বিদ্যুৎ সংকটে সৌরশক্তির সম্ভাবনা

বিদ্যুৎ সংকটে সৌরশক্তির সম্ভাবনা

তীব্র লোডশেডিং ও জ্বালানি সংকটে যখন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে, তখন বাংলাদেশের সামনে নতুন সম্ভাবনা হয়ে উঠছে সৌরবিদ্যুৎ। গ্যাস ও কয়লার সরবরাহ সংকট, আমদানিনির্ভর জ্বালানির চাপ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে সরকার। একই সঙ্গে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি সংরক্ষণ, নেট মিটারিং ও স্মার্ট প্রযুক্তিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাও এগোচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কেন সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ এখনো গ্যাস ও আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে কিংবা যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক সংকটে সরবরাহ ব্যাহত হলে তার প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনেও পড়ে। সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে মূল জ্বালানি হিসেবে সূর্যের আলো ব্যবহার করা হয়। এর জন্য তেল, গ্যাস বা কয়লা আমদানি করতে হয় না। ফলে দীর্ঘ মেয়াদে সৌরবিদ্যুতের বিস্তার আমদানিনির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। তবে সৌরবিদ্যুৎ একাই সব সমস্যার সমাধান নয়। রাতের বেলায় সূর্যের আলো না থাকায় উৎপাদন বন্ধ থাকে এবং মেঘলা আবহাওয়ায় উৎপাদন কমে যায়। তাই সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে ব্যাটারি সংরক্ষণ, শক্তিশালী জাতীয় গ্রিড এবং অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎসের সমন্বয় জরুরি।

২০৩০ সালের লক্ষ্য কতটা বড়

সরকারের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অন্তত ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। ২০৪০ সালের মধ্যে এই হার ৩০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ২৪ হাজার থেকে ২৫ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে সংসদে জানানো হয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণে শুধু বড় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নয়, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকেও গুরুত্বপূর্ণ করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে একটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি হাজার হাজার বাড়ি, অফিস, কারখানা ও সরকারি ভবনও বিদ্যুৎ উৎপাদনের অংশ হয়ে উঠতে পারে।

ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে সম্ভাবনা

বাংলাদেশে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বাজার নিয়ে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বড় সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে। ডিস্ট্রিবিউটেড রিনিউএবল এনার্জি প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাপকভাবে গৃহস্থালি পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ গ্রহণ করা গেলে সর্বোচ্চ ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। এতে জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ করা সম্ভব হতে পারে। আর সীমিত পর্যায়ে মাত্র ১০ শতাংশ পরিবার যদি ১ থেকে ৫ কিলোওয়াট-পিক ক্ষমতার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট-পিক সক্ষমতা তৈরি হতে পারে। এতে বছরে প্রায় ১৩ হাজার ৯৩৭ গিগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা বর্তমান জাতীয় চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশের সমান।

প্রযুক্তির বড় পরিবর্তন

সৌরবিদ্যুতের সঙ্গে প্রযুক্তির সম্পর্ক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্মার্ট মিটার, সেন্সর, তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কোথায় কত বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কোথায় কত উৎপাদন হচ্ছে এবং কোন সময়ে চাহিদা বাড়ছে, তা আগেই অনুমান করা সম্ভব হবে। আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পূর্বাভাস দেওয়া যাবে। দিনের বেলায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যাটারিতে জমা রেখে রাতে ব্যবহার করা যাবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা হতে পারে তথ্যনির্ভর ও স্মার্ট। এখানে বাড়ির ছাদ, কারখানা, হাসপাতাল ও সরকারি ভবনও ছোট ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র হিসেবে কাজ করতে পারে।

শিল্পকারখানা ও কৃষিতে সম্ভাবনা

বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হলে অর্থনীতিতে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে। বড় শিল্পকারখানার বিশাল ছাদ সৌরবিদ্যুতের কাজে ব্যবহার করা গেলে দিনের একটি বড় অংশের বিদ্যুৎ নিজেদের উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কৃষিতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। সৌরচালিত সেচ পাম্পের মাধ্যমে ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। ভবিষ্যতে কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, হিমাগার ও কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব।

বর্তমান সক্ষমতা

সম্ভাবনা বিশাল হলেও বাস্তব চিত্র এখনো সেই তুলনায় ছোট। বাংলাদেশে বর্তমানে নেট মিটারিংয়ের আওতায় ৪ হাজার ৫৫১টি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে, যার মোট সক্ষমতা ২১৩ দশমিক ৩ মেগাওয়াট। এর ৬০ দশমিক ৪ শতাংশই ঢাকা বিভাগে। অর্থাৎ জাতীয় পর্যায়ে যে বিশাল সম্ভাবনার কথা বলা হচ্ছে, সেটি বাস্তবে কাজে লাগাতে হলে বিনিয়োগ, সহজ ঋণ, দ্রুত গ্রিড সংযোগ, দক্ষ জনবল ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু প্যানেল বসালেই হবে না

সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি সূর্যের ওপর নির্ভরশীল। তাই বিপুল পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে হলে শক্তিশালী সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি ব্যাটারি সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যয় কমাতে হবে। পুরোনো সৌর প্যানেলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ, সৌরবিদ্যুৎ যত বাড়বে, সময়ের সঙ্গে পুরোনো প্যানেলও তত বাড়বে। তাই এখন থেকেই সৌর প্যানেল পুনর্ব্যবহার, ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা জরুরি।

সম্ভাবনা আছে, বাস্তবায়নই বড় প্রশ্ন

বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। একদিকে জ্বালানি আমদানির চাপ ও বিদ্যুৎ সংকট, অন্যদিকে সৌরবিদ্যুতের প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা, সরকারি প্রণোদনা ও বড় বাজার। ডিআরইপির হিসাব অনুযায়ী, ব্যাপক গৃহস্থালি গ্রহণ সম্ভব হলে ২১ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌর সক্ষমতা তৈরি হতে পারে এবং প্রায় ৩৫ শতাংশ জাতীয় বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই হবে না। নেট মিটারিং সহজ করতে হবে, সহজ শর্তে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে, গ্রিডের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগকে আরও উৎসাহিত করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন