পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ভাবনা

সাইফুল ইসলাম সোহাগ

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ভাবনা

পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত উন্নয়ন ভাবনায় প্রথমত পর্যটন এবং দ্বিতীয়ত কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে বিজ্ঞজনেরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এছাড়া, একাধিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন বিজ্ঞজনেরা পার্বত্য অঞ্চলে তেল গ্যাস অনুসন্ধানের কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ায় এ অঞ্চলে বিপুল গ্যাস তেল প্রাপ্তির বিষয়েও আশাব্যঞ্জক ধারণা দিয়ে থাকেন। বিগত সরকারের সময়ে কিছু কিছু বিজ্ঞজন পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের পূর্ব সীমান্তে পাহাড়ি অঞ্চলের সাথে বাণিজ্য বৃদ্ধির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিরাট সম্ভাবনার বিষয়ে আশার বাণী শুনিয়েছিলেন। উল্লিখিত আশার ক্ষেত্রসমূহ বাস্তবতার নিরিখে মিলিয়ে নেয়া প্রয়োজন।

পর্যটন অত্যন্ত লাভজনক সেবা খাত এবং এতে ব্যাপক সংখ্যক দক্ষ জনবলের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর দক্ষতা সীমিত পর্যায়ের, এ কারণে নির্যাস বিকশিত হলে দ্রুত বেকারত্ব দূরীভূত করা সম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও এ সৌন্দর্যকে পর্যটন শিল্প হিসেবে বিকাশে ও বিপণনে প্রধান বাধা এ অঞ্চলের রাজনৈতিক পরিবেশ। রাজনৈতিক পরিবেশের স্থিতিশীলতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত পর্যটনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করা বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে। বর্তমানে বিরাজমান পরিস্থিতিতে পর্যটন নিয়ে আশাবাদী হওয়ার উপাদান নেই।

বিজ্ঞাপন

পার্বত্য চট্টগ্রামের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে দুটি পর্বতশ্রেণি উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এ দুটি পর্বতশ্রেণি এ অঞ্চলের আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ জায়গা জুড়ে অবস্থান করছে। এ দুটি পর্বতশ্রেণির গড় উচ্চতা হাজার ফুটেরও বেশি। অবশিষ্ট দুই-তৃতীয়াংশ জায়গার অধিকাংশ পাহাড় জাতীয় ভূমি। কিছু নদী অববাহিকা উপত্যকা তৈরি করলেও সমতল ভূমির পরিমাণ পার্বত্য চট্টগ্রামের এক-দশমাংশও নয়। তন্মধ্যে বৃহত্তম কর্ণফুলী নদী অববাহিকার উপত্যকা হ্রদের অংশ। প্রকৃতপক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে কি পরিমাণ ভূমি আবাদযোগ্য সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির কত অংশ কৃষির জন্য ব্যবহারযোগ্য তা নির্ধারণ না করেই কৃষির উৎপাদনশীলতা নিয়ে অতি আশাবাদের আলোকে অপরিকল্পিত সম্প্রসারণমূলক কর্মসূচী প্রতিবেশের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের হৃদপিণ্ড হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর। চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যতা কর্ণফুলী নদীর পানি প্রবাহের ওপর নির্ভরশীল। তাছাড়া, চট্টগ্রাম শহরের পানি সরবরাহের প্রধান উৎস কর্ণফুলী নদী। কর্ণফুলী নদীর নাব্যতা এবং পানি প্রবাহের ধারাবাহিকতা খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় উৎপন্ন হওয়া ঝিরি, নালা, খাল ও নদীসমূহের ওপর নির্ভরশীল। এ সকল প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ স্থিতিশীল রাখার জন্য বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক বন থাকা প্রয়োজন। কারণ, বনভূমি বৃষ্টির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয় এবং গাছের মূলের মাধ্যমে মাটির অভ্যন্তরে পানি পাঠিয়ে দিয়ে মাটির আর্দ্রতা বৃদ্ধি করে। পাহাড়ি বনের আজ মাটি শুষ্ক মৌসুমে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি নির্গত করে খাল নদীসমূহের পানি প্রবাহ অব্যাহত রাখে। এই মৌলিক তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে সংরক্ষিত বন সৃষ্টি করেছিলেন যাতে চট্টগ্রাম বন্দরের নাব্যতা অক্ষুণ্ন থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বন প্রায় নিঃশেষ হতে বসায় বর্তমানে এ অঞ্চলে উৎপন্ন হওয়া নদীগুলিও শুকিয়ে যাচ্ছে। কি পরিমাণ প্রাকৃতিক বনভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপত্তি হওয়া নদীসমূহের পানি প্রবাহের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সে বিষয়ে সমীক্ষা হওয়া প্রয়োজন। চট্টগ্রাম বন্দরের অস্তিত্ব রক্ষা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য কেন্দ্র মাতারবাড়ির অস্তিত্ব রক্ষায় কর্ণফুলী, মাতামুহুরী নদীর উপযুক্ত পরিমাণের পানি প্রবাহের জন্য প্রয়োজনীয় বনভূমির পরিমাণ নির্ধারণ না করে পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষাবাদ বৃদ্ধির পরিকল্পনা দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের নদীসমূহের পানি প্রবাহ কমার আরো অন্যতম দৃশ্যমান কারণ হচ্ছে সেগুন বাগানের সংখ্যা বৃদ্ধি। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার আগে পার্বত্য অঞ্চলে কৃষিজ পণ্যের উৎপাদন মূল্য পাওয়া যেত না। অর্থকরী ফসল থেকে আয়ের সুযোগ না থাকায় কাঠ বিক্রির মাধ্যমে বিক্রয়লব্ধ অর্থ পার্বত্য অঞ্চলে আয়ের প্রধান উৎস। সড়ক পথ ব্যতীত নদীপথেও কাঠ বাজারজাত করা যায়। এ সহজ সুবিধার জন্য পার্বত্য অঞ্চলের সচ্ছল চাষীরা কাঠ জাতীয় গাছের বাগান সৃজনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। সেগুন বাগানে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে লাভজনক হওয়ায় বড় অংশ সেগুন বাগানে পরিণত হয়েছে। সেগুন গাছ মাটির আর্দ্রতা বিনষ্ট করে এবং নিষ্ফলা জমিতে পরিণত করে। সেগুন বাগানের কারণে ঝিরি নালা শুকিয়ে গেছে নয়তো শুকিয়ে যেতে বসেছে। পশুপাখি বিচরণ করতে দেখা যায় না। অনেক প্রজাতির প্রাণীর অস্তিত্বও ঝুঁকির মুখে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিবেশ সংরক্ষণের জন্য সেগুন বাগান নিয়ন্ত্রণ এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘমেয়াদের উন্নয়ন পরিকল্পনাতে সেগুনের বাগানের পরিমাণ কমিয়ে আনার কার্যকর কৌশল সন্নিবেশ করা প্রয়োজন।

