ভাবুন, মোবাইল ফোনে খাবারের অর্ডার দিলেন। কিছুক্ষণ পর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল ছোট্ট একটি গাড়ির মতো যন্ত্র। কোনো চালক নেই। কোনো ডেলিভারি কর্মীও নেই। অ্যাপে পাওয়া কোড দিয়ে সেটির ঢাকনা খুললেন এবং ভেতর থেকে খাবারের প্যাকেট বের করে নিলেন। কাজ শেষ করে রোবটটি নিজেই আবার গন্তব্যের পথে চলে গেল। কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও বিশ্বের বিভিন্ন শহরে এমন প্রযুক্তি এরই মধ্যে বাস্তব পরীক্ষার পর্যায় পেরিয়ে বাণিজ্যিক ব্যবহারে এসেছে। একে বলা হচ্ছে রোবোটিক ডেলিভারি (Robotic Delivery), যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্যামেরা, সেন্সর, জিপিএস ও স্বয়ংক্রিয় নেভিগেশন প্রযুক্তির সাহায্যে ছোট রোবট রাস্তা বা ফুটপাত দিয়ে খাবার ও অন্যান্য পণ্য পৌঁছে দেয়।
রোবোটিক ডেলিভারি রোবট সাধারণত আকারে ছোট এবং কয়েকটি চাকায় চলতে পারে। এর চারপাশে থাকা ক্যামেরা ও বিভিন্ন সেন্সর রাস্তা, পথচারী, সাইকেল, গাড়ি, দেয়াল কিংবা অন্যান্য বাধা শনাক্ত করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নেভিগেশন সফটওয়্যার সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে ঠিক করে নেয় কোন পথে এগোতে হবে। কোনো পথ হঠাৎ বন্ধ থাকলে বা সামনে বাধা দেখা দিলে রোবট থামতে, গতি কমাতে কিংবা বিকল্প পথ বেছে নিতে পারে। ফলে এটি শুধু একটি ‘চালকবিহীন বাক্স’ নয়, বরং চারপাশের পরিবেশ বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তৈরি একটি ছোট স্বয়ংক্রিয় যান।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় ব্যবহার দেখা যাচ্ছে খাবার সরবরাহে। রেস্তোরাঁ থেকে খাবার সংগ্রহ করে রোবট নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে গ্রাহকের ঠিকানার কাছে পৌঁছে যেতে পারে। সাধারণত রোবটের ভেতরের একটি লক করা কম্পার্টমেন্টে খাবার রাখা হয়। গ্রাহক অ্যাপের মাধ্যমে রোবটের অবস্থান দেখতে পারেন এবং নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছালে অ্যাপ, কোড বা অন্য কোনো শনাক্তকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে খাবার সংগ্রহ করেন। ছোট দূরত্বের ডেলিভারিতে এই ব্যবস্থা বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে।
রোবোটিক ডেলিভারির পেছনে কাজ করে একাধিক প্রযুক্তির সমন্বয়। জিপিএস রোবটকে অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেয়। ক্যামেরা ও অন্যান্য সেন্সর আশপাশের পরিবেশ শনাক্ত করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে চলার সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কিছু উন্নত সিস্টেমে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে রাস্তার পরিস্থিতি ও বিভিন্ন বাধা সম্পর্কে রোবটের সক্ষমতা আরো উন্নত করা হয়। আবার দূর থেকে মানব অপারেটর রোবটের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ বা প্রয়োজন হলে সহায়তা করতে পারেন। অর্থাৎ ‘স্বয়ংক্রিয়’ হলেও মানুষের নজরদারি অনেক ব্যবস্থাতেই পুরোপুরি বাদ যায় না।
রোবোটিক ডেলিভারির অন্যতম আকর্ষণ হলো খরচ কমানোর সম্ভাবনা। একটি রোবট একাধিকবার ব্যবহার করা যায় এবং নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়মিত ডেলিভারি করার ক্ষেত্রে এর পরিচালন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে। বিশেষ করে একই রেস্তোরাঁ বা ডেলিভারি হাব থেকে আশপাশের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে অনেক অর্ডার থাকলে রোবটভিত্তিক ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বা অত্যন্ত ব্যস্ত সময়ে কয়েক ধরনের ডেলিভারি স্বয়ংক্রিয় করার সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
তবে প্রযুক্তিটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ফুটপাতের অবস্থা খারাপ হলে, রাস্তায় অতিরিক্ত ভিড় হলে, কিংবা মানুষ অনিয়মিতভাবে চলাচল করলে রোবটের জন্য নিরাপদে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। বৃষ্টি, পানি জমে থাকা, ধুলা বা দুর্বল অবকাঠামোও সেন্সর ও নেভিগেশনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিরাপত্তা। রোবটকে এমনভাবে নকশা করতে হয়, যাতে এটি পথচারীর সঙ্গে সংঘর্ষ না ঘটায় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত থামতে পারে। পাশাপাশি রোবট চুরি, ভাঙচুর বা খাবার চুরি ঠেকানোর জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকাও প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে রোবোটিক ডেলিভারি চালু করতে গেলে চ্যালেঞ্জ আরো বেশি হতে পারে। ঢাকার অনেক এলাকায় ফুটপাত দখল। রাস্তার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, রিকশা ও পথচারীর ঘনত্ব এবং যানজট স্বয়ংক্রিয় ছোট যান চলাচলের জন্য কঠিন পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট আবাসিক এলাকা, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, হাসপাতাল, বড় শপিং কমপ্লেক্স বা প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পিত এলাকায় এই প্রযুক্তি তুলনামূলকভাবে সহজে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। অর্থাৎ পুরো শহর দিয়ে রোবট চালানোর আগে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ছোট পরিসরে শুরু করাই বাস্তবসম্মত।
রোবোটিক ডেলিভারি শুধু খাবার পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তি নয়, এটি ভবিষ্যতের স্বয়ংক্রিয় নগর পরিবহনের একটি ছোট সংস্করণ। খাবারের পাশাপাশি ওষুধ, মুদি পণ্য, নথি কিংবা ছোট প্যাকেজ পরিবহনেও এমন রোবট ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে ডেলিভারি রোবটের সঙ্গে ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি ও স্মার্ট ওয়্যারহাউস যুক্ত হলে অর্ডার গ্রহণ থেকে শুরু করে পণ্য বাছাই, পরিবহন এবং গ্রাহকের হাতে পৌঁছে দেওয়া—পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেকাংশে স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

