৎপাদন কমতে থাকা গ্যাসকূপগুলো মেরামতের। এসব কারণে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির অংশিক উন্নতি হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভরসার কেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল
পেট্রোবাংলা, বিপিসি এবং বিপিডিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে সংকট সমাধানে অগ্রগতির আশ্বাসের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করছে ফার্নেস অয়েল। তারা জানান, দেশে চলমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় আপৎকালীন উদ্যোগ হিসেবে ফার্নেস অয়েল বা ভারী জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভর করছে সরকার। এর মাধ্যমে অতিরিক্ত ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি চলছে। প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রয়োজনীয় ফার্নেস তেলের সরবরাহ চেয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। লোডশেডিংয়ের হাত থেকে শিল্পকারখানা ও সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে ফার্নেস অয়েলচালিত কুইক রেন্টাল ও আইপিপি কেন্দ্রগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যদিও ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে রাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক ফাঁদ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিঃস্বার্থ সহায়তার প্রস্তাব
এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট সমাধানে সরকারের কাছে কোনো ‘ক্রেডিট’ না চেয়ে নিঃস্বার্থভাবে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমের সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সংসদের বিরোধী দল। গত ৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশনে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা সরকারের পদক্ষেপে আশাবাদী। তবে কনফিউশন তৈরি হয় যখন দেখি, সংসদে দেওয়া খোলামেলা আশ্বাস বাস্তবায়ন হচ্ছে না। যেমন বলা হয়েছিল মিটার চার্জ, ডিমান্ড চার্জ আর নেওয়া হবে না, কিন্তু ঠিকই নেওয়া হচ্ছে। ভুতুড়ে বিলের সমাধানের কথাও বলা হয়েছিল, কিন্তু তা কন্টিনিউ করছে। সমস্যা সমাধানে দীর্ঘ মেয়াদে একটি কার্যকর জ্বালানি সেল করা দরকার মন্তব্য করে বিরোধিদলীয় নেতা বলেন, সরকার আমাদের সহযোগিতা চাইলে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট টিমকে সরকারের সঙ্গে যুক্ত করে দিতে পারি। একসঙ্গে তারা দেশের জন্য কাজ করবে।
৩৭ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ
এদিকে তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে বর্তমানে ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে শুধু গ্যাসের তীব্র অভাবের কারণে ২৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে। দেশের মোট গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাবাইটের বেশি হলেও গ্যাসের চরম সংকটে ২৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট বা ৪,০০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা অলস বসে আছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা অঞ্চলেরই অন্তত সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহের বেশ কয়েকটি বড় কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ বা নামমাত্র সক্ষমতায় চলছে।
গ্যাস ছাড়া বাকি ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকার পেছনে রয়েছে কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের অভাব এবং আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি। সম্প্রতি কারিগরি ত্রুটির কারণে ভারতের আদানি পাওয়ার প্ল্যান্টের একটি বড় ইউনিট (৮০০ মেগাওয়াট) হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের ঘাটতি আরো প্রকট হয়েছে।
রূপপুরের বিদ্যুৎ অনিশ্চিত
পূর্বের ঘোষণা অনুযায়ী, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে সেপ্টেম্বরে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক কারিগরি জটিলতার কারণে এ সময়সীমা পিছিয়ে গেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির রিঅ্যাক্টরের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশ—পিওআরভির (প্রেশার-অপারেটেড রেগুলেটরি ভালভ) তিনটি ভালভের মধ্যে মাত্র একটি ঠিকঠাক কাজ করছে, আর বাকি দুটি নিয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও মেরামতের কাজ চলছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

