ভূগর্ভে কণার সংকেত

ভূগর্ভে কণার সংকেত

প্রায় এক শতাব্দী ধরে মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় আশ্চর্য বিষয়গুলোর মধ্যে একটি হলো ‘ডার্ক ম্যাটার’ বা অদৃশ্য পদার্থ। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে জানেন, আমাদের দৃশ্যমান গ্রহ, নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি সুবিশাল মহাবিশ্বের মাত্র একটি ক্ষুদ্রতম অংশ। বাকি বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে রহস্যময় ডার্ক ম্যাটার, যাকে সরাসরি দেখা না গেলেও মহাকর্ষীয় প্রভাব দিয়ে অনুভব করা যায়। তবে যুগের পর যুগ গবেষণা চালিয়েও এই ডার্ক ম্যাটারকে সরাসরি গবেষণাগারে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এবার সেই দীর্ঘ অনুসন্ধানে এক নতুন সংকেত পাওয়ার দাবি করেছেন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের একটি টিম।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ডাকোটায় ভূগর্ভের প্রায় এক মাইল (১ দশমিক ৬ কিলোমিটার) গভীরে ডার্ক ম্যাটার অনুসন্ধান প্রকল্প ‘লাক্স-জেপলিন’ (LUX-ZEPLIN বা LZ)-এ একটি অস্বাভাবিক কণার মিথস্ক্রিয়া বা সংঘর্ষ শনাক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই সহযোগী প্রকল্পে বিশ্বজুড়ে ছয়টি দেশের ৩৯টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রায় ২৫০ জন বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলী যুক্ত রয়েছেন। সম্প্রতি জাপানে অনুষ্ঠিত ‘TeV Particle Astrophysics’ আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. স্যাম এরিকসনের নেতৃত্বে এই গবেষণার ফল আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।

দক্ষিণ ডাকোটার স্যানফোর্ড আন্ডারগ্রাউন্ড রিসার্চ ফ্যাসিলিটিতে অবস্থিত এই ডিটেক্টরটি ভূপৃষ্ঠ থেকে এত গভীরে স্থাপনের প্রধান কারণ হলোÑমহাকাশ থেকে আসা কসমিক রে বা ক্ষতিকর বিকিরণের প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ করা। বিশাল পাথরের আস্তরণ অনাকাঙ্ক্ষিত কণা আটকে দেয়, ফলে সূক্ষ্ম ও বিরল পরমাণুর প্রতিঘাত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। যন্ত্রটিতে ১০ টন অতিবিশুদ্ধ তরল জেনন ব্যবহার করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, কোনো ডার্ক ম্যাটার কণা জেনন পরমাণুর নিউক্লিয়াসে আঘাত করলে তা ক্ষীণ আলো ও সামান্য ইলেকট্রন তৈরি করে। ২২০ দিনের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের পর প্রায় ২৪৮ কিলোইলেকট্রনভোল্ট (keV) শক্তির একটি অস্বাভাবিক পরমাণুর প্রতিঘাত (Nuclear Recoil) ধরা পড়ে, যা পরিচিত ব্যাকগ্রাউন্ড সিগন্যাল দিয়ে কোনোভাবেই মেলানো সম্ভব হচ্ছে না।

বিজ্ঞানীদের অনুমান, এই একক কণার সংকেতটি যদি সত্যিই ডার্ক ম্যাটার হয়ে থাকে, তবে তা হতে পারে বহু প্রতীক্ষিত ‘উইম্প’ (WIMP বা Weakly Interacting Massive Particle)। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সম্ভাব্য এই ডার্ক ম্যাটার কণাটির ভর হতে পারে অন্তত ২০০ গিগাইলেকট্রনভোল্ট (200 GeV/c²), যা একটি সাধারণ প্রোটন কণার ভরের চেয়ে প্রায় ২০০ গুণেরও বেশি। তবে গবেষকরা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, এটিকে এখনই ডার্ক ম্যাটার পাওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা বলা যাবে না। কারণ বিজ্ঞানীদের পরিভাষায় যেকোনো নতুন কণা আবিষ্কার নিশ্চিত করতে ‘৫-সিগমা’ (5-sigma) মানের প্রমাণের প্রয়োজন হয়, যেখানে বর্তমান ফলটির বৈশ্বিক বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য প্রায় ২ দশমিক ৬ সিগমা।

বর্তমানে পুরো বিষয়টি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনার (Peer-review) জন্য জমা দেওয়া হয়েছে এবং প্রি-প্রিন্ট হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। এলজেড (LZ) প্রকল্পের মুখপাত্র ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিক গেইটস্কেল জানিয়েছেন, তারা এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না পৌঁছে সংগৃহীত তথ্যের সময়সীমা আরো বাড়িয়ে পরবর্তী গবেষণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। যদি সামনের দিনগুলোয় ভূগর্ভস্থ জেনন চেম্বারে এমন আরো কয়েকটি একই বৈশিষ্ট্যের অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের সংকেত পাওয়া যায়, তবে তা বৈজ্ঞানিক জগতে পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরের এক সম্পূর্ণ নতুন যুগের সূচনা করবে বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন