বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ ক্রমেই শক্তি বাড়াচ্ছে। সোমবার সকাল ৬টায় গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। এটি আরও শক্তিশালী হয়ে আজ মধ্যরাত নাগাদ প্রবল ঘূর্ণিঝড় এবং পরবর্তীতে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিয়ে আগামী ২৮ অক্টোবর ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি বর্তমানে পূর্ব-মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থান করছে। সোমবার সকাল ৬টায় এটি চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ৮২০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ৭৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা থেকে ৭৮৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৭৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থান করছিল।
ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা বা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কেন্দ্রের কাছাকাছি সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরে ১ নম্বর দূরবর্তী সতর্কসংকেত নামিয়ে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে থাকা মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সোমবার চট্টগ্রাম বিভাগের দু-এক জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু এলাকায় এবং খুলনা ও বরিশাল বিভাগের দু-এক জায়গায় বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
বুধবার খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের দু-এক জায়গায় বৃষ্টি হতে পারে। বৃহস্পতিবার রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক জায়গায় এবং অন্য কয়েকটি বিভাগের দু-এক জায়গায় বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। শুক্রবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টির সঙ্গে কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণ হতে পারে।
সোমবার সারা দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। তবে পরবর্তী কয়েক দিনে তাপমাত্রা সামান্য কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্ধিত পাঁচ দিনের শেষদিকে বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা কমতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ বাংলাদেশের দিকে সরাসরি এগিয়ে আসছে—এমন পূর্বাভাস এখন পর্যন্ত নেই। তবে এর গতিপথ ও শক্তির পরিবর্তনের ওপর বাংলাদেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি নির্ভর করবে। তাই সমুদ্রবন্দর, উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা, জেলে ও নৌযান-সংশ্লিষ্টদের আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরবর্তী সতর্কবার্তা অনুসরণ করা জরুরি বলে মনে করেন আবহাওয়াবিদরা।
সোমবার দুপুরে আবহাওয়াবিদ আব্দুল হামিদ আমার দেশ-কে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এটি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় ও উত্তরাঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে।’
এর আগে আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক আমার দেশ-কে বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়টি ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ ও ওড়িশার যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে পারে। সেখানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশে সরাসরি বড় ধরনের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবে মঙ্গলবার থেকে উপকূলীয় এলাকায় বৃষ্টি শুরু হতে পারে। এরপর ২৮ থেকে ৩০ অক্টোবর খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের পশ্চিমাঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।’
এদিকে ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ উপকূলের দিকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ মোকাবিলায় বিশেষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে দেশটির প্রশাসন। সম্ভাব্য আঘাতের আশঙ্কায় উপকূলীয় এলাকাগুলোর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা প্রচারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়টি শক্তি বাড়িয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে এবং আগামী ২৮ অক্টোবর নাগাদ অন্ধ্র প্রদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। তবে স্থলভাগে আঘাতের সুনির্দিষ্ট স্থান ও তীব্রতা নির্ভর করবে ঘূর্ণিঝড়টির পরবর্তী গতিপথের ওপর।
অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন. চন্দ্রবাবু নাইডু জেলা প্রশাসনগুলোকে ২৪ ঘণ্টা সতর্ক থাকতে, নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালু করতে এবং জনগণের মোবাইলে নিয়মিত সতর্কবার্তা পাঠাতে নির্দেশ দিয়েছেন। উপকূলীয় গ্রামের ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের প্রয়োজনে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সমুদ্রে থাকা মাছ ধরার নৌকা ফিরিয়ে আনা এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত সচল রাখার প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর অন্ধ্র প্রদেশের বাপটলা ও বিশাখাপত্তনমের মধ্যবর্তী উপকূলে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানতে পারে; তখন বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার এবং দমকা হাওয়ায় ১৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
উল্লেখ্য, ‘অর্ণব’ শব্দের অর্থ সমুদ্র বা সাগর। বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর অঞ্চলের ১৩টি দেশ এই ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


