বানের পানিতে দুলে ওঠে কেওড়া গাছের ডালপালা, পায়ের নিচে নরম কাদা ঠেলে জেগে থাকে অসংখ্য শ্বাসমূল। একপাশে নদীর সোঁদা গন্ধ, আর ঠিক ওপারেই চোখে পড়ে দিগন্তছোঁয়া সাগরের বিশালতা। নাম তার ‘নিদ্রার চর’। অথচ সেখানে পা রাখতেই মনে হলো—এই চর যেন এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমায় না। জোয়ার এসে রোজ বদলে দেয় তার অবয়ব, আবার ভাটা নামলে উন্মুক্ত হয় মাটির বুক।
দিনকয়েক আগে বরগুনার তালতলী উপজেলার এই চরে দাঁড়িয়ে এমন এক প্রকৃতির মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা। পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে জায়গাটির পরিচিতি দিনদিন বাড়ছে, কিন্তু সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই বোঝা যায় নিদ্রার চরকে শুধু ‘সুন্দর একটি পর্যটন স্পট’ বললে এর গল্পের পুরোটা বলা হয় না। কেননা একই সঙ্গে নদী, সাগর, ম্যানগ্রোভ আর মানুষের সহাবস্থানের এক জীবন্ত ভূদৃশ্য এটি।
নিদ্রার চরের পথে এগোতে এগোতে শহুরে ব্যস্ততার চিহ্ন ধীরে ধীরে কমে আসে। একপর্যায়ে পথের চারপাশে দেখা যায় শুধু গ্রাম, সবুজ আর খোলা আকাশ। শেষ অংশের পথ পাড়ি দেওয়ার সময় বোঝা যায়, জায়গাটি এখনো পুরোপুরি পর্যটন অবকাঠামোর আওতায় আসেনি। কিন্তু পথের ক্লান্তি সেই চরে পৌঁছানোর পর অনেকটাই মিলিয়ে যায়।
সামনে তখন খোলা আকাশ। বাতাসে নদী-সাগরের গন্ধ। মাটির ওপর ছড়িয়ে থাকা সবুজ ঘাস। তার ফাঁকে ফাঁকে কেওড়া ও অন্যান্য উপকূলীয় গাছ। একটু দূরেই জলের বিস্তার। কোথাও পর্যটকের আনাগোনা, কোথাও আবার সম্পূর্ণ নীরবতা। নিদ্রার চরের সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—এখানে প্রকৃতিকে আলাদা করে সাজাতে হয়নি।
নিদ্রার চরকে বুঝতে হলে জোয়ার-ভাটাকে বুঝতে হয়। এখানে প্রকৃতি স্থির নয়। কিছুক্ষণ পরপরই বদলে যায় দৃশ্যপট। ভাটার সময় চরের বিস্তীর্ণ অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। কাদামাটির বুক থেকে বেরিয়ে আসে শ্বাসমূলগুলো। দূর থেকে দেখতে সাধারণ মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায়, এগুলোই এই ম্যানগ্রোভের প্রাণ। আবার জোয়ার এলে পানির সঙ্গে বদলে যায় পুরো দৃশ্য। আমরা যখন সেখানে ছিলাম, তখনো জলের পরিবর্তনের সঙ্গে চরের চেহারায় সেই বদল চোখে পড়ছিল। এক জায়গায় যেখানে কিছুক্ষণ আগেও হাঁটার মতো শুকনো জমি ছিল, সেখানেই ধীরে ধীরে পানি জমতে দেখা গেল। এই পরিবর্তনই নিদ্রার চরকে অন্য অনেক পর্যটনকেন্দ্র থেকে আলাদা করে।
সৌন্দর্যের নিচে লুকানো বন
নিদ্রার চরে দাঁড়িয়ে প্রথমে চোখে পড়ে সমুদ্র আর চর। একটু মনোযোগ দিয়ে তাকালে চোখে পড়ে অন্য গল্প—ম্যানগ্রোভ বন। কেওড়া, গেওয়া, ঝাউসহ বিভিন্ন উপকূলীয় উদ্ভিদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই সবুজ অঞ্চল শুধু সৌন্দর্য বাড়ায় না; উপকূলীয় পরিবেশের জন্যও এর গুরুত্ব রয়েছে। মাটির বুক চিরে মাথা উঁচু করে থাকা শ্বাসমূলগুলো তারই দৃশ্যমান প্রমাণ। এই ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে কাঁকড়া, ঝিনুক, শামুক, মাছসহ নানা প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে মানিয়ে তৈরি হওয়া এই পরিবেশ আসলে একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র। আর উপকূলের মানুষের জন্য ম্যানগ্রোভের গুরুত্ব আরো বড়। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার মতো প্রাকৃতিক ঝুঁকির প্রভাব কমাতে উপকূলীয় বন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই নিদ্রার চরের সৌন্দর্য রক্ষার অর্থ শুধু পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য রক্ষা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের অস্তিত্ব।
মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে চাপও
নিদ্রার চর এখন আর একেবারে অচেনা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওর কারণে দিনদিন বাড়ছে দর্শনার্থীর সংখ্যা। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছে সূর্যাস্ত দেখতে, প্রকৃতির কাছে কিছুটা সময় কাটাতে কিংবা ছবিতে দেখা জায়গাটিকে নিজের চোখে দেখতে। কিন্তু পর্যটকের এই আগ্রহের সঙ্গে একটি প্রশ্নও সামনে আসছে—এই প্রকৃতি কি সেই চাপ নিতে পারবে?
চরে হাঁটার সময় চোখে পড়ল মানুষের চলাচলের চিহ্ন। কোথাও পর্যটকদের বসে থাকার জায়গা, কোথাও পায়ের চলাচলে নরম মাটি ক্ষতিগ্রস্ত। পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ম্যানগ্রোভের শ্বাসমূলের ওপর মানুষের অবাধ চলাচল কিংবা মোটরসাইকেল নিয়ে প্রবেশ এই পরিবেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। প্রকৃতিকে দেখতে গিয়ে যদি প্রকৃতিরই ক্ষতি করা হয়, তাহলে সেই পর্যটনের ভবিষ্যৎ কতটা টেকসই—প্রশ্নটি এখন থেকেই ভাবার সময় এসেছে।
উন্নয়ন দরকার, তবে প্রকৃতির জন্য
নিদ্রার চরে পর্যটকদের জন্য সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি চোখে পড়ার মতো। যাতায়াতের পথ আরো ভালো করা, নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাবারের ব্যবস্থা এবং জরুরি নিরাপত্তা—এসব সুবিধা পর্যটকদের জন্য প্রয়োজন। তবে উন্নয়ন বলতে যদি শুধু কংক্রিটের স্থাপনা, দোকান কিংবা বড় অবকাঠামো বোঝানো হয়, তাহলে সেটিই হয়তো নিদ্রার চরের সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এই জায়গার সৌন্দর্য তার স্বাভাবিকতায়। তাই প্রয়োজন হলে পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট হাঁটার পথ করা যেতে পারে, সংবেদনশীল ম্যানগ্রোভ এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা যেতে পারে, মোটরসাইকেল চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পর্যটকদের পরিবেশ সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ নিদ্রার চরকে বদলে ফেলার চেয়ে প্রয়োজন তাকে বুঝে ব্যবস্থাপনা করা।
শুধু পর্যটন কেন্দ্র নয়
নিদ্রার চর থেকে খুব দূরে নয় টেংরাগিরি বন, শুভসন্ধ্যা সৈকতসহ আরো কয়েকটি দর্শনীয় স্থান। ফলে পরিকল্পিতভাবে পুরো এলাকাকে একটি সমন্বিত পর্যটন অঞ্চলের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। তবে সেই পরিকল্পনার কেন্দ্রে থাকতে হবে স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশ। পর্যটক বাড়লে স্থানীয়দের জন্য নৌযান, খাবার, গাইড, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। স্থানীয় তরুণরা পরিবেশবান্ধব পর্যটন উদ্যোক্তা হিসেবেও কাজ করতে পারেন। তবে প্রকৃতি যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনের আকর্ষণও কমে যাবে। তাই নিদ্রার চরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে উন্নয়ন ও সংরক্ষণ—এই দুয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির ওপর।
ফিরে আসার সময়
ফেরার সময় একবার পেছনে তাকালে নিদ্রার চরকে অন্যরকম মনে হয়। দূরে পড়ে থাকে সবুজে মোড়া চর, তার পাশে জলরাশি। কেওড়ার ফাঁক দিয়ে বাতাস আসে। কোথাও মানুষ ছবি তুলছে, কোথাও কেউ নীরবে বসে আছে। তখন মনে হয়, নিদ্রার চর আসলে শুধু ঘুরে দেখার কোনো জায়গা নয়। এটি প্রকৃতির নিজের মতো করে বেঁচে থাকার একটি গল্প। জোয়ার এলে যে চর পানির সঙ্গে কথা বলে, ভাটায় যে মাটি আবার নিজের বুক খুলে দেয় যে শ্বাসমূল কাদার ভেতর থেকেও বেঁচে থাকার ঘোষণা দেয়। সেই চরকে পর্যটনের নামে বদলে ফেলার আগে তার ভাষাটা বোঝা জরুরি।
নিদ্রার চরের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই—এখনো এর প্রকৃতি মানুষের তৈরি কোনো সাজসজ্জার ওপর নির্ভরশীল নয়। তার সৌন্দর্য আসে নদী থেকে, সাগর থেকে, কেওড়ার পাতা থেকে, কাদামাটির বুক ভেদ করে ওঠা শ্বাসমূল থেকে। সেই সৌন্দর্য দেখতে মানুষ আসুক, আরো আসুক। তবে ফিরে যাওয়ার সময় যেন তারা সঙ্গে করে শুধু ছবি নিয়ে যায় নিদ্রার চরের প্রকৃতির কোনো অংশ নয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