সেগুন, মেহগনি ছাড়াও কিছু সবজি ও মৌসুমি ফল রয়েছে যা মাটির আর্দ্রতা বিনষ্ট করে এবং মাটি ক্ষয় করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কোনো নির্দিষ্ট সবজি, ফল আবাদ বৃদ্ধির উৎসাহ প্রদানের আগে এ সকল প্রজাতির বিষয়ে যথাযথ বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ ফলাফল বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যাতে ঐ সকল সবজি বা ফল আবাদে সেচের প্রয়োজনে অতিরিক্ত পানির ব্যবহার প্রকৃতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলতে না পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এবং প্রাপ্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক উন্নয়ন সম্ভাবনা নিয়তির ওপর নির্ভরশীলতার তুল্য। ইতঃপূর্বে সীমিত পরিসরে সিসমিক সার্ভে হলেও আশাব্যঞ্জক ফলাফল আসেনি। ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে এই আশার আলোকে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ বাস্তবসম্মত নয়।

পর্যটন বিকাশে সাজেকের মতো কিছু এলাকা চিহ্নিত করা যেতে পারে যেগুলি সংশ্লিষ্ট জেলা পরিষদসমূহের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহের সংশ্লিষ্ট আইনের ২২ ধারা অনুযায়ী পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ এ বিষয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। সার্কেল চিফ এবং মৌজা হেডম্যান এর অনাপত্তির ভিত্তিতে লোকালয় হতে দূরত্ব বজায় রেখে দৃষ্টিনন্দন এলাকাসমূহে এক্সক্লুসিভ পর্যটন স্পট গড়ে তোলা হলে স্থানীয় অধিবাসীদের বিরোধিতা কখনো প্রবল হবে না। এ সকল পর্যটন স্পটসমূহে নিকটবর্তী পানিপ্রবাহ হতে পানি প্রাপ্তির সম্ভাবনা অনুযায়ী হোটেল রিসোর্টের সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। মাটির তলদেশ থেকে পানি উত্তোলনের মাধ্যমে পর্যটন সুবিধা প্রদান করা হলে তা কখনো টেকসই হবে না এবং সন্নিহিত এলাকার প্রতিবেশ বিপন্ন করবে।

স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সবজি, ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বাঁশ ও কাঠের ওপর নির্ভরশীল ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। গ্রাম পর্যায়ে সক্রিয় সমবায় সমিতিসমূহকে স্বল্প সুদে ক্ষেত্রবিশেষে অনুদান প্রদানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র শিল্প কারখানাসমূহ বিকাশে সহায়তা করা যেতে পারে। এসব শিল্প কারখানা পরিচালনার জন্য কারিগরি প্রশিক্ষণের পাশাপাশি হিসাবরক্ষণ ও বিপণনের প্রশিক্ষণও প্রদান করা প্রয়োজন।

উল্লিখিত প্রস্তাবনাসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নিমিত্ত গবেষণা কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালনা করা যেতে পারে। এছাড়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন সহায়তা বরাদ্দের আওতায় গৃহীত স্কিমের মাধ্যমেও বুদ্ধিবৃত্তিক সেবা ক্রয় করে কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব।

পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ শক্তিশালী স্থানীয় সরকার হলেও ১৯৬৯ সালের পর এ সকল প্রতিষ্ঠানসমূহে কোনো নির্বাচন হয়নি। সরকার কর্তৃক গঠিত অন্তর্বর্তী পরিষদ সদস্যরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রত্যেক সরকারই অন্তর্বর্তী পরিষদ পরিবর্তন করেছেন। তারা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় জবাবদিহিতার বিষয়েও নিরুদ্বেগ থাকেন। জবাবদিহিতার অভাবে অন্তর্বর্তী পরিষদ সদস্যগণ জেলা পরিষদসমূহের উন্নয়ন পরিকল্পনায় আত্মীয়তা, আঞ্চলিকতা ও গোষ্ঠীস্বার্থকে প্রাধান্য দেন। ফলে, পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ হতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রস্তাব পাওয়া যায় না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন